ঢাকা, শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন
ফুসফুস প্রতিস্থাপনে এগোচ্ছে পিছিয়ে থাকা কলকাতা, ভরসা দিচ্ছেন নামী চিকিৎসকেরা
চৈতালী চক্রবর্তী

ফুসফুস প্রতিস্থাপনে এগোচ্ছে পিছিয়ে থাকা কলকাতা, ভরসা দিচ্ছেন নামী চিকিৎসকেরা

অপেক্ষার শেষ কি তবে হতে চলেছে? এত দিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় হয়ত সফল হবে আগামী দিনে? তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের স্ত্রী-র ফুসফুস প্রতিস্থাপন হবে। শহরের একটি অভিজাত হাসপাতাল থেকে তাঁকে চেন্নাই নিয়ে যাওয়া হয়েছে দিন কয়েক আগে। সেই সূত্রেই দ্য ওয়াল খোঁজ নিল, ফুসফুস প্রতিস্থাপনে কোথায় দাঁড়িয়ে কলকাতা? জানা গেল অঙ্গদান ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনে পশ্চিমবঙ্গ এখন অনেকটা এগোলেও হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিতে দক্ষিণ ভারতে পাল্লা বেশ কিছুটা ভারী।

কলকাতায় এত নামী দামি হাসপাতাল ও অভিজ্ঞ পালমোনোলজিস্টরা থাকা সত্ত্বেও ফুসফুস প্রতিস্থাপন বা লাঙ ট্রান্সপ্লান্টের কাজ এখনও শুরুই করা যায়নি। ফুসফুস প্রতিস্থাপনের দরকার হলে ছুটতে হয় চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু বা মুম্বইতে। দেশের মেট্রো শহরগুলির মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকাঠামো কোনওদিক থেকেই পিছিয়ে নেই কলকাতা। তাহলে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটা কোথায়?

ইনস্টিটিউট অব পালমোকেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ পার্থসারথি ভট্টাচার্য বললেন, হৃদপিণ্ড, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের থেকে অনেকটাই জটিল ফুসফুস প্রতিস্থাপন। প্রথমত ‘ব্রেন ডেথ’ ব্যক্তির ফুসফুস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রিন করিডর করে নিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাপন করার দরকার পড়ে। হাতে সময় থাকে চার থেকে ছ’ঘণ্টা। প্রতিস্থাপনের জন্য পরিকাঠামো, হাসপাতালের সেটআপ এবং প্রতিস্থাপন পরবর্তী সময় রোগীর শরীরে যে ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, এইসব কিছুর এখনও ঘাটতি রয়েছে কলকাতায়।

তাছাড়া ফুসফুস প্রতিস্থাপন করতে হলে লাইসেন্স দরকার হয়। স্বাস্থ্য দফতরের তরফে হাসপাতালের পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে প্রতিস্থাপন কমিটির সঙ্গে আলোচনার পরেই এই লাইসেন্স দেওয়া হয়। কলকাতার অনেক হাসপাতালই এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। অনুমতি পেয়ে গেলে আমাদের শহরেও ফুসফুস প্রতিস্থাপনে আর কোনও সমস্যা থাকবে না। তবে এর জন্য সরকারি উদ্যোগ ও কর্পোরেট সেক্টরগুলির এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল ফুসফুস প্রতিস্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য দফতরের অনুমতি পেয়েছে। একমাত্র সরকারি হাসপাতাল হিসাবে আগেই সেখানে কিডনি, লিভার, ত্বক প্রতিস্থাপন হত। এখন রাজ্যের একমাত্র ফুসফুস প্রতিস্থাপন কেন্দ্র হতে চলেছে এসএসকেএম। বছর খানেক আগে অবশ্য হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে আর এক সরকারি হাসপাতাল, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিগত কয়েকবছরে অনেকটাই এগিয়েছে কলকাতা। স্বাস্থ্য দফতর ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে গ্রিন করিডর করে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোথাও ব্যাঙ্ক তৈরি করে অঙ্গ সংরক্ষণের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কোভিডের সময়েও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের নজির তৈরি হয়েছে মহানগরীতে। কিডনি, লিভার, হার্ট, চোখ, ত্বক প্রতিস্থাপন হলেও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের জন্য এখনও ভিন রাজ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

পরিকাঠামোর পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও কি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠেছে? এই ব্যাপারে বুঝিয়ে বলেছেন কলকাতার বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট, ফর্টিস হাসপাতালের রেসপিরেটারি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ অলোক গোপাল ঘোষাল বলেছেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাফল্য নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপরে—এক, হাসপাতাল, দুই, হসপিটালিটি বা ম্যানেজমেন্ট। হাসপাতাল ও তার পরিকাঠামো কলকাতায় আছে, আরও একটু উন্নত করতে হবে। তবে কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টে এখন দক্ষিণ ভারতের হাসপাতালগুলির চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে এ রাজ্য।

ডাক্তারবাবু বলছেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহজ ব্যাপার নয়। আগে গোটা প্রক্রিয়াটা নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে তদারকি করতে হয়। ব্রেন ডেথ হয়েছে এমন রোগীর খোঁজ, মৃত রোগীর পরিবারকে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানো, একই সঙ্গে রাজি করানো, অঙ্গ সংগ্রহ করা, তা হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ে আসা, পোস্ট-ট্রান্সপ্ল্যান্ট পর্বে রোগীর যত্ন-চিকিৎসা এই সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। ঘাটতিটা সেখানেই হচ্ছে। ধরুন, যে রোগীর ব্রেন ডেথ হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ সজীব ও সক্রিয় রয়েছে, তাহলে দ্রুত তাঁর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে, সেই রোগীর পরিবারকে রাজি করাতে হবে এবং গ্রহীতার খোঁজও থাকা দরকার। এটাই হল ম্যানেজমেন্ট, আরও ভালভাবে শুরু করতে হবে। আমাদের এখানে রোগীর ব্রেন ডেথ ঘোষণা হওয়া ও অঙ্গ আহরণের মধ্যে সময় অনেক বেশি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ব্রেন ডেথের রোগীকে বেশিক্ষণ ভেন্টিলেশনে রাখলে তা আর ট্রান্সপ্লান্টের উপযোগী থাকে না।

ডাঃ ঘোষাল আরও বললেন, গত ১৫-২০ বছর আগে যা হত, সে তুলনায় এখন কলকাতায় অঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার অনেক বেড়েছে। বলাবাহুল্য, গত তিন বছরে এ শহরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য উন্নতি হয়েছে। সব ঠিক থাকলে হয়ত আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই কলকাতাতেও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু করা যাবে।

করোনা সংক্রমণের কারণেই কলকাতায় ফুসফুস প্রতিস্থাপন শুরু করার কাজ অনেকটাই পিছিয়ে গেছে, এমনটাই বক্তব্য ফর্টিস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ রাজা ধরের। তিনি বললেন, লক্ষ্যের খুব কাছে পৌঁছে গেছে কলকাতা। আর হয়ত অল্প সময় বাকি। তার পরেই ফুসফুস প্রতিস্থাপনের কাজও শুরু হয়ে যাবে। ডাক্তারবাবু বলছেন, তাঁর অনেক রোগীকেই হায়দরাবাদে রেফার করতে হয়েছে যেহেতু কলকাতায় এখনও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের কোনও ব্যবস্থাই নেই। তবে খুব তাড়াতাড়ি এ শহরও এগিয়ে যাবে, তাতে কোনও সন্দেহই নেই।

ফুসফুস প্রতিস্থাপন জটিল প্রক্রিয়া। প্রতিস্থাপনের পরে রোগীকে অনেক বেশি যত্নে রাখার প্রয়োজন হয়। এমনটাই জানালেন ফর্টিস হাসপাতালে কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ সুস্মিতা রায়চৌধুরী। তিনি বললেন, ফুসফুস প্রতিস্থাপন কোনও হাসপাতালে শুরু করতে হলে প্রথমে লাইসেন্স দরকার, এরপরে দরকার সঠিক পরিকাঠামো বা হাসপাতালের সেটআপ।

ডাঃ সুস্মিতা বলছেন, হার্ট বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো ফুসফুস সহজেই প্রতিস্থাপিত বা ট্রান্সপ্লান্ট করা যায় না। তার জন্য অনেকগুলো প্রক্রিয়া আছে। তাছাড়া প্রতিস্থাপন হয়ে গেলে রোগীকে চার থেকে ছয় মাস পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। নানারকম সেকেন্ডারি ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে, ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ড্রাগ দিতে হয়। কাজেই প্রক্রিয়াটা জটিল, তার জন্য উন্নত পরিকাঠামো দরকার।

অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডক্টর দেবরাজ যশ বললেন, শরীরে যখন কোনও বহিরাগত অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়, তখন চট করে শরীর সেটা সইয়ে নিতে পারে না। আর ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষেত্রে সে ঝুঁকি অনেক বেশি। ডাক্তারবাবু বলছেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও প্রতিস্থাপনের পরবর্তী পর্যায়ে রোগীর পর্যবেক্ষণের গুরুদায়িত্ব নিতে দ্বিধা করে অনেক হাসপাতালই। কলকাতায় সেখানে পরিকাঠামোর খামতি তো অবশ্যই রয়েছে, তবে আশার কথা হল খুব তাড়াতাড়ি সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে।

ডাঃ দেবরাজ বলছেন, পালমোনারি ফাইব্রোসিস, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), পালমোনারি হাইপারটেনশন, সিস্টিক ফাইব্রোসিস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রেই ফুসফুস প্রতিস্থাপন করার দরকার পড়ে। ইদানীং কোভিডের সময় ফুসফুসের সংক্রমণজনিত রোগ বেড়েছে, বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী পর্যায়ে লাঙ ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক রোগী। সেক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের দরকার পড়ছে। এই সংখ্যাটা সাম্প্রতিক সময় বেড়েছে।

তাই বলা যায়, ফুসফুস প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন আগে যতটা ছিল এখন তার থেকে অনেক বেশি। ২০১৯ সালে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের রোগী যদি বাংলায় দশ জন পাওয়া যায়, তাহলে এখন হয়ত দশ হাজার। প্রয়োজনীয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই উদ্যোগটাও বেড়েছে। কলকাতার অনেক হাসপাতালই প্রতিস্থাপন শুরু করার জন্য অনুমোদন চেয়েছে। আর হয়ত ছ’মাস থেকে এক বছর, তারপরেই দেখবেন কলকাতাতেও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। রোগীদের আর ভিন রাজ্যে যাওয়ার দরকার পড়বে না। খবর দ্য ওয়ালের

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *