ঢাকা, সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:০৮ অপরাহ্ন
কাঁটাতারের বেড়া: প্রতিশ্রুতি অনেক, বাস্তবতা ভিন্ন
রাকিবুল ইসলাম রাফি

কাঁটাতারের বেড়া: প্রতিশ্রুতি অনেক, বাস্তবতা ভিন্ন

সীমান্তে বিএসএফের প্রহরাই যথেষ্ট নয়, আছে কাঁটাতারের বেড়াও। ভারতের উচ্চ পর্যায় থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও সীমান্তে বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা বন্ধ হয়নি। এমনকি সীমান্ত হত্যা বন্ধে কোনও দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেনি তারা। দুই দেশের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বন্ধুরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার এধরনের উদাহরণ খুব কম। ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়ায় কোথাও কোনও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি প্রতিবেশির সঙ্গে সমস্যার সমাধান না করা যায়, তাহলে জাতিসংঘে যাওয়ার বিকল্প নেই।

২০০৮ সালে ভারত সরকার ও বিএসএফ বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করেছিল যে, সীমান্তে প্রাণঘাতী কোনও অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচারকারী ও অবৈধপথে সীমান্ত পার হওয়া নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার চুক্তিও করে৷ ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার কথা বলা হয় বার বার৷

এরপরও চলছে সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যা। মানবাধিকার সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ সালে ২৪ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে ২৭ জন, ২০১৪ সালে ৩৩ জন, ২০১৫ সালে ৪২ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন, ২০১৮ সালে ১১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি ও নির্যাতন করে হত্যা ও বিএসএফের নির্যাতনে আহত হয়েছেন আরও ৬৮ জন। ২০১৯ সালে ৪১ জন, ২০২০ সালে ৫২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি ও নির্যাতন করে হত্যা করেছে বিএসএফ।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে মারা গেছেন ১০৪৮ জন বাংলাদেশি। ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভারতীয়দের হাতে ১৭৯ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, ২০০০-২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কমপক্ষে ১,২৩০ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে শুধু আহত নিহত নয় গত পাঁচ দশকে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৫ জন বাংলাদেশী নারী।

বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকজন মানবাধিকার কর্মীর সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা হলে তারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত দুপক্ষই যেখানে সংশ্লিষ্ট, সেখানে বারবার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হচ্ছে। দুই দেশ পরস্পর যা বলছে, তা কার্যকর কেন হচ্ছে না, সে প্রশ্ন করা জরুরি। তারা তো বন্ধুরাষ্ট্র। ভারতের সঙ্গে থাকা আর কোনও সীমান্তে এধরনের পরিস্থিতি হচ্ছে না। নেপালে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বর্ডার আছে, সেখানে তো এসব হচ্ছে না। বাংলাদেশ সীমান্তে হচ্ছে কেন? বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। দ্বিপাক্ষিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটি রাখেনি।

ভারত বলেছিল, সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না। কিন্তু যেটি দৃশ্যায়ন চিত্র, সেটি মুখের বুলি হলো। এখনও প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন খুবই চমৎকার বলে মনে করা হয়। 

১৯৭১ পরবর্তী ফারাক্কা বাঁধ, সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারতীয় সাহায্যসহ বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বেশ উষ্ণ বলেই প্রচার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ততটা সুখকর বলে মনে হয় না। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এই দাবির যৌক্তিকতাকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে উভয় সরকারের মাথাব্যথা না থাকলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত সম্পর্কে বিরূপ ধারণা ক্রমেই বাড়ছে। সীমান্তে চোরাচালান ও বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিতর্কিত ‘শ্যুট-অন-সাইট’ নীতি দীর্ঘ দিন থেকেই অনুসরণ করে আসছে। ফলে বিএসএফকে কারণে-অকারণে বাংলাদেশী নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করার অবাধ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ সালে ফালানী হত্যা ঘটনার পরেও বিএসএফ দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে। বিচার এমনভাবে হয়েছে যে, দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠিত করেছে। একদিকে ফালানীর মামলা নষ্ট হয়েছে, আরেকদিকে রিটটিও সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে। এধরনের হত্যা বন্ধের জন্য যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হচ্ছে না।

ভারতের সঙ্গে নেপাল, চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। ওইসব সীমান্তে মাসের পর মাস, দিনের পর দিন এধরনের হত্যার ঘটনা ঘটে না। ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়ায় কোথাও কোনও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। এটা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্থাৎ জাতিসংঘের দ্বারস্থ হতে হবে। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি প্রতিবেশির সঙ্গে সমস্যা সমাধান না করা যায়, তাহলে জাতিসংঘে যেতে হবে। এর বিকল্প কিছু দেখা যাচ্ছে না।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *