ঢাকা, রবিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন
কাবুলের পাসপোর্ট অফিসে থিকথিকে ভিড়, দেশ ছাড়তে মরিয়া সকলে! ভারতে আসছে শেষ বিমান
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

কাবুলের পাসপোর্ট অফিসে থিকথিকে ভিড়, দেশ ছাড়তে মরিয়া সকলে! ভারতে আসছে শেষ বিমান

লড়াই চলছিল ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে। শেষে সমর্পণের পথেই এগোল আফগান সরকার। কার্যত বিনা বাধায় রাজধানী কাবুল দখল করে নিল তালিবান। গোটা দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়ে গেল তাদের উপর।

গত দেড়মাস ধরেই দুরন্ত তালিবানি হামলা চলছে আফগানিস্তান জুড়ে। তালিবান-আমেরিকা চুক্তি অনুযায়ী এ বছর ৯ মার্চ থেকে আফগানিস্তান থেকে সেনা সরাতে শুরু করে আমেরিকা। তার পরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তালিবান। জুন মাসের শেষে আফগান বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ বাঁধে তাদের।


এর পরে গত সপ্তাহ থেকে একের পর এক বড় শহর দখল করতে শুরু করে তালিবান। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ১৮টি তাদের হাতে ছিল। কিন্তু এর পর ঝড়ের গতিতে এগোতে শুরু করে তালিবান। কুন্দুজ, গজনী, কান্দাহার, হেরাটের পরে কাবুলের দিকে এগিয়ে আসছিল তারা। গতকাল রাতে দখল হয়ে যায় কাবুলের প্রবেশপথ মাজার-ই-শরিফ। এর পরে আজ, রবিবার বেলা গড়াতেই রাজধানী কাবুল দখল করে ক্ষমতা বুঝে নিল তালিবান।


এমনই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ মরিয়া দেশ ছাড়তে। তবে ছাড়ব বললে ছাড়া যায় নাকি! তাই দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বাড়ছে। তাতে মিশে আছে আতঙ্ক, প্রাণের ভয়। কোনও না কোনও ভাবে পালাতে চান তাঁরা, চান প্রাণে বাঁচতে।


যেমন আবদেল খালিদ নবিয়া। তাঁর বাড়ি হেরাটে। তালিবান যখন বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। দিনের পর দিন গিয়ে লাই দিয়েছেন পাসপোর্টের অফিসে। কাজ হয়নি। এবার হয়তো আরওই অসম্ভব হয়ে গেল পাসপোর্ট পাওয়া।

নবিয়ার মতো হাজারো মানুষ আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চাইছেন খুব কম সময়ে। গত কয়েক দিন ধরেই আফগানিস্তানের পাসপোর্ট অফিসে কার্যত ধরনায় বসেেন তাঁরা। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে শুধুই চোখে পড়েছে লম্বা লাইন।

তবে এ অস্থিরতা, আতঙ্ক তো নতুন নয় আফগানিস্তানে। নিরাপত্তার অভাব মাথায় নিয়ে সেই কবে থেকে বাঁচছেন আফগানরা। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তান দখল করে তালিবান। তার পর ২০০১ সালে আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে শুরু সমস্যা। আলকায়েদার ওই হামলার পরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ লড়তে গিয়ে যেন এক নতুন লড়াই শুরু করে আমেরিকা। পশ্চিমের বেশিরভাগ দেশই তাদের সমর্থন করে।

আলকায়েদাকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানে হামলা চালায় আমেরিকা। আফগানিস্তানের ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় তৎকালীন শাসক তালিবান। একসময় বিদেশি বাহিনীর সহায়তায় প্রায় পুরো দেশই তালিবান-মুক্ত হয়, আফগান সরকার ক্ষমতায় বসে। এবার ফের পাশা উল্টে গেল।

যে এলাকাগুলি পুরোপুরি তালিবান দখলে, সেখানে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছেন বাসিন্দারা। এই কারণে দেশ ছাড়াটাকেই বাঁচার পথ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। তবে নাগরিকরা বলছেন, সকলেই যে এখনই দেশ ছাড়বেন, এমনটা নয়। তাঁরা নিরাপত্তার জন্য পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন, যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে খুব অল্প সময়ে দেশ ছাড়া যায়।

ফলে সবমিলিয়ে রাজধানী কাবুলের পাসপোর্ট অফিসে ভিড় উপচে পড়ছে। সারারাত ধরে লাইন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরা বলছেন. আগে প্রতিদিন পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়ত ২ হাজার, তা এখন ৫ গুণ বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার।

বলাই বাহুল্য, মহিলাদের অবস্থা আরও সঙ্গীন। পাসপোর্টের লাইনে ছিলেন জিনাত বাহার নাজারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এখনও পাননি পাসপোর্ট। কম্পিউটার সায়েন্সের পড়ুয়া জিনাতের কথায়, “আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই শুনছি তালিবান মানুষ মারছে। এখন আমি বুঝি, মহিলাদের প্রতি আরও বেশি হিংস্র তালিবান যোদ্ধারা। তারা চায় না নারীরা শিক্ষিত হোক। মৌলিক অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করতে চায়। ওরা সন্ত্রাসী সংগঠন। আমি পড়াশোনা করে একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তালিবানি শাসনে সে স্বপ্ন কখনও সফল হবে না।”

সব মিলিয়ে প্রবল অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও হুমকির মুখে আফগানরা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন অনেকে। কিন্তু জানেন না, তাঁরা কোথায় যাবেন বা আদৌ যেতে পারবেন কিনা। 

এসবের মধ্যে ভারতে থাকা আফগান ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়েও চিন্তা রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে বড় সংখ্যায় ছেলেমেয়েরা ভারতে পড়তে আসে। বিশেষ করে দিল্লির কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছেন আফগানিস্তান থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা।

২৫ বছরের ফারহাদ হকিয়ার বলছিলেন, গত দু’বছর ধরে স্কলারশিপ নিয়ে চণ্ডীগড়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ছেন তিনি। আফগানিস্তানের এক ছোট্ট প্রদেশ থেকে পড়তে এসেছিলেন। এখন তাঁর পরিবার কাবুলে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেন ফারহাদ, আপাতত তাতে জল ঢেলে দিল তালিবান।

ফারহাদ বলছিলেন, “গত বছরেও আমি কত খুশি ছিলাম। বাড়িতে জানত, মাস্টার্স শেষ করেই আমি চলে যাব। কিন্তু এত দ্রুত সব বদলে গেল… আমার পরিবার আমায় এখন বলছে, এখানেই থাকতে, চাকরি খুঁজে নিতে। আমার ২৫ বছর বয়স, সামনে গোটা জীবনটা পড়ে আছে। কিন্তু আমি কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না।”

২৭ বছরের সৈয়দ হাসান আনোয়ারি বেঙ্গালুরুর জৈন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তিনি বলেন, “আমার বাবা আফগানিস্তানে চাষবাস করেন। দেহদাদিতে বাড়ি আমাদের। গোটা এলাকা তালিবানি দখলে। পরিবারের সকলে আটকে পড়েছেন ঘরে। ফোনে কথাও বলতে পারছি না। জানি না, আদৌ আমার কোনওদিন ফেরা হবে কিনা দেশে।”

ইতিমধ্যে কাবুল থেকে ভারতে রওনা দিয়েছে শেষ এয়ার ইন্ডিয়া বিমান। আজ তালিবান বাহিনী রাজধানী শহর দখল নিতেই নাগরিকদের নিয়ে তড়িঘড়ি আফগানিস্তান শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এত দিন নয়া দিল্লি থেকে কাবুল পর্যন্ত সপ্তাহে তিন বার বিমান চলাচল করত। এখন সবটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল। তার মধ্যেও যাঁরা পারছেন, প্রাণ হাতে করে বাড়ি ফিরছেন । ​খবর দ্য ওয়ালের /এনবিএস/২০২১্এক

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *