ঢাকা, মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন
বন্দুক বিক্রি বাড়ছে শহরে, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী সংস্থাগুলিই ক্রেতা
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

বন্দুক বিক্রি বাড়ছে শহরে, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী সংস্থাগুলিই ক্রেতা

সুকমল শীল
আগে কিনতেন জমিদার ও স্থানীয় রাজা-রাজড়ারা। এখন ক্রেতা বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর ‘গানম্যান’রা। এইরকম সংস্থা এখন বাড়ছে। তাই বন্দুক বিক্রিও কিছুটা বেড়েছে।– এমনটাই বললেন ডালহৌসির ‘নরসিংহচন্দ্র দাঁ অ্যান্ড কোম্পানি’র অন্যতম স্বত্বাধিকারী সুদীপ দাঁ।

স্বাধীনতার পরে যথারীতি লুপ্ত হয়েছে ‘নেটিভ স্টেট’। জমিদারি বিলোপ আইনের ফলে জমিদারেরাও আর নেই। পাশাপাশি আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বন্যপ্রাণী শিকারও। স্বাভাবিক ভাবেই এর প্রভাব পড়েছিল বন্দুক ব্যবসার ওপর। তবে বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী এখন বাড়ছে। তাই পরিস্থিতি একটু ভাল, জানালেন সুদীপবাবু।


আজ থেকে ১৮৬ বছর আগে শুরুটা হয়েছিল গান-পাউডার আর ছররা বন্দুকের গুলি বিক্রি দিয়ে। বাঁকুড়ার কোতুলপুর থেকে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আসেন রামনারায়ণ দাঁ। তাঁর এক উত্তরপুরুষ নরসিংহচন্দ্র ১৮৩৫ সালে ওল্ড চিনেবাজার স্ট্রিটে দোকান খুললেন বন্দুকের।

তাঁদেরই উত্তরপুরুষ ও দোকানের অন্যতম স্বত্বাধিকারী সুদীপ দাঁ বলেন, ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দেশজুড়ে ছিল অনেক ‘নেটিভ স্টেট’। তাদের মধ্যে রেষারেষিও কম ছিল না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাজ্যের সুরক্ষার প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশীয় রাজা ও তাঁদের প্রতিনিধিরা আসতেন বন্দুক, গুলি–গোলা কিনতে। শিকারের বন্দুক তো ছিলই। বন্দুক–গুলির সঙ্গে লাইসেন্সও তখন আমাদেরই করিয়ে দিতে হত। সেই সব রাজাদের জন্যই অচিরেই দাঁড়িয়ে গেল নরসিংহচন্দ্রের বন্দুকের দোকান।’

পরে চিনেবাজারের ছোট জায়গা ছেড়ে দোকান উঠে এল সাবেক ডালহৌসি স্কোয়ার ইস্ট অঞ্চলে, এখন ঠিকানা, ৬৪ এ হেমন্ত বসু সরণি।


সে যুগে এ দেশে ব্যক্তিগত মালিকানার বন্দুক তৈরির কারখানা ছিল না। ইংল্যান্ড ও জার্মানি থেকে আমদানি করতে হত বন্দুক ও তার বিভিন্ন সরঞ্জাম। কলকাতায় আর বি রডা অ্যান্ড কোং, ম্যান্টন অ্যান্ড কোং নামের সব সাহেবি দোকানও ছিল বন্দুক বিক্রির। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ব্যবসা করতে হত নরসিংহচন্দ্র দাঁয়ের দোকানকে।

নরসিংহচন্দ্রের পরে ব্যবসার হাল ধরেন তাঁর তিন ছেলে আশুতোষ, নীলমাধব ও নন্দলাল। চাহিদা বাড়তে থাকায় বড় ছেলে আশুতোষ ধর্মতলার মোড়ে ‘এ টি দাঁ অ্যান্ড কোং’ নামে নতুন দোকান খোলেন।

ক্রমে একনলা ও দোনলা ‘মাদার লোডিং গান’ বিক্রি আরম্ভ হল। একেবারে প্রথম যুগের ওই বন্দুকে গুলি বের হওয়ার মুখ দিয়েই গান–পাউডার (বারুদ), টিকলি, ছিটে (লোহার টুকরো) ও ভুষি পুরে দেওয়া হত। তার পরে ট্রিগার টানলে ওই নল দিয়েই ‘ছিটে’ বা গুলি ছুটে যেত লক্ষ্যে।

সিপাহি বিদ্রোহের সময় এল ‘ব্রিচ লোডিং গান’ বা টোটাদার বন্দুক এবং রিভলভারও। ওই বন্দুকে গুলি আর বারুদ আলাদা করে ভরতে হত না, টোটার মধ্যেই পোরা থাকত গুলি–বারুদ। এক বা দোনলা বন্দুকের পিছন দিকে ওই টোটা ভরে ট্রিগার টানলে গুলি ছুটে যেত। ছোট এক রকম কামানও তাঁরা বিক্রি করতেন। উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কোম্পানির তৈরি মাত্র ১৭ ইঞ্চি লম্বা সেই কামান দেগেই আজও সূচনা হয় দাঁ বাড়ির সন্ধিপুজো।

এখন ব্যবসা চলে? সুদীপবাবু জানালেন, ‘বন্দুকের চাহিদা এখনও আছে। রাজ্যের ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন অনেক নতুন দোকানও হচ্ছে। সেখানেও আমরা বন্দুক সরবরাহ করি।’ তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ব্যবসায়ী, বিখ্যাত ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হওয়া বিভিন্ন সিকিউরিটি এজেন্সি বা ওই রকম সংস্থার প্রয়োজনীয় বন্দুকও যায় এখান থেকে। পাশাপাশি রয়েছে নানা রকম এয়ারগান বিক্রি। এই বন্দুক কিনতে লাইসেন্স লাগে না, দামও কম। বন্দুক আসে মূলত বিহারের মুঙ্গের, জম্মু-কাশ্মীরের খাটুয়া ও উত্তরপ্রদেশ থেকে।

এখন বন্দুক কেনার শর্তগুলি কী, সুদীপবাবু বললেন, ‘ দেশের অন্য রাজ্যের তুলনায় এই রাজ্যে বন্দুক পাওয়া কঠিন। কলকাতায় হলে লালবাজারে লাইসেন্সের আবেদন করতে হয়। আবেদনের খরচ দেড় থেকে দু’হাজার টাকা। সেখান থেকে অনুমতি নিয়ে এসে দোকানে বন্দুক পছন্দ করেন ক্রেতারা। বন্দুক ও রাইফেলের দাম শুরু ১০ হাজার টাকা থেকে। পিস্তল ও রিভলবার ৯০ থেকে ১ লক্ষ টাকা। এরপর আমরা ক্রেতার হয়ে পারমিটের আবেদন করি। এরপর সেই পারমিট পেলে আমরা বিক্রি করতে পারি। ব্যাক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য এখন সরকারি কারখানাগুলিতে বিভিন্ন ছোট স্বয়ংক্রিয় পিস্তল, রিভলবার তৈরি হচ্ছে। সেগুলোর বিক্রিও ভাল।’  খবর ওয়ালের  / এনবিএস /২০২১/ একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *