ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ২১ মার্চ, ২০১৯ | ৭ চৈত্র, ১৪২৫ | ১৩ রজব, ১৪৪০ | English Version | Our App BN | বাংলা কনভার্টার

  • Main Page প্রচ্ছদ
  • বিদেশ
  • বাংলাদেশ
  • স্বদেশ
  • ভারত
  • অর্থনীতি
  • বিজ্ঞান
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ভিডিও সংবাদ
  • ♦ আরও ♦
  • ♦ গুরুত্বপূর্ণ লিংক ♦
  • Space For Advertisement (Spot # 2) - Advertising Rate Chart


    ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

    রক্তের দামে কেনা ২১’শে ফেব্রুয়ারি
    এনবিএস | Thursday, February 21st, 2019 | প্রকাশের সময়: 12:50 pm

    রক্তের দামে কেনা ২১’শে ফেব্রুয়ারিরক্তের দামে কেনা ২১’শে ফেব্রুয়ারি

    – জিয়াসমিন জুই –

     নিজের ইচ্ছা, আকুতি, প্রয়োজনকে প্রকাশের একমাত্র শক্তি ভাষা। ভাষাই মানুষকে দিয়েছে মনের ভাব প্রকাশ করার, ভাল মন্দ প্রকাশ করার শক্তি যা আমাদের করেছে সামাজিক এবং সেই সাথে করেছে একে অন্যয়ের সহায়ক। মা, মাতৃভাষার সাথে নাড়ির টান ও সর্ম্পক অবিচ্ছেদ্য। আর এ অবিচ্ছিদ্য নাড়ির টান ও সর্ম্পকের কারণে পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিই ছিল বাঙালির প্রথম বিদ্রোহ। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। পৃথিবীর বুকে বাঙ্গালী জাতিই একমাত্র জাঁতি যারা কিনা ভাষার জন্যও জীবন উৎসর্গ করেছেন। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যখন অন্যায্য দাবি এবং অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন এবং সংগ্রাম হয় তখন বাঙ্গালী জাতিকে সর্বদা ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন এবং সংগ্রাম করতে হয়েছে। ভাষা এবং দেশ একজন মানুষের প্রাণ এবং দেহের মতো। প্রাণ এবং দেহের অস্থিত্ব না থাকলে কিসের মানুষ! তাই প্রাণ এবং দেহের রক্ষায় এ জাঁতি একটু একটু করে সংগ্রামী হয়ে উঠেছে। ভাষার মান এবং দেশের সীমানা রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এ জাতিকে। প্রথম শতাব্দির শেষের দিকে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষগুলোর বিভিন্ন অপভ্রংশ থেকে যে আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলোর উদ্ভব ঘটে, তাদের মধ্যে বাংলা অন্যতম। কোন কোন ভাষাবিদ তারও আগে, ৫০০ ঈসায়ী শতাব্দির মধ্যে বাংলার জন্ম হয় বলে মনে করেন। তবে তখন পর্যন্ত এবং বাংলা ভাষা কোনো সুস্থির রূপ ধারণ করেনি। সে সময় এর বিভিন্ন লিখিত ও ঔপভাষীক রূপ পাশাপাশি বিদ্যমান ছিলো। পরবর্তী সময়ে ৬ষ্ঠ শতাব্দির দিকে মাগধী অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে বলে মনে করেন ভাষাবিজ্ঞানিগণ। উপমহাদেশে বিভিন্ন শক্তিশালী ভাষা থাকলেও সে সময় থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ভারতবর্ষের নির্দিষ্ট অঞ্চলের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে বাংলা। ১৯৪৭ এ ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়, তাতে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যাই ছিলো অধিক। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলার পাশাপাশি সহাবস্থান করছিলো উর্দূ। পাকিস্তানের শাষন ব্যবস্থা একতরফাভাবে পরিচালিত হওয়ায় উর্দূ ভাষাই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যভহৃত হতো। উপমহাদেশের বৃটিশ শাষিক অঞ্চলগুলো ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ভার, বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার), সিংহল (বর্তমান শ্রীলংকা) ও পাকিস্তান। (বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অখন্ড পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিলো) নবগঠিত তৎকালীন পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার মদ্যে বাংলাভাষী ছিলেন ৪ কোটি ৪০ লাখ। যারা সবাই ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী। কিন্তু সরকার, প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ছিলো সংখ্যাধিক্য। ১৯৪৭ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দূকে উভয় পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপারিশ করা হয়। প্রচার মাধ্যমে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবল উর্দূ ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয় তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং মুদ্রা ও ষ্ট্যাম্প হতেও বাংরা অক্ষর লুপ্ত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ভাষা আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণা করেন, উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। অন্যকোনো ভাষা নয়। যারা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তারা পাকিস্তানের শত্র“। কখনোই তাদের ক্ষমা করা হবে না। জিন্নাহর এই ঘোষণায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে প্রতিবাদ জানায় ছাত্র জনতা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সরকার খাজা নাজিমুদ্দিনও জিন্নার পদাঙ্কা অনুসরণ করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরোধিতা করেন। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জোড়দার ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও তমদ্দুন মজলিশ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মূলত কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন ছাত্রছাত্রীবৃন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন ঘনিভূত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অব্যহত আন্দেলনের প্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের ৯ মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিনের উদ্যোগে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে আরবি হরফে প্রচলেন একটি অবাস্তব প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিলো হিন্দুয়ানী বাংলা অক্ষর থেকে অবমুক্ত করে ইসলামি সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত আরবি অক্ষরের সাথে বাংলাকে সম্পৃক্ত করা। এ লক্ষ্যে গঠিত ১৬ সদস্য বিশিস্ট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মওলানা আঁকরম খাঁ। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ সকল ভাষাতত্ববিদ আরবি হরফে বাংলা লেখার এই উদ্ভট প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, আমাদের যদি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার কথা বিবেচনা করতে হয়, তবে আমরা উর্দূর কথা বিবেচনা করতে পারি। রাজনৈতিক স্বার্ত হাসিলের জন্য আন্দোলনের গোড়া থেকেই একশ্রেণির নেতৃবৃন্দ এর বিরোধিতা করতে থাকে। কিন্তু ছাত্র জনতার আন্দোলন ও সচেতন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অব্যাহত প্রচেষ্টায় বিরোধী শক্তি বারবার ছিটকে পরে। উনিষশো সাতচল্লিশে শুরু হওয়া আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। পাকিস্তান সরকারের কোন হুমকি বা ষড়যন্ত্রই এর গতিরোধ করতে পারেনি। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। একই দিনে মাওলানা ভাষানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় ছাত্রদের পাশাপাশি আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগের সরাসরী অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ৩১ জানুয়ারি মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের সম্মেলনে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয়, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সদ্য গঠিত সর্বদলীয় পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সকল প্রকার সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল এগারোটায় কাজী গোলাম মাহবুব, আল আহাদ, আবদুল মতিন, গাজীউল হক প্রমূখের নেতৃত্বে ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়। বেলা ১২ থেকে ৩টা পর্যন্ত উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আবদুল মতিন ও গাজিউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে মত দিলে ছাত্র ছাত্রীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) অভিমুখে যাত্রা করার উদ্যোগে নেয়। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্য ও গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র আবুল বরকত এবং রফিক উদ্দীন ও আবদুল জব্বার নামের তিন তরুণ নিহত হন। পরে সচিবালয়ে কর্মরত আবদুস সালাম হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় অলিউল্লাহ নামের নয় বছরের একটি শিশুও পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।

    যাদের ভুলতে পারবো না:

    মাতৃভাষা দিবসের মাস ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই ভাষা সৈনিকদের যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ঢাকার রাজপথ। কী তাদের পরিচয়?

    রফিকঃ  রফিকের পুরো নাম রফিক উদ্দিন আহমদ। জন্ম '২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার পারিল বলধারা গ্রামে। বাবা আবদুল লতিফ ছিলেন ঢাকার বাদামতলীর একটি প্রেসের মালিক। রফিক ম্যাট্রিক পাস করেন '৪৯ সালে স্থানীয় বায়রা স্কুল থেকে। তারপর তিনি ভর্তি হন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্রনাথ কলেজে। এই কলেজে তিনি আই. কম. (যেটা এসএসসি সমমানের) পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর তিনি কলেজের পড়া লেখা অসমাপ্ত রেখে ঢাকায় চলে আসেন বাবাকে প্রেস পরিচালনার কাজে সাহায্য করতে।এ সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। জারী করা হয় ১৪৪ ধারা। কিন্তু বাংলার সাহসী মানুষেরা সেটা মানবে কেন ? তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে চরমভাবে। রফিক যোগ দেন সেই বিক্ষোভ মিছিলে। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের ঘাতক পুলিশ বাহিনী গুলি চালায় এই মিছিলের উপর। গুলি লাগে রফিকের মাথায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। সেদিন ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয় রফিকের লাশ। সেদিন রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর পাহারায় তাঁর লাশ দাফন করা হয় আজিমপুর গোরস্তানে।

    বরকতঃ  বরকতের পুরো নাম আবুল বরকত। তার জন্ম ১৯২৭ সালের ১৩ জুন ভারতের মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামে। তিনি ১৯৪৫ সালে স্থানীয় তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর তিনি ভর্তি হন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। ১৯৪৭ সালে তিনি এই কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি.এ অনার্স পাস করেন। তারপর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। ৫২'র ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল এগিয়ে গেলে সেই মিছিলের উপর গুলি বর্ষণ করে পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন বরকত। মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগে। ডাক্তাররা প্রাণপণে চেষ্টা করেন তাকে সুস্থ করে তুলতে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় তাদের। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি রাত আটটায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। ওই রাতেই তার আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতিতে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন হয় তাঁর লাশ।

    সালাম :  শহীদ সালামের পুরো নাম আবদুস সালাম। জন্ম ফেনী জেলার লক্ষীপুর গ্রামে। তবে তার জন্ম তারিখ জানা যায়নি। পিতার নাম মো. ফাজিল মিয়া। পেশায় তিনি ছিলেন একজন পিয়ন। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক মিছিলে সব ভয়কে দূরে ঠেলে যোগদান করেন সালাম। পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। দীর্ঘ দেড় মাস হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন তিনি। অবশেষে ৭ এপ্রিল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কারণ। খালি হয়ে যায় তার দরিদ্র পিতা মাতার বুক।

    শফিউর : শহীদ শফিউরের পুরোনাম শফিউর রহমান। তার জন্ম ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের চব্বিশ পরগনার কোন্নগর গ্রামে। তার পিতার নাম মাহবুবুর রহমান। তিনি ছিলেন ঢাকার পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। শফিউর ম্যাট্রিক পাস করেন স্থানীয় স্কুল থেকে। তারপর তিনি ভর্তি হন কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্সিয়াল কলেজে। এই কলেজ থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে আই.কম পাস করেন। এরপর তিনি চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসের কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি চব্বিশ পরগনা ছেড়ে পিতার সঙ্গে চলে আসেন ঢাকায়। কিছুদিন পর তিনি ঢাকা হাইকোর্টের হিসাব রক্ষণ শাখায় কেরানি পদে যোগদান করেন। ৫২'র ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় ৬নং রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে চড়ে তিনি রওনা হন অফিসের উদ্দেশ্যে। এ সময় ছাত্র জনতার বিক্ষোভ মিছিল চলছিল। শফিউর যোগ দেন সেই মিছিলে। পুলিশ মিছিলে গুলি বর্ষণ করলে গুলি লাগে শফিউরের পিঠে। মারাত্মক আহত অবস্থায় এম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ডা. এলিনসন তার দেহে অস্ত্রোপাচার করেন। অস্ত্রোপাচার সফল না হওয়ায় ঐদিন সন্ধ্যা ৭টায় তিনি পরলোকগমন করেন। রাত তিনটায় পুলিশ পাহারায় তার লাশ দাফন করা হয় আজিমপুর গোরস্থানে।

    জব্বারঃ  ভাষা শহীদ জব্বারের পুরো নাম আবদুল জব্বার। তার জন্ম ১৯১৯ সালের ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পাঁচুয়া গ্রামে। তবে তার সঠিক জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তিনি স্থানীয় পাঠশালায় কিছুদিন পড়াশোনা করেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না তার পক্ষে। লেখাপড়া ত্যাগ করে তিনি পিতাকে কৃষিকাজে সাহায্য করতে থাকেন।১৫/১৬ বছর বয়সে হঠাৎ একদিন তিনি খেয়ালের বশে সবার অজান্তে বাড়ি ছেড়ে ট্রেনে চড়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। এখানকার জাহাজ ঘাটে এক ইংরেজ সাহেবের সাথে তার দেখা হয়। এই ইংরেজ সাহেব তাকে একটি চাকরী দেন। এই চাকরীর সূত্রে তিনি চলে যান বার্মায়। দশ বারো বছর বার্মায় কাটানোর পর তিনি চলে আসেন দেশে। দেশে ফিরে তিনি বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম আমেনা খাতুন। কিছুদিন পর তার শাশুড়ি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্যে তিনি ৫২'র ২০ ফেব্রুয়ারি শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। শাশুড়িকে ভর্তি করান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরদিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের সামনে হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষের সমাবেশ ঘটে। আবদুল জব্বার ছুটে যান সেই সমাবেশে যোগ দিতে। পুলিশ এই সমাবেশের উপর গুলি চালালে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঐদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

     পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র জনতা শান্তিপূর্ণ শোক মিছিল বের করলে পুলিশ আবার গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে শফিউর রহমানসহ চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। সেদিন থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের অংশ গ্রহণে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত উথলে ওঠে। উপায়ন্তর না দেখে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন তড়িঘড়ি করে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আনেন এবং তা সর্বষম্মভাবে পাশ হয়। ১৯৫৪ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সকারের উদ্যোগে বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় সংসদে বাংলা এবং উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতী দিয়ে সংবিধান পাশ হয় এবং ৩ মার্চ থেকে স্বীকৃতী দানকারী সংবিধান কার্যখর হয়। এর মাদ্যমে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে তমদ্দুন মজলিশ মায়ের ভাষায় কথা বলার যে আন্দোলন শুরু করেছিলো, তা সাফল্যের মুখ দেখে। বাঙালিরা তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ঢাকা মেডিকলে কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত শেষে শহীধ মিনার তৈরির কাজ শুরু করে। শেষ হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে। ঐ দিনই "শহীদ বীরের স্মৃতিতে" শিরোনামে দৈনিক আযাদ পত্রিকায় খবরটি ছাপা হয়। শহীদ শফিউলের পিতা সেদিন সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন আযাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। আর এ দিনই সরকারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী কলেজের ছাত্র হোষ্টেল ঘেরাও করে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। এরপর ঢাকা কলেজে একটি শহীদ মিনার নির্মিত হলে সরকারের নির্দেশে সেটাও ভেঙে ফেলা হয়। অবশেষে সাংবিধানিকভাবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতী দেবার পর ১৯৫৭ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ মুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে ১৯৬৩ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করার বিষয়টি প্রথমে ভাবেন কানাডা প্রবাসী জনাব রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম। এ ব্যপারে ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিত জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে একটি চিঠি লেখেন। জাতিসংঘ থেকে দিকনির্দেশনা পেয়ে তারা বিষয়টি প্যারিসে অবস্থিত ইউনেসকোর সদর দফতরে প্রেরণ করেন। প্যারিস থেকে জানানো, তোমাদের বিষয়টি খুবই ইন্টারেষ্টিং এ ধরনের প্রস্তাব পেলে ইউনেসকো তা আলোচনা করে থাকে………. তবে তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির পক্ষ থেকে পেলে চলবে না। ইউনেসকোর কোনো সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক উপস্থাপন করতে হবে। এরপর রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম বিষয়টি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠান। শিল্পমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমনন্ত্র্রী শেখ হাসিনার নজরে আনেন। শেখ হাসিনা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। শিল্প মন্ত্রণালয় ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করা হয়। সম্মেলনে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হলে মহাপরিচালকের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি অনিশ্চয়তার দিকে ঢলে পড়তে থাকে। কিন্তু অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল, শিল্পমন্ত্রী জনাব সাদেক, ফ্র্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ মোফাজ্জম আলী ও ইউনেস্কো মহাপরিচালকের বিশেষ উপদেষ্টা জনাব তোফাজ্জল হকের কুঠনৈতিক প্রজ্ঞা ও দক্ষতা এ ব্যাপারে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে।যার ফলে পরিবর্তিত প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য যথাযথ সংস্থা কমিশন-২ তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ব্যাপারে পাকিস্তানসহ ২৮ সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে লিখিত সমর্থন জানায়। ইউনেস্কার টেকনিক্যাল কমিটি কমিশন-২ ২২ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রস্তাবটি অধিবেশনে উপস্থাপন করে। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রায় পাঁচশ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কারো কোনো আপত্তি না থাকায় সভাপতি তিনবার হাতুড়ি পিটিয়ে প্রস্তাবটি গৃহিত বলে ঘোষণা করেন। এরপর ৪ হানুয়ারি ২০০০ তারিখে ইউনেস্কার মহাপরিচালক কাইচিরো মাটসুরা একটি চিঠিতে সকল সদস্য রাষ্ট্রের কাছে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। এতে বাংলা ভাষা যেমন সারাবিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে, তেমনি শহীদদের আত্মার প্রতিও সম্মান জানানো হয়েছে। ভাষা শহীদগণের আত্মদান, বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন বৃথা যায়নি। 

    [সংকলিত]

       


    আপনার মন্তব্য লিখুন...
    Delicious Save this on Delicious

    nbs24new3 © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
    নিউজ ব্রডকাস্টিং সার্ভিস - এনবিএস
    ২০১৫ - ২০১৯

    উপদেষ্টা সম্পাদক : এডভোকেট হারুন-অর-রশিদ
    প্রধান সম্পাদক : মোঃ তারিকুল হক, সম্পাদক ও প্রকাশক : সুলতানা রাবিয়া,
    সহযোগী সম্পাদক : মোঃ মিজানুর রহমান, নগর সম্পাদক : আব্দুল কাইয়ুম মাহমুদ
    সহ-সম্পাদক : মৌসুমি আক্তার ও শাহরিয়ার হোসেন
    প্রধান প্রতিবেদক : এম আকবর হোসেন, বিশেষ প্রতিবেদক : এম খাদেমুল ইসলাম
    স্টাফ রিপোর্টার : মোঃ কামরুল হাসান, মাছুদ রানা ও সুজন সারওয়ার
    চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান : মোঃ রাকিবুর রহমান
    -------------------------------------------
    ৩৯, আব্দুল হাদি লেন, বংশাল, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
    ফোন : +৮৮ ০২ , +৮৮ ০১৭১৮ ৫৮০ ৬৮৯
    Email : nbs.news@hotmail.com, news@nbs24.org

    ইউএসএ অফিস: ৪১-১১, ২৮তম এভিনিউ, স্যুট # ১৫ (৪র্থ তলা), এস্টোরিয়া, নিউইর্য়ক-১১১০৩, 
    ইউনাইটেড স্টেইটস অব আমেরিকা। ফোন : ৯১৭-৩৯৬-৫৭০৫।

    প্রসেনজিৎ দাস, প্রধান সম্পাদক, ভারত।
    ভারত অফিস : সেন্ট্রাল রোড, টাউন প্রতাপগড়, আগরতলা, ত্রিপুরা, ভারত। ফোন : +৯১৯৪০২১০৯১৪০।

    Home l About NBS l Contact the NBS l DMCA l Terms of use l Advertising Rate l Sitemap l Live TV l All Paper

    দেশি-বিদেশি দৈনিক পত্রিকা, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে সংগৃহিত এবং অনুবাদকৃত সংবাদসমূহ পাঠকদের জন্য সাব-এডিটরগণ সম্পাদনা করে
    সূত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে প্রকাশ করে থাকেন। এ জাতীয় সংবাদগুলোর জন্য এনবিএস কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না।
    আমাদের নিজস্ব লেখা বা ছবি 'সূত্র এনবিএস' উল্লেখ করে প্রকাশ করতে পারবেন। - Privacy Policy l Webmail