ভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নেই কার্যকর
Breaking News
Home » ২ শিরোনাম » ভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নেই কার্যকর

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

ভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নেই কার্যকর
এনবিএস | সোমবার, এপ্রিল ১৬, ২০১৮ | প্রকাশের সময়: ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

ভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নেই কার্যকরভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নেই কার্যকর

কোনো শিশুর ওজনের ১০ ভাগের বেশি ভারী ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই রায় ঘোষণার দেড় বছর হতে চললেও তা কার্যকরে উদ্যোগ নেয়নি সরকার ও অধিকাংশ স্কুল।

হাইকোর্টের নির্দেশনার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও রায়ের পক্ষেই বলেছেন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করেননি তারা। এরপরও বাস্তবায়নে গলদটা কোথায়, তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন এই প্রতিবেদক ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ভারী ব্যাগের বোঝা বহন করায় শিশুর মেরুদণ্ডের হাড়ে ক্ষতিসহ নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।

ভারী ব্যাগ বহনে শিশুর শারীরিক ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেলের কলেজের গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ হেল কাফি বলেন, ‘ভারী ব্যাগ বহনে শিশুর অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে। এর কারণে বাচ্চাদের শরীরের জয়েন্টগুলোতে সমস্যা হতে পারে।

ওভার ওয়েট বেয়ারিংয়ের (বহন) প্রবলেম হতে পারে এবং শিশুরা মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপের মধ্যে থাকে। আমার বাচ্চাদেরকেও স্কুলে যেতে হয় অসহনীয় পর্যায়ের ভারী ব্যাগ নিয়ে। কারণ স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সিলেবাস অনুযায়ী যে সকল বই কিনতে বলে, সেগুলো বাচ্চারা স্কুলে নিয়ে যেতে সমস্যা মনে করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীরা মাত্রাতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করছে।

সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর অভিভাবক হাসিনা আক্তার দীপা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘বাচ্চারা তাদের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে উল্টা হয়ে পড়ে যায়। বাচ্চারা ক্লাসের ভেতরে প্রবেশের সময় পর্যন্ত তাদের ব্যাগের বোঝা বইতে হচ্ছে। আমার মেয়ের বয়স সাত বছর। তাকে স্কুলে যেতে হয় ১৫টি বই নিয়ে। সঙ্গে নিতে হয় পানির বোতল, পেন্সিল বক্স, টিফিনসহ অনেক কিছু।

এগুলো নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে অনেক কষ্ট হয়। সে মাঝে মধ্যে বিরক্তি প্রকাশ করে। স্কুলে যাওয়ার পর ব্যাগের বোঝা নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত পাঠ করতে হয়, যা খুবই কষ্টকর।’

হাইকোর্টের রায়ের পর অনেক অভিভাবক বিষয়টি জানালেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনই এক অভিভাবক গুলশান আরা সালেহ। সুয়ান্তা রায়া সালেহ নামের তার মেয়ে গুলশানে চিটাগং গ্রামার স্কুলের (সিজিএস) দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী।

ভারী ব্যাগ বহনের বিষয়ে গুলশান আরা বলেন, ‘আমার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাচ্চার শরীরের ওজনের চেয়ে অনেক বেশি ওজনের ব্যাগ নিয়ে তাকে স্কুলে যেতে হয় প্রতিনিয়ত।

আমার জানা মতে, রাজধানীর কিছু স্কুল আছে, যেগুলোতে ব্যাগ বহনের ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ হেল্প করলেও বেশির ভাগ স্কুলের বাচ্চাদেরকে শরীরের ওজনের ১০ ভাগের এক ভাগ নয়, বেশি ওজনের ব্যাগ বহন করতে হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর অগ্রণী স্কুলের একজন শিক্ষিকা বলেন, ‘বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ তার শরীরের ওজনের চেয়ে বেশি। একটি বাচ্চাকে অনেক বেশি বই পড়তে হয়। অপ্রয়োজনীয় বই, যেগুলো সিলেবাসের বাইরে সেগুলোও বাচ্চাদের পড়াতে প্রকাশনা সংস্থাগুলো স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে ধরনা দেয়।’

প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে প্রধান শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ সুবিধা পান অভিযোগ করে ওই শিক্ষিকা বলেন, ‘বছরের শেষের দিকে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর আনাগোনা বেশি দেখা যায়। ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে স্কুলে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন প্রকাশনীর লোক। তারা ডিসেম্বর, জানুযারি, ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এসব অতিরিক্ত বই বাচ্চাদের পড়াতে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’

ওই শিক্ষিকা আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগগুলো অনেক ভারী হয়ে যায়। তারা নিয়মিত এগুলো বহন করতে বিরক্তি প্রকাশ করে। বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ মাঝে মাঝে শিক্ষকরাও নাড়াতে পারেন না। বেশি বই হওয়ার কারণে তাদের সমস্যা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ‘এটি একটি ভালো রায় ছিল। দেশের সবাইকে এ রায় মেনে শিশুদের পক্ষে দাঁড়ানো উচিত। আমার মনে হয়, এ রায়ের বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর কোনো সার্কুলার জারি করেনি।

স্কুলে স্কুলে রায়ের বিষয়ে জানানো হয়নি। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করব না। কারণ রায়টি সকলের জন্যই। যাদের ওপর রায় বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব, তারা মনে হয় এটি সঠিকভাবে মনিটরিং করছেন না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচিত সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, ‘বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ বহনে হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি মানছে না। আদালতের আদেশ অবমাননা করছে। সারা দেশের জন্য এ রায় কার্যকর করতে হবে।’

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো এ রায়ের তোয়াক্কা করছে না বলে অভিযোগ করে আইনজীবী ইউনুস আলী আখন্দ বলেন, ‘দেশের যে সকল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো আছে, তারা হাইকোর্টের রায় বেশি অমান্য করছে। তাদের স্কুল পরিচালনায় কোনো গভর্নিং বডি নেই বলে এই সমস্যা।

আমাদের ভিকারুন্নিসা স্কুল হাইকোর্টের রায় অনেকটাই মেনে চলার চেষ্টা করছে। আদালতের রায় অনুযায়ী আমরা বাচ্চাদের বই-খাতা কমিয়ে দিয়েছি। আশা করছি আমাদের মতো সকলেই হাইকোর্টের রায় মেনে চলবেন। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না সরকারের গাফিলতির কারণে। সরকারের উচিত হাইকোর্টের রায় বাস্তবাস্তয়ন করতে খুব তাড়াতাড়ি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা।’

স্কুলে শিশুদের ব্যাগ বহনের বিষয়ে ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ব্যারিস্টার মাসুদ হোসাইন দোলন, মোহাম্মদ জিয়াউল হক ও আনোয়ারুল করিম। এ রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে সেই বছরের ১১ জুলাই হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে বলা হয়, শিশুর শরীরের ওজনের ১০ ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি ওজনের ব্যাগ বহন করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।

এরপর ‍রুলের শুনানিতে জবাব দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

আদালত তার রায় বলেন, ছয় মাসের মধ্যে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে হবে সরকারকে। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের আগে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। সেই প্রজ্ঞাপনটি জারি করতে হবে রায় হাতে পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই।

গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং শিক্ষাসচিবকে এই রায় বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু রায় ঘোষণার পর অনেক সময় পার হলেও এটি বাস্তবায়নে সরকার উদাসীন।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে দুটি ধাপে বিভক্ত করা হয়। তিন-পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য নার্সারি/প্লে গ্রুপ বা প্রাক-কিন্ডারগার্টেন। আর পাঁচ-ছয় বছরের শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক বা কিন্ডারগার্টেন।

কোনো কোনো স্কুলে তিন-চার বছরের শিশুদের জন্য প্লে-গ্রুপ, চার-পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য নার্সারি, পাঁচ-ছয় বছরের শিশুদের জন্য কেজি-১ এবং ছয়-সাত বছরের শিশুদের জন্য কেজি-২ শ্রেণিতে শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

রিটকারীরা তাদের আবেদনে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুল শিশুদের ব্যাগ বহনে আইন রয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রাথমিক-পূর্ব শিশুরা ব্যাগ গ্রহণ করে না। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে শিশুর ওজনের ১০ ভাগের বেশি ভারী ব্যাগ বহন করা যায় না। এতে শিশুর স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে।

আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘রুল জারির সময় আমরা একটি সার্কুলার জারি করতে আদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’ সূত্র : প্রিয়.কম

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Translate »