ঢাকা, শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১১:২০ পূর্বাহ্ন
বিস্মৃত আফ্রিকার স্থাপত্যশিল্পের ঐতিহ্য গ্রেট জেনি
রাকিবুল ইসলাম রাফি

বিস্মৃত আফ্রিকার স্থাপত্যশিল্পের ঐতিহ্য গ্রেট জেনি

গ্রেট জেনি মসজিদ মাটির তৈরি ভিন্ন একটি দর্শন যা কিনা পৃথিবীব্যাপী সুদানো-সাহেলিয়ান স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত এবং বিবেচিত। মসজিদটি বানী নদীর বন্যা প্রবন সমতল এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে মসজিদটির দৃশ্যমান কাঠামো আসলে ১৯০৭ সালের পুননির্মিত। তবে এর সূচনা বেশ অনেক আগে আজ পর্যন্ত যার নির্ভরযোগ্য কোনো তারিখ পাওয়া যায়নি।

১২'শ সালের প্রথমদিকে জেনির তৎকালীন শাসনকর্তা কানবুরু ইসলাম গ্রহন করেন। তিনি নিজের রাজকীয় প্রাসাদ ছেড়ে দেন মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এবং এটাই আসলে এই মসজিদের সূচনা বলে ধারণা। ১৮৯৩ সালে সাংবাদিক ফেলিক্স ডুবোই শহরটি ভ্রমন করে এই মসজিদের ধ্বংসস্তুপ সম্পর্কে বর্ননা দেন।

১৮১৮ সালে ফুলানী উপজাতি নেতা সেকু আমাদু মসজিদের দূরাবস্থা দেখে নতুনভাবে মসজিদটি পুননির্মাণ করার পরিকল্পনা করেন। বর্তমান মসজিদের সামনে স্থানীয় নেতাদের যে কয়েকটি সমাধি দেখা যায় এই সীমানা পর্যন্ত মূল মসজিদ বিদ্যমান ছিল। একই সময় আশে পাশের কিছু ছোট মসজিদ বন্ধ করিয়ে জেনি মসজিদকে কেন্দ্রীয় মসজিদের মর্যাদা দেন। এই মসজিদের উচ্চতা অনেক কম ছিলো এবং কোন ধরনের মিনারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

১৯০৬ সালে যখন মসজিদের বড় ধরনের মেরামতের প্রশ্ন আসে তখন মূল মসজিদের স্থলে পুনরায় মসজিদ নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেকু আমাদু যেখানে মসজিদ স্থানান্তর করেছিলেন সেটা ব্যবহৃত হতে থাকে মাদ্রাসা হিসেবে।

১৯০৭ সালে মতান্বরে ১৯০৯ সালে এ কাজ শেষ হয়। ২৪৫ ফিট মাপের বর্গাকৃতির একটি ভিত্তির উপরে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভিত্তি সাধারন ভূমি লেভেল থেকে প্রায় নয়ফুট উচুঁ। বানী নদীর বন্যা থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থা। চতুর্দিকে ছয়টি আলাদা সিড়ি দিয়ে এই উচুঁ ভিত্তির উপরে উঠা যায়। সিড়িগুলো পিনাকলস দ্বারা অলংকৃত। ভবনের উত্তর দেয়ালে প্রধান প্রবেশ পথ। নির্মান ত্রুটির জন্যই হোক আর জায়গা সহজলভ্যতার অভাবে হোক মসজিদের নকশা একদম সমকোনে করা যায়নি । চতুর্দিকের আউটলাইন একটু ট্যাপিজিয়াম ধাচের হয়ে পড়েছে।

আফ্রিকার কিবলা হচ্ছে পূর্ব। প্রজেক্টের পূর্ব অংশ হচ্ছে মুল মসজিদ আর পশ্চিম অংশ হচ্ছে অভ্যন্তরীন উঠোন মসজিদের পরিভাষায় যেটিকে শান বলা হয়। পশ্চিম গ্যালারী মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। পূর্ব দিকের কেবলামুখী দেয়ালের পুরুত্ব হচ্ছে তিন ফিট। এই দেয়ালকে মজবুত করার জন্য আঠারোটি পায়ার মত সংযুক্ত করা হয়েছে যার প্রত্যেকটির মাথায় একটি করে পিনাকেল। তিনটি টাওয়ার দেয়াল থেকে একটু বের হয়ে আছে। মাঝের টাওয়ারের বর্ধিত অংশে মেহরাবের অবস্থান।

উত্তর দক্ষিণ বরাবর প্রলিম্বত কোনাকৃতির আর্চওয়ে সমৃদ্ধ নয়টি দেয়ালের উপর ভর দিয়ে বসানো হয়েছে মসজিদের ছাদ। মাটির দেয়াল হবার কারনে খুব বেশি জানালা দেয়ার সুযোগ হয়নি। দুটো সিড়ি সরাসরি ছাদে উঠে গেছে। এর একটি মসজিদ হলের দক্ষিন পশ্চিম কর্নারে এবং অপরটি উত্তর দেয়ালে প্রধান প্রবেশ পথে সংলগ্ন। দ্বিতীয়টিতে মসজিদের বাইরে থেকে সরাসরি প্রবেশ করতে হয়। ছাদের উপরে ছোট ছোট ছিদ্র ছিদ্র আছে যার মুখে মাটির কলসির মত পাত্র বসানো এবং এর মুখ ঢাকা। গরমের বাতাস বেড়োনোর জন্য প্রয়োজনে এর মুখ খুলে দেয়া যায়।

গ্রেট জেনি মসজিদ আফ্রিকার স্থাপত্য চরিত্রে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নির্মান সময়কালে মালি ফরাসী শাসনযন্ত্রের আওতায় ছিলো বিধায় এতে ফরাসী স্থাপত্যের একটা ছাপ পাওয়া যায়। কেউ কেউ একে আফ্রিকান স্থাপত্য বলে মেনে নেয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে মসজিদের বাহ্যিক দর্শনে ফরাসী স্থাপত্যের ছাপ যতটা স্পষ্ট মুসলিম স্থাপত্য ততটাই উপেক্ষিত হয়। ১৯১০ সালে ফেলিক্স ডুবোই যখন পুনরায় মসজিদ পরিদর্শনে আসেন তখন মসজিদের এই চেহারার পরিবর্তন দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। তার দৃষ্টিতে এটি ছিলো একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।

গ্রেট মসজিদের দেয়ালের অবকাঠামো নির্মাণ কাজে রোদে পোড়া ইট, বালু ও এটেল মাটির মিশ্রনে তৈরী মসলার পলেস্তারা ব্যবহার করা হয়েছে। দেয়ালের উপরের দিকে সারা গায়ে পাম গাছের গুড়ি বের করা। যে কারণে মেরামতের সময় বাঁশ, কাঠ দিয়ে মাচা বানানোর প্রয়োজন পড়েনা।

মাটির মসজিদ মালির মুসলিম সমাজের দিনযাপনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে। ফরাসী উপনিবেশিকরা যখন এই স্থাপনা দেখে ভালো নির্মানর জন্য তারা অর্থ সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এই মাটির স্থাপনা তাদের গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিবছর এর মেরামত উৎসবে অংশ নিতে পারাটা বরং তাদের জন্য উত্তম ও সম্মানজনক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথমে প্লাস্টার প্রস্তুত করা হয়। উপরের অংশে কাজের জন্য একটি গ্রুপ ভবনের গায়ে চড়ে এবং নিচে থেকে মসলা তুলে দেবার জন্য আরেক গ্রুপ কাজ করে। মসজিদের আশপাশে বসবাসকারী জনপদের মহিলারাও বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহন করে।

১৯৮৮ সালে মসজিদসহ পুরো জেনি শহরটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। মালিতে আরো কিছু মসজিদ আছে যা গ্রেট জেনি মসজিদের চেয়েও পুরাতন তবে নির্মান শৈলী এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারনে গ্রেট জেনি মসজিদটিই জেনি শহর এবং পুরো মালির জন্য বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *