ঢাকা, শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন
‘‌শেরশাহ’‌ হতাশ করবে না দর্শকদের: সিদ্ধার্থ মালহোত্রা চাক্ষুস করালেন ক্যাপ্টেন বাত্রাকে
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

‘‌শেরশাহ’‌ হতাশ করবে না দর্শকদের: সিদ্ধার্থ মালহোত্রা চাক্ষুস করালেন ক্যাপ্টেন বাত্রাকে

কারগিল যুদ্ধ নিয়ে বলিউডে এই প্রথমবার সিনেমা তৈরি হয়েছে এমনটা কিন্তু নয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ২০০৩ সালে জেপি দত্তা পরিচালিত '‌এল ও সি কার্গিল’‌। এই ছবিতে ক‌্যাপ্টেন 'বিক্রম বাত্রা’-র চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিষেক বচ্চন। আর কারগিল যুদ্ধে ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রার ভূমিকা কি ছিল, যাঁর অদম্য চেতনা ও অতুলনীয় সাহস ভারতের বিজয়ে ব্যাপক অবদান রেখেছে, তাই নিয়েই তৈরি হয়েছে '‌শেরশাহ’‌। যাঁর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সিদ্ধার্থ মালহোত্রা।

কঠিন পার্বত্য অঞ্চলে এখনও পর্যন্ত সেরা যুদ্ধের তালিকায় কারগিল শীর্ষস্থানে রয়েছে। ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় চলা এই ঐতিহাসিক লড়াই খুবই ঝুঁকিসম্পন্ন ছিল। কাশ্মিরী জঙ্গিদের ছদ্মবেশে পাকিস্তানি সেনারা নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করে নিয়ন্ত্রণ রেখা দিয়ে ভারতের দিকে ঢুকে পড়ে। সংঘর্ষ দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, যেখান থেকে এক সৈনিকের লেফটেন্যান্ট থেকে ক্যাপ্টেন হওয়ার সফর, যা তাঁর সাহসী মনোভাব ও সংঘর্ষের সর্বোচ্চ পয়েন্টে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার দেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে। এই কারণের জন্য যদি নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় তাতেও খেদ নেই। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই পরিচালক বিষ্ণু বর্ধন ও তাঁর লেখক সন্দীপ শ্রীবাস্তব বিষয়টিকে অত্যন্ত ধীরগতিতে চালনা করতে শুরু করে।

বলিউডে যে ফর্মুলা মেনে ভার-পাকিস্তানের যুদ্ধের সিনেমা তৈরি হয় তার থেকে কোনও অংশে আলাদা নয় ‘‌শেরশাহ'‌। তবে এই ছবির ফ্লেভার একটু আলাদা। কারণ এখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বিক্রম বাত্রার জীবনী। যাঁর আত্মত্যাগ ভারতকে কারগিল জয়ের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল। পালমপুরের শিক্ষকের ছেলে কীভাবে বিক্রম বাত্রা হয়ে উঠলেন সেই গল্প দেখতে খুব একটা মন্দ লাগবে না। ছবিতে ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রার শৈশবকাল থেকে তাঁর বেড়ে ওঠা, জীবনে ডিম্পল চিমার (‌কিয়ারা আদবাণী)‌ ভালোবাসা পাওয়া এবং ১৯৯৯ সালে ১৩ জ্যাক রাইফেলসে নিযুক্ত হয়ে কাশ্মীরের সোপিয়ারেতে পোস্টিং সবই সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিক্রম বাত্রার কোড নেম ছিল ‘‌শেরশাহ'‌ এবং প্রথম মিশনে জয়ী হওয়ার পর সাফল্যের কোড ছিল ‘‌ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর'‌। যুদ্ধের দৃশ্য এখানে দারুণভাবে শুট করা হয়েছে সেই কারণে শেরশাহ দেখতে গিয়ে বোর হয়ে যাবেন না। বরং রোম্যাঞ্চকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

চরিত্রের সফরটিকে আরও জোরদার বানানোর চেয়ে কিয়ারা আদবানীর রোম্যান্টিক গানে অভিনয়ের ওপর যেন বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ডিম্পল চিমার চরিত্রে কিয়ারা আডবানী যতটা ফুটেজ পেয়েছেন, বিশেষ করে গানের দৃশ‌্যে, তার চেয়ে ‘বিক্রম বাত্রা'-র সহযোদ্ধা ক‌্যাপ্টেন সঞ্জীব জামাল এবং অন‌্যদের ওপর আরও নজর দেওয়া উচিত ছিল। এতে ছবির গুরুত্ব কিছুটা হলেও কমেছে। এছাড়াও ছবির প্রথমাংশ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়েছে। অবশ্যই পরিচালক বিষ্ণু বর্ধনের কারগিল যুদ্ধের প্রচুর পরিমাণে তথ্য এবং মাইলফলকগুলির সঙ্গে ন্যায় বিচার করা খুবই বিশাল কাজ ছিল, কিন্তু কারগিল যুদ্ধের বেশিরভাগ অংশই দ্বিতীয়ার্ধে দেখানো হয়েছে।

যুদ্ধের দৃশ্যগুলিতে সিদ্ধার্থ মালহোত্রা দারুণভাবে অভিনয় করেছেন এবং গোটা সিনেমাজুড়ে তিনি তাঁর ১০০ শতাংশ এই ছবিতে দিয়েছেন। সিদ্ধার্থ একেবারে বিক্রম বাত্রার চরিত্রে ঢুকে গিয়ে পুনরায় চরিত্রটিকে দর্শকদরে সামনে নিয়ে আসতে ভীষণভাবে সফল হয়েছেন। অন্যদিকে কিয়ারা আদবানী একজন সরদার্নির ভূমিকায় যথেষ্ট যোগ্য ছিলেন, যিনি তাঁর ভালোবাসার মানুষকে মন দিয়ে ভালোবাসেন। কিন্তু কিয়ারা এই ছবিতে অভিনয়ের খুব বেশি সুযোগ পাননি। কলকাতার অভিনেতা শতাফ ফিগারকে আমরা দেখি কর্নেল যোগেশকুমার জোশীর চরিত্রে। স্বল্প পরিসরে তাঁকে মন্দ লাগেনি। ছবির অন্যান্য চরিত্রগুলিতেও অভিনেতারা নিজেদের দক্ষতা দেখিয়েছেন।

ছবিটি সবমিলিয়ে দেশাত্মবোধের অনুভূতি উচ্চস্থানে রয়েছে। ১৫ অগাস্টের আগে এ ধরনের ছবি মুক্তি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক যুদ্ধের দৃশ্য সেভাবে প্রচিফলিত হয়নি, হয়ত বড়পর্দায় তা দারুণভাবে ফুটে উঠতে পারত। প্রসঙ্গত, বলিউডে যুদ্ধ নিয়ে আগেও অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে , তবে সেদিক দিয়ে ‘‌শেরশাহ'‌ সকলের থেকে এগিয়ে। সিনেমার উৎসটি খুবই জোরালো, যেখানে একজন সৈনিক নিজের পোশাকের মান রেখে ভারতভূমিকে রক্ষা করেছেন শত্রুদের হাত থেকে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে বৃহস্পতিবারই মুক্তি পেতে চলেছে ‘‌শেরশাহ'‌।

ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, পিভিসি, ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ কর্মকর্তা ছিলেন, ১৯৯৯ এর কারগিল যুদ্ধের সময় তাঁর সাহসী কর্ম ও বীরত্বের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ সামরিক পুরস্কার পরমবীর চক্র দ্বারা মরণোত্তর ভাবে ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু জানেন কী এই বায়োপিকের নাম কেন ‘‌শেরশাহ'‌ রাখা হয়?‌

ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা কমবাইনড ডিফেন্স সার্ভিস (‌সিডিসি)‌ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন ১৯৯৫ সালে স্নাতক হওয়ার পর। ১৯৯৬ সালে তিনি সিডিসিতে পাশ করেন এবং ভারতীয় সেনা অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। ১৯ মাসের প্রশিক্ষণ কোর্সটি শেষ করার পরে, ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি আইএমএ থেকে স্নাতক হন এবং ১৩ তম ব্যাটেলিয়ন, জম্মু ও কাশ্মীর রাইফেলস (১৩ জ্যাক রাইফেল) -এর লেফটেন্যান্ট হিসাবে কমিশন লাভ করেন‌। এরপর তাঁকে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে ক্যাপ্টেন পদে উত্তীর্ণ করা হয়। ১৯২ মাউন্টেন ব্রিগেডের ৮ মাউন্টেন বিভাগের অধীনে কাশ্মীরে জঙ্গি-বিরোধী মেয়াদ শেষ করার পরে ১৩ জ্যাক রাইফেলস উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে যাওয়ার আদেশ পেয়েছিলেন। মেজর যোগেশ কুমার জোশীর নেতৃত্বে ব্যাটেলিয়নের অগ্রণী দলটি তার গন্তব্যে পৌঁছেছিল, কিন্তু ৫ জুন কারগিল যুদ্ধের সূত্রপাতের কারণে, তাঁর মোতায়েনের আদেশ পরিবর্তন করা হয় এবং ব্যাটেলিয়নটি জম্মু ও কাশ্মীরের দ্রাসে যাওয়ার নির্দেশ পায়। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রার ডেল্টা কোম্পানির কাছে ৫১৪০ পয়েন্ট অধিকার করার জন্য ১৯ জুন আদেশ আসে। বিক্রম বাত্রার কোড নেম ছিল ‘‌শেরশাহ'‌। ক্যাপ্টেন বাত্রা সহ তাঁর ডেল্টা কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেন যে শত্রুপক্ষের ওপর আচমকা হামলা করতে হবে।

মৃত্যুর একদিন আগে ক্যাপ্টেন বাত্রা এক পাকিস্তানি সেনার থেকে হুমকি পান। তিনি রেডিও যোগাযোগে বাত্রাকে বলেন, ‘‌শেরশাহ, তুমি কি আসবে?‌ এদিকে আসার চেষ্টাও করো না'‌। আর এটাই বাত্রা ও তাঁর দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের চ্যালেঞ্জ করছেন তা যেন মেনে নিতে পারেননি বাত্রা। ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায়, ক্যাপ্টেন বাত্রা এবং তার দল পিছন থেকে পাহাড়ের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যাতে তাঁরা শত্রুদের অবাক করে দিতে পারেন। তাঁরা পাথুরে চূড়ায় আরোহণ করলেও যখন তাঁরা চূড়ার কাছাকাছি এসেছিল, তখন পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বাহিনীরা মেশিনগানের গুলির সাহায্যে তাদের পাহাড়ের মুখে আটকে দিয়েছিল। যতবারই তাঁরা চূড়ায় আরোহণ করে এবং চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছায় পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের মেশিনগানের অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে চূড়ার মুখে লাগিয়ে দেয়, এতে সাহসী ভারতীয় সৈন্যরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন এবং ক্যাপ্টেন বাত্রা সহ পাঁচজন সেনা উপরে উঠে যায়। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা একা তিনজন সেনাকে গুলি করে মারেন খুব কাছ থেকে এবং গুলি বিনিময়ের সময় বাত্রা আহত হন। তিনি পুনরায় দল গঠন করে মিশন চালানোর নির্দেশ দেন। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর দলকে মিশন লড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকেন। ১৯৯৯ সালের ২০ জুন ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ৫১৪০ পয়েন্ট ভারতীয় সেনার দখলে চলে আসে। কিন্তু তার জন্য মাশুল দিতে হয় ক্যাপ্টেন বাত্রাকে।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *