ঢাকা, শনিবার ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন
রাজবাড়ীতে বাড়ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি
রাকিবুল ইসলাম রাফি

রাজবাড়ীতে বাড়ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে রাজবাড়ী জেলা। এখানে দলগত সশস্ত্র তৎপরতা, মাদক-মানবপাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ বাণিজ্য ও দোকান দখল থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায়ও ব্যবহার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলায় নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা বিস্তারে দেশীয় নানা অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে একশ্রেণির সন্ত্রাসী। চলতি মাসেই র‍্যাব-পুলিশের একের পর এক অভিযানে উদ্ধার করা হয় বেশ কয়েকটি দেশীয় ও বিদেশি অস্ত্র।

এখানকার প্রভাবশালী রাজনীতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা লোক থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় নামধারী ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অবৈধভাবে পাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও আধিপত্য বিস্তারে। এমনকি অবৈধভাবে ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে এসব অবৈধ অস্ত্র। প্রকাশ্যে এসব অস্ত্র উঁচিয়ে একদিকে যেমন ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, তেমনি ব্যবহার হচ্ছে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এমনকি সরকারি উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতেও। এসব অস্ত্র দিয়ে ঘটছে খুনও।

রাজবাড়ীর এক এমপি (সংসদ সদস্য) পুত্রের বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত মহলে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষমতার অস্তিত্ব জাহির করতে ছবি দিয়ে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারেও তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী এক এমপি (সংসদ সদস্য) পুত্র বৈধ অস্ত্রের ব্যবসায় নিয়োজিত। এই সুযোগে জেলার সিংহভাগ অবৈধ অস্ত্র ও অর্থের যোগান দেয় সে। গত ২০২০ সালের মার্চের প্রথমদিকে পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রাসেল সহ আরো তিনজনের হাতে ওই এমপির পাংশার বাসভবন থেকে তুলে দেওয়া হয় লাইসেন্স বিহীন নাইন এমএম মডেলের পাঁচটি বিদেশি অস্ত্র। গত ২০১৮ সালের প্রথমদিকে রাজবাড়ী জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বিকাশ নামের এক সন্ত্রাসীর সংগ্রহে থাকা দুটি বিদেশি সহ মোট চারটি আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হয় এমপি পুত্রের তহবিলে। এছাড়াও ২০১৯-২০২০ বছরে পাংশা উপজেলায় আনুমানিক ৬৩টি বিদেশি মডেলের অবৈধ অস্ত্রের যোগান দেয় এমপি পুত্র।

গোপনীয় একটি সূত্র থেকে জানা যায়, জেলার পাংশা, কালুখালি ও বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে এসব অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। যার মূল হোতা এমপি পুত্র। নিজের তহবিলে থাকা অবৈধ দেশীয় ও বিদেশী অস্ত্র বিভিন্ন কৌশলে পৌঁছে যায় বরাদ্দ থাকা ব্যক্তির নামে। প্রতিটি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে এসব অস্ত্রের প্রধান দাতা এমপি পুত্র। এছাড়া কিছু দুর্বৃত্তের সহায়তা নিয়েও জেলার পাংশা এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের মালিকদের নিকট থেকে বিভিন্ন অবিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটানোর মধ্য দিয়ে তারা সংগ্রহ করছে আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র।

জেলার বেশ কয়েকটি এলাকার কিছু যুবকের অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করার তথ্য পুলিশের কাছেও রয়েছে। এসব অস্ত্র ক্ষমতাসীন দলের পদে থাকা কিছু যুবকের হাতে রয়েছে, সে তথ্যও আছে। তবে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অজানা কারণে প্রশাসনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে জানা যায়। 

র‌্যাব সূত্র জানায়, তারাও মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু অস্ত্রধারীকে আটক করেছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বিদেশি শর্টগান, পিস্তল, গুলি, শর্টগানের কার্তুজ, পিস্তলের ম্যাগজিন প্রভৃতি।

জেলার পাংশা উপজেলায় সরেজমিন গেলে স্থানীয়রা জানান, এই এলাকায় মাদকসহ নানা ধরনের অবৈধ ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করেই এই অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। এই গ্রুপগুলোর সঙ্গে এমপি পুত্রের যোগাযোগ থাকার দাবি করেছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে এর পেছনে দেশ পলাতক স্থানীয় কয়েকজন গডফাদারের ইন্ধন থাকার অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, এই পাংশা উপজেলা সহ এর আশপাশের সন্ত্রাসী  গ্রুপগুলোর অস্ত্রের প্রধান উৎস কুষ্টিয়া পেরাকপুর বর্ডার ও পাবনা। রাতে পাংশার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অবস্থা দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার।

তারা আরও জানান, বিভিন্ন সীমান্তপথে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। এগুলো আসার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের হাত রয়েছে। জেলার কিছু রাজনৈতিক হাইব্রিড পরজীবী মানুষ এর ওপর ভর করে নিজেদের রাজনীতি চাঙা রাখতে চান। আর রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের ছায়া থাকায় ছোট-বড় সব সন্ত্রাসীর হাতে সহজেই চলে যাচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। গ্রাম-এলাকার উঠতি মাস্তানরাই শুধু নয়, ছিঁচকে চোররাও ব্যবহার করছে এসব অস্ত্র। যাদের বেশিরভাগই এমপি পুত্রের অনুসারী বলে জানা গেছে। বিষয়টি এলাকায় ওপেন সিক্রেট হলেও ভয়ে কেউ এব্যাপারে কথা বলতে সাহস পায় না। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জনপ্রতিনিধিরাও এজন্য বিব্রতবোধ করেন।

এই জেলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও কমছে না অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। রাতের আঁধারে কয়েকটি এলাকার পরিবেশ যার প্রমাণ। এজন্য প্রতিটি এলাকায় বিশেষ অভিযান প্রয়োজন।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *