ভারতে স্বৈরাচার যত উলঙ্গ হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে বিরোধী জোট
Breaking News
Home » ভারত » ভারতে স্বৈরাচার যত উলঙ্গ হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে বিরোধী জোট

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

ভারতে স্বৈরাচার যত উলঙ্গ হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে বিরোধী জোট
এনবিএস | বুধবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | প্রকাশের সময়: ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

প্রসেনজিৎ দাস, ভারতের প্রতিনিধি :  তুতিকোরিনের ৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনা আরও এক বার মূল ব‍্যাধির দিকে আঙুল তুলেছে। দিনের আলোয় ক্রমশ ফুটে উঠেছে শাসনের রং। যদিও অবুঝ বা প্রকৃত বুঝমানেরা বলবেন, এ তো তামিলনাড়ু। উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা রাজস্থান তো নয়। কিন্তু একে আন্না ডিএমকের সরকার বিজেপির প্রতি মিত্রভাবাপন্ন, তার ওপর পুলিশের কাছে নালিশ করেন তামিলনাড়ু বিজেপির সভানেত্রী তামিলিসাই সুন্দররাজন। সুতরাং পুলিশের ঘাড়ে ক’টা মাথা যে তাঁর অভিযোগ অগ্রাহ‍্য করবে? ২৮ বছর বয়সি গণিত-গবেষক ও লেখিকা লুইস সোফিয়া কানাডা থেকে তুতিকোরিনের বাড়িতে ফিরছিলেন। চেন্নাই থেকে মেয়ের সঙ্গে বিমানে ওঠেন তাঁর বাবা-মা। বিমানের ভেতরেই বিজেপি নেত্রীর সঙ্গে তাঁর বচসা বাধে। তুতিকোরিনে নামার পর কিছু লোক তাঁদের ঘিরে ধরে গালি দিতে থাকে। তামিলিসাই বলতে চান, বিমানের ভেতরেই মোদী সরকারকে ফ্যাসিস্ট আখ‍্যা দিয়ে স্লোগান তোলেন সোফিয়া। এতেই বিজেপি নেত্রীর মনে হয় মেয়েটি কোনো সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সামনেই তাঁর দলের অপমান কী ভাবে সহ‍্য করবেন, সেটাই কৈফিয়ত সুন্দররাজনের। তাঁর এই কথায় সারা দেশ জেগে উঠেছে। সুদূর দক্ষিণ ভারতের এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের আকাশে সিঁদুরে মেঘ বলেই  ধরে নিয়েছেন ঘরপোড়া গরুরা। মেয়েটির পক্ষে সওয়াল করছেন তাঁরা। বলছেন, সরকারকে ফ‍্যাসিস্ট বললেই যদি জেল হয় তা হলে তো কালক্রমে সব বিরোধী নেতা ও পথচলতি পথিককেই জেলে পোরা হবে। এ তো শুধু অশনি সংকেত। বজ্রপাত হবে শিগগির।আসলে এই ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটেনি। ইতিহাস সব কিছুরই সাক্ষী। তাই সঠিক ভাবে দেখার চোখ আর শোনার কান থাকলেই বোঝা যায় কোন পথে চলেছে স্বদেশ।  যে শাসকদের শাসনে পদে পদে মেরুকরণ নবকলেবরে তার এই পুণ্যশ্লোক মাতৃভূমির অসংখ্য অমঙ্গল চিহ্নের মধ্যে অন্তত একটা রুপোলি রেখা আঁকার কাজ অনেকটাই সহজ করে এনেছে। বাঁধন যত তীব্র হবে ততই বাঁধন টুটবে। এমন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হবে কি না কে বলবে? কিন্তু, একটা জিনিস পরিষ্কার। তা হল, গণতন্ত্রের ধাঁচার বিরুদ্ধে আসল গণতান্ত্রিক জোট গড়ে তোলার কাজটা ত্বরান্বিত হচ্ছে। অনেক অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করেসমস্ত আগাছা তুলে ফেলে, অসমান জমি সমান করে দিচ্ছে শাসকের ঔদ্ধত্য আর তর্জনগর্জন। ইতিহাস একই ভাবে আবর্তিত হয় না। কিন্তু তার অমোঘ পরিণতি এড়ানো যায় না। স্বৈরাচার সর্বকালেই অনিবার্য আলোড়নের আলো দেখায় অন্ধকারে।

তাই পালানিস্বামীর পুলিশ যখন বিজেপি নেত্রীর নালিশে ভর করে সোফিয়াকে গ্রেফতার করল, গর্জালেন রাজ্যের বিরোধী কণ্ঠ স্ট‍্যালিন। বললেন, এ কথা তো লাখো মানুষের মুখে। কত জনকে গ্রেফতার করবে? একে একে সব অবিজেপি দলের নেতাই সরব। যারা ক’ দিন আগেও একাসনে বসতে নারাজ ছিলেন তাঁরাও এগিয়ে গেলেন বেশ কয়েক গজ, বিরোধী মোর্চার দিকে। বিশেষ করে আঞ্চলিকরা।

৭৫-এ জরুরি অবস্থা বা তার আগে ৭১-৭২-এ বাংলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জারি না হলে ৭৭-এ দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ পেত না ভারত ও বঙ্গবাসী। তার পরের দৃষ্টান্ত ২০০২-এর গুজরাত। গোধরা-উত্তর গণহত্যা না হলে ২০০৪-এই এনডিএর পতন ও কংগ্রেসের পুনরুত্থান হত না নবকলেবরে। যা ভারতের রাজনীতিতে ছিল অভাবনীয়। সেই অভূতপূর্ব সমন্বয় হল কংগ্রেস, কমিউনিস্ট-সহ আঞ্চলিকদের। বিজেপির বৈঠকে বাজপেয়ী বলেছিলেন, গুজরাত দাঙ্গার বিরুদ্ধেই জনাদেশে আমরা হেরেছি।৬০-এর বেশি বাম সাংসদের বাইরে থেকে সমর্থনে মনমোহন মন্ত্রিপরিষদ শপথ নিল। এবং চার বছর পর বামেরা সরে এলেও সর্বমোট ১০ বছর চলল সেই সরকার। শুধু তাই নয়। ওই সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী জোটের পক্ষে জনাদেশ এ তো তীব্র ও স্পষ্ট ছিল যে বামেরাই সমর্থন তুলে নিয়ে একঘরে হয়ে গেল ভারতের রাজনীতিতে। দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ। অর্থনৈতিক নীতিতে বিজেপির বিকল্প পদক্ষেপ করলে ও মূল‍্যবৃদ্ধি রোখার সদিচ্ছা দেখালে সেকুলার জোটের সরকারের পক্ষেই অটুট  থাকত জনাদেশ। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ব‍্যামো একে একে গ্রাস করে প্রত‍্যেক শরিক দলকে। মাথা চাড়া দেয় দুর্নীতি। যার ফলে ‘অচ্ছে দিন’-এর তাস খেলে ক্ষমতায় আসেন মোদী। এবং সংঘের রণনীতিতে হিন্দি বলয়ে মেরুকরণের জমিতে উপযুক্ত সেচের কল‍্যাণে ৩০ বছর পর প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বপ্ন সফল হয় বিজেপির। ইউপিএর প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক পরিপক্কতার অভাবে জমির রাজনীতিতে হালে পানি পাননি। সেই সঙ্গে এক দিকে সংস্কারের অ্যজেন্ডা আর অন‍্য দিকে বিশ্বায়নের নামে একমেরুবর্তী অবস্থানকে সরকারের মাস্তুল করে জনসমর্থন ও জোটসঙ্গী হারান। মূলত মনমোহনের অরাজনীতি ও সরকারের আমলাতান্ত্রিকতা নিয়ন্ত্রণে ব‍্যর্থ হন কংগ্রেস ও ইউপিএর রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যার মাশুল দিতে হয় কংগ্রেসকে এতাবৎ সর্বনিম্ন আসনসংখ‍্যায়। মাত্র ৪৪ পায় কংগ্রেস। আর বিজেপি পায় তাদের সর্বকালের সর্বোচ্চ আসন, ২৮২। পরিবারের কর্তৃত্ব রক্ষার লক্ষ‍্যে এত বড়ো সর্বনাশও হজম করতে হয় ধর্মনিরপেক্ষ জোটের নেতাকে। রাহুল গান্ধী তখনও তৈরি হননি। সুতরাং মনমোহন সিংয়ের মতো একজন অরাজনৈতিক অধ‍্যাপককে বেছেছিলেন সনিয়া, যাতে গান্ধী পরিবারের ভবিষ্যত উত্তরাধিকারীকে কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মুখে পড়তে না হয়। যথাসময়ে নেতার আসন ছেড়ে দেওয়ার মতো নির্ভরতা তিনি ছাড়া আর কেউ দিতে পারেননি। না হলে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ,  প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সব চেয়ে অভিজ্ঞ বা দক্ষ এবং ইন্দিরা ক‍্যাবিনেটের একমাত্র জীবিত প্রতিনিধিকে লোকসভার নেতা করেও প্রধানমন্ত্রী করা হল না কেন? প্রশ্নটা সে সময়েও উঠেছিল। কিন্তু রাজনীতিবিদ না হওয়ার দরুন অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনমোহনকে নিয়ে দলের কোনো গোষ্ঠীরই কোনো আপত্তি ছিল না। সনিয়ার আত্মত্যাগের পর এ প্রস্তাব সবাই মেনে নিয়েছিলেন উত্তাপ ও উচ্ছ্বাস ছাড়াই, রামায়ণের ভরতের মতো।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Translate »