ঈদ-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
Breaking News
Home » Breaking News » ঈদ-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

ঈদ-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
এনবিএস | বুধবার, আগস্ট ২২, ২০১৮ | প্রকাশের সময়: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

ঈদ-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানেঈদ-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে

-: সালাম সালেহ উদদীন :-

ত্যাগ মহিমা আর ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা নিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে সমাগত। ঈদ কেবল বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবই নয়, আনন্দ-বিনোদন এবং মিলনমেলাও। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য কারোর মধ্যেই যেন চেষ্টা ও আন্তরিকতার অভাব নেই। 

চারদিকে ঈদের আগমনী সুর ঝংকৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট-বড় সবার মনে আনন্দের ফানুস উড়তে থাকে। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! নাড়ির টানে মানুষ ছুটে চলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। নিজ ঘরে কিংবা গ্রামে ফেরার সে যে কী ব্যাকুলতাথ তা বলে বোঝানো দুষ্কর। মানুষ ছুটে চলে তার আপন ঠিকানায়থ জন্মভূমিতে। এই যে ধর্মীয় সংস্কৃতি, তা আজ রূপ নিয়েছে জাতীয় সংস্কৃতিতে।

ধর্ম-বর্ণ-গ্রোত্র নির্বিশেষে ঈদ এখন সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাঙালি প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রামশীল জীবনযাপনের মাঝেও ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা থাকতে চায়। কিন্তু হাজারো বিড়ম্বনা যেন পিছু ছাড়ছে না ঘরমুখো লাখো মানুষের। ট্রেন, লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাসের পর্যাপ্ত টিকিট নেই। ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ। ঈদ উৎসবের নামে যাত্রীসাধারণকে জিম্মি করে শত ভোগান্তিতে ফেলাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান কর্তব্য ও সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর যাত্রী হয়রানি করে, যাত্রীদের বিড়ম্বনায় ও ভোগান্তিতে ফেলে তারা যেন এক স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করে। এটা যে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও মানবতা বিরুদ্ধ কাজ তা তাদের কে বোঝাবে। তাদের এই অমানবিকতা নিষ্ঠুরতা মেনে নেয়া যায় না।

অতিরিক্ত অর্থ প্রাপ্তির আশায় সীমাহীন লোভ এদের মাঝে কাজ করে, যা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলারই নামান্তর। ইসলামের ত্যাগ-মহিমা-ভ্রাতৃত্ববোধ, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা সবই যেন এসব ক্ষেত্রে উপেক্ষিত ও অনুপস্থিত। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, 'ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না '। ইসলাম, মানবিকতা, সেবা, ত্যাগ – এসবকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে তারা মানুষকে জিম্মি ও হয়রানি করে তাদের গলা কাটবে, ঘরে ফেরার ক্ষেত্রে তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপন্ন করে তুলবে; আচরণে ও কর্মকা-ে চারদিকে তারই বহিঃপ্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা যেন আমরা দেখতে পাই। এক্ষেত্রে যানবাহনের মালিকপক্ষের সঙ্গে অঘোষিত ঐক্যের প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি উদ্যোগ ও কর্মকা-ের ভেতরেও। ঈদ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস থেকে শুরু করে যাত্রীদের ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়, তারপরও যথাসময়ে তারা ঘরে কিংবা গ্রামে ফিরতে পারে না।

মহাসড়কে যানজট ও অব্যবস্থাপনা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লঞ্চ, স্টিমার বাস বা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা; লঞ্চ-স্টিমারের ডেকে রাত কাটিয়ে দেয়ার কারণে বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে না পারাথ এসব প্রতি ঈদেরই চিত্র। এর সঙ্গে রয়েছে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা-ঝুঁকি। দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে অনেকের জীবন পর্যন্ত চলে যায়। ফলে অনেক পরিবারই ঈদ আনন্দের পরিবর্তে বিষাদ ও শোকে পরিণত হয়। অথচ ঘরে ফেরা মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। ঈদ এলেই তোতা পাখির মতো অনেক কথাই মন্ত্রী বলে যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কী কারণে যে গেয়েছিলেনথ 'তুমি অনেক কথা যাও যে বলেথ কোনো কথা না বলে।' ঈদকে কেন্দ্র করে যাতায়াত সম্পর্কিত সরকারের সব ধরনের উদ্যোগ এবং ব্যবস্থাগত পরিকল্পনার মধ্যে বরাবরই ফাঁক ও দুর্বলতা থেকে যায়থ মনে হয়, পুরোটাই আন্তরিকতাহীন। আর সে কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। 

এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, এবারের বন্যায় ২১টি জেলার ৭ হাজার ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামালপুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলার ১ হাজার ১০৪ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ৯৯৭ কিলোমিটার, কুমিল্লার ৮৮০ কিলোমিটার, পঞ্চগড়ের ৮৫৮ কিলোমিটার, নীলফামারীতে ৫৩৬ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। রাস্তার এই পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হবে। মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছবে।

বাঙালির আনন্দ-বিনোদনের জায়গা ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিতিশীলতা এবং প্রক্রিয়াশীল শক্তির উত্থানও এ জন্য দায়ী। এক সময় গ্রাম-বাংলায় যাত্রা-পালা খুব জনপ্রিয় ছিল, জারি-সারি, কবিগান ও মানুষের আনন্দ-বিনোদনের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম ছিল। পুতুল নাচ, সার্কাস মানুষকে আনন্দ দিতো। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল মৌসুমভিত্তিক গ্রামীণ মেলা, নানা উৎসব ও পার্বণ। মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এবং হিন্দুদের দুর্গাপূজাও বাঙালির আনন্দ-বিনোদনের যথেষ্ট খোরাক জোগায়। বাংলা নববর্ষ আরো একটি উজ্জ্বল দিক। দেশব্যাপী এসব উৎসব পালিত হয় এবং সারাদেশের মানুষ এতে অংশ নেয়। ঈদ উৎসব যেন সব উৎসবকে ছাপিয়ে যায়। মিলন মেলায় রূপান্তরিত এ উৎসবে দৃঢ় হয় পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন। কিন্তু মানবজীবনের আনন্দ-বিনোদনের খ-িত সঙ্গী এ ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে যদি মানুষ দুর্ভোগ, হয়রানি ও দুর্ঘটনার শিকার হয়; তাহলে তাদের ঈদ-আনন্দ মাটি হয়ে যাবেথ এটাই স্বাভাবিক।

সে আনন্দই যথার্থ আনন্দ, যা দুঃখ ও গ্লানিকে অতিক্রম করে। আমরা আনন্দ করতে গিয়ে এসব অতিক্রম করতে পারি না বরং অক্টোপাসের মতো এসব আমাদের জাপটে ধরে। দুঃখ, গ্লানি ও দুর্ভোগ আমাদের গ্রাস করে। যেখানে ৫০০ টাকায় বাড়ি পৌঁছা যায়, সেখানে লাগে দ্বিগুণ। আবার যেখানে সময় লাগার কথা ৫ ঘণ্টা, লাগছে সারাদিন। এসব রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাজনিত বিশৃঙ্খলা মেনে নেয়া যায় না।

গ্রামে ঈদ করতে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকি সবসময়ই রয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে অনেকেই মারা যান। প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো জায়গায় পুরো পরিবারই নিহত হয়। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর। যে পরিবার মারা গেল, তাদের আত্মীয়স্বজন-পরিজনদেরও ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যায়। এর দায় গিয়ে কিন্তু পড়ে সরকারের ওপর। সরকার সড়ক, নৌ ও রেলপথে যাতায়াত স্বাচ্ছন্দ্য ও ঝুঁকিমুক্ত করতে পারলে হয়তো এভাবে অকালে কারো প্রাণ চলে যেত না।

একুশ শতকে এসে মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নাগরিক জীবন বড়ই দুঃসহ ও সংগ্রামশীল। পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট, চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারী অজ্ঞান ও মলম পার্টি এবং সন্ত্রাসীদের রাজধানীব্যাপী দৌরাত্ম্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন গতি, অসহনীয় যানজট, আবাসন ও কর্মসংস্থানের সঙ্কটথ এর পাশাপাশি যদি ঈদে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে তার জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে, তাহলে তার আনন্দ-বিনোদনের জায়গা আর থাকে কী। তারপরও ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই আনন্দ পেতে চায়। ঈদে খাদ্যসামগ্রী থেকে পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনাচরণ সবকিছুতেই পরিবর্তনের আমেজ চোখে পড়ে। এ পরিবর্তন দেখে মনে হয়, বিষাদের ঘন-কালো ছায়া কাউকে স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে কি তাই?

বাতাসে শরতের ঘ্রাণ, মন উদাস করা গন্ধ চারদিকে। এমনই এক প্রাকৃতিক আবহে তারপরও বাঙালি সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে মেতে উঠবে ঈদ-আনন্দে। মনের আনন্দই দেহের শক্তির উৎস। মানুষ মাত্রই আনন্দের কাছে নিবেদিত হতে চায়। রিকশাওয়ালা ঘরে শুঁটকি টাইপের বউ রেখে বাংলা সিনেমার শরীরসর্বস্ব নায়িকা দেখে আনন্দ পায়। ভারতের গরিব-দুঃখীরা পায় হিন্দি সিনেমার নাচ-গান দেখে। আর ঈদে বাঙালির আনন্দ পায় পশু কোরবানি দিয়ে গরিব-দুঃখীদের মাঝে মাংস বিলিয়ে এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হতে পেরে।

আমরা চাই না, কারো আনন্দ এবার বিষাদে রূপ নিক। কেউ স্বামী-সন্তানহারা হোক। অথবা হোক কেউ স্ত্রী কিংবা ভাইবোন হারা। এত ঝক্কি ঝামেলার মাঝেও প্রকৃত আনন্দ নিয়ে বাঙালির প্রতিটি ঘরে আসুক ঈদ। ধনী ঈদ করুক খুশিতে, গরিবের ঘরেও ছড়িয়ে পড়ুক খুশির আমেজ। ভেদাভেদ, হিংসা ভুলে ঈদ হোক সবার আনন্দময় উৎসব। আমরাও তেমনটি চাই। হোক না এবার তেমন উৎসব। উৎসব-আনন্দ সবার দুঃখ-বেদনাকে অতিক্রম করে যাকথ পৌঁছে দিক সুখসাগরে।

কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলাম লেখক [সংকলিত]

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Translate »