ঢাকা, বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন
নিজেদের ‘জীবিত’ প্রমাণ করতে লড়াই করছেন হাজার হাজার ‘মৃত’
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :


নিজেদের ‘জীবিত’ প্রমাণ করতে লড়াই করছেন হাজার হাজার ‘মৃত’

সবার চোখে তিনি মৃত। নিজের জমি ফিরে পেতে মামলা করেন তিনি। কিন্তু তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, যে তিনি জীবিত। কোর্টে তাঁর হয়ে উকিল বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তাঁর মক্কেল জীবিত। কিন্তু বিচারপতির একটিই প্রশ্ন, কোনও সরকারি কাগজে তাঁর মক্কেলের জীবিত থাকার উল্লেখ নেই! তখন উকিলের বুদ্ধিতেই বিচারকের দিকে জুতো ছোড়েন ‘মৃত’ মক্কেল। ব্যস, নাম উঠে যায় পুলিশের খাতায়।

গল্পটা চেনা চেনা লাগছে? এটা ‘জলি এলএলবি-২’ সিনেমার এক টুকরো অংশ। তবে বাস্তবেও এমন ‘মৃত’-র সংখ্যা হাজার হাজার। তাঁরা লড়ছেন নিজেদের জীবিত প্রমাণ করতে।


শুনতে অবাক লাগলেও, শুধু উত্তরপ্রদেশেই এমন লোকের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। সম্প্রতি বিবিসি-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনই ঘটনার খবর পাওয়া গেল। পাডেসর যাদব নামের এক ব্যক্তি শিকার হলেন এমন মৃত্যু-জালিয়াতির। তাঁর টাকার প্রয়োজন পড়ায় বাইরে থেকে গ্রামে ফিরে নিজের জমি বিক্রি করতে গেছিলেন। তখনই জানতে পারেন, তিনি নাকি মারা গেছেন!

নিজের মৃত্যুসংবাদ শোনার পরে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে পড়েন তিনি। তিনি তো জীবিত! অথচ তাঁরই নামে উঠল প্রতারণার অভিযোগ। অভিযোগ আনলেন স্বয়ং তাঁর ভাইপো। তখনই তাঁর কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁর জমি হাতানোর জন্যই এই কাজ করা হয়েছে পরিকল্পনা করে। ন্যায় বিচার অবশ্য মেলেনি শেষমেশ, জমি হাতছাড়াই হল। পাশাপাশি সমাজের চোখেও তিনি ‘মৃত’ হয়ে থাকলেন।তিলক চান্দ ঢাকাদতাঁকে গ্রামে দেখে যেন সবাই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। সবার মুখে একটাই কথা, ‘আপনি তো মারা গেছেন?’ তিনি এও জানতে পারেন, তাঁর শেষকৃত্য পর্যন্ত হয়ে গেছে।

পাডেসর যাদব একা নন, হাজার হাজার মানুষ এমনই মৃত হয়ে সমাজে বেঁচে আছেন, লড়াই করছেন নিজের অধিকারের জন্য। এইসব মৃত মানুষদের এক সংগঠনও আছে দেশে। ‘অ্যাসোসিয়েশনে ফর দ্য লিভিং ডেড ইন ইন্ডিয়া’ নামের এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা লালবিহারীবাবু। তিনিও কিন্তু ‘মৃত’। তাই তাঁর মতোই হতভাগ্যদের জন্য এই সংস্থা খোলেন তিনি। এই ছাদের তলা থেকেই নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করেন হাজার হাজার ‘মৃত’ ব্যক্তি।

এই সংস্থায় যাঁরা রয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদের জেরে ‘মৃত’। পরিবার বা আত্মীয়স্বজন তাঁদের মৃত্যু ঘটিয়েছে সমাজের চোখে। সরকারি কোনও কাগজে তাঁদের জীবিত থাকার উল্লেখ নেই।

আইনি পথে এই লড়াই কি সহজ? ‘একদমই নয়’, জানাচ্ছেন আইনজীবী অনিল কুমার। তিনি এই সব ‘মৃত’ মানুষদের হয়ে আদালতে লড়াই করেন। অনেক মামলা ১৫-২০ বছর পর্যন্তও চলে, তবে এখনও কোনও সুরাহা হয়নি। আবার কোনও মামলায় তাঁর মক্কেল জীবিত বলে প্রমাণ হলেও দোষীদের শাস্তি হয়নি।

তিনি বলেন, এইরকম প্রতিটি মামলাই খুব জটিল। আইনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায় অনেক মামলা। অনেক মামলার ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মচারীকে ঘুষ খাইয়ে ডেথ সার্টিফিকেট বের করা হয়েছে। তাই সহজে সুরাহা হয় না এইসব কেসের। অনিলবাবু জানান, ‘যদি এইসব মামলায় শাস্তি হত, তাহলে এইরকম অপরাধের সংখ্যা অনেক কমত।’

লালবিহারীবাবু যেমন ‘মৃত’ হিসেবেই বেঁচে আছেন ৪৫ বছর। তাই নিজের নামের শেষে মৃতাক ব্যবহার করেন তিনি। আইনের চোখে জীবিত প্রমাণ হলেও দোষীরা আজও শাস্তি পাননি। যেদিনটায় তিনি আইনের চোখে জীবিত হন, সেই দিনটায় প্রতি বছর ‘পুনর্জন্ম দিবস’ হিসেবে পালন করেন তিনি। একটি করে ফাঁপা কেক কেটে উদযাপন করেন। ফাঁপা কেক কেন? তিনি জানান, ‘এখনকার সরকারি কর্মচারীদের মতোই ফাঁপা কেক থাকে। সরকারি কর্মচারীরা ফাঁপা বুলি দেয়, কাজের বেলায় পাওয়া যায় না।’ 'পুর্নজন্ম দিবসে‌' নকল কেক কাটছেন লালবিহারি মৃতাক।এই সংস্থা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই লালবিহারীর কাছে। কেউ দায়িত্বও নিতে চায় এটার। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমন মৃত মানুষের ফোন আসে প্রায়ই। তবে দুঃখের বিষয় হল, বেঁচে থেকে নিজের অধিকারের আশায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত সত্যিই অনেকে মরে যান। খবর দ্য ওয়ালের /এনবিএস/২০২১/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *