ঢাকা, রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন
বিট-কয়েন কোথা থেকে এসেছে? জানুন ক্রিপ্টোকারেন্সি ধারণার বিস্তারিত ইতিহাস | Techtunes
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :


আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন সবাই? আশা করছি সবাই ভাল আছেন। আপনারা জানেন আমি প্রায়ই বিভিন্ন বিশ্লেষণ মূলক টিউন করে থাকি। টিউন গুলোতে  বিভিন্ন কোম্পানি বা বিষয়ের ভাল দিক খারাপ দিক, তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সুযোগ প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি উঠে আসে। তো আজকেও এমন একটি টিউন নিয়ে হাজির হলাম।

বিট-কয়েন এবং মজার ফ্যাক্ট

মূল আলোচনার যাবার আগে চলুন দুটি ঘটনা জেনে নিই, ২০০৯ সালে যখন প্রথম বিট কয়েন যাত্রা শুরু করে তখন James Howells নামে একজন লোক বিট-কয়েন মাইনিং করতো। সে কোন কারণ বশত মাইনিং করা ছেড়ে দেয় ততদিন পর্যন্ত তার কাছে 7500 বিট-কয়েন জমা হয়েছিল। সেই সময় বিট-কয়েনের মূল্য এখনকার দিনের মত ছিল না। সে তখন তার হার্ড ড্রাইভও ফেলে দেয়।  তখনকার সেই 7500 বিট-কয়েনের বর্তমান মূল্য হবে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই লোক এখনো আফসোস করে কারণ তার পক্ষে সেই হার্ড ড্রাইভ ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।

২০১০ সাল, Laszlo Hanieh নামের এক ব্যক্তি পারিবারিক একটা অনুষ্ঠানে ১০০০০ বিট-কয়েন দিয়ে দুটি পিজ্জা কিনেছিল। বলা হয় এটিই ছিল প্রথম বিট-কয়েনে লেনদেন।  মজা ব্যাপার হল সেই দুই পিজ্জার বর্তমান মূল্য হবে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার।

দারুণ ব্যাপার হল শুরুর দিকে বিট-কয়েনের এতটা গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও যতই দিন যাচ্ছে এটি ততটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বড় বড় টেক কোম্পানি এটিকে গ্রহণ করছে ফলে প্রতি বিট-কয়েনের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিট-কয়েন মূলত একধরণের ক্রিপটোকারেন্সি, আজকের এই বিট-কয়েনের রয়েছে অনেক পুরনো ইতিহাস। আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কোথা থেকে এলো এই বিট-কয়েন?  কে আবিষ্কার করেছে রহস্যময় এই বিট-কয়েন? আর আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি আজকের এই টিউন।

ক্রিপটোকারেন্সি এর গ্রহণযোগ্যতা

বিট-কয়েন বা ক্রিপটোকারেন্সি যাই বলি, এখনো কিন্তু সর্বজনীন কোন অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হতে পারে নি। আমাদের দেশ সহ বিভিন্ন দেশের বিট-কয়েন রিলেটেড সব কিছু অবৈধ, সেটা হতে পারে বিটকয়েনে লেনদেন অথবা মাইনিং৷  এমনকি এই ধরনের কাজের জন্য আপনাকে জেলে পর্যন্ত যেতে হতে পারে।  বিভিন্ন হ্যাকিং এবং অবৈধ কাজে সব সময় বিট-কয়েন এর নাম আসায় এটিকে অনেকেই এখনো প্রতারণা বা অবৈধ বিষয় বলেই গণ্য করে। কিন্তু অনেকেই পরিষ্কার ভাবে জানে না যে হ্যাকাররা এই বিট-কয়েন ব্যবহার করে তাদের পরিচয় গোপন রাখতে।

অর্থ লেনদেনে কোন ধরনের বাধা না থাকার কারণে অনেক বড় বড় ব্যক্তিরা বিটকয়েনে লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করে। তাদের দাবী যেকোনো ধরনের অবৈধ কাজ হতে পারে এমন লেনদেনের মাধ্যমে যার কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমনই, বিটকয়েনে কোন লেনদেন হলে লেনদেনের তথ্য থাকলেও, কে বা কারা এই লেনদেন করছে তার কোন প্রমাণ থাকে না কারণ ব্যক্তির তথ্য এখানে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। অনেকে অর্থনীতিবিদ এমনও বলেছিল যে বিট-কয়েন এর কোন ভবিষ্যৎ নেই কারণ এটি অবৈধ।

বিট-কয়েন এর ভবিষ্যৎ

সকল ধরনের নেতিবাচক মনোভাবকে পেছনে ফেলে বিট-কয়েন অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চাচ্ছে৷ বর্তমান অর্থ ব্যবস্থায় যেখানে প্রতিনিয়ত টাকা ছাপানো হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হচ্ছে, এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে সেখানে মানুষ নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখছে।

১৯৭৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া Friedrich Hayek, ১৯৯৪ সালে তার এক বক্তব্যে বলেছিলে, “আমি বিশ্বাস করি না যে আগের মত ভাল অর্থ ব্যবস্থা আমরা পাবো কারণ সব কিছু এখন সরকারের হাতে, আমরা এমন কিছু তৈরি করতে পারি যা সরকার কখনো থামাতে পারবে না”। Friedrich Hayek যেমন আশা করেছিলেন এমন অর্থ ব্যবস্থাই হচ্ছে ক্রিপটোকারেন্সি, যা থামানো বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারো হাতেই থাকবে না।

বিট-কয়েন এখনো নির্ভুল নাও হতে পারে তবে এই অর্থ ব্যবস্থা কারো কন্ট্রোলে থাকবে না, এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা কাঠামো যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এর ব্যবহারকারীদের কাছেই।

বিট-কয়েন এর ধারণা

বিট-কয়েন কিভাবে এলো বা কোন ধারণা থেকে আশাকরি। আমরা ব্যাংকে টাকা রাখি, ব্যাংকের লোকজন ভেরিফাই করে যে আসল ব্যক্তি টাকা দিচ্ছে বা নিচ্ছে কিনা। একই সাথে আমরা কত জমা রাখলাম কত টাকা তুললাম সেটাও রেকর্ডে থাকে। যখন লেনদেন করা হয় তখন সেই রেকর্ড আপডেট হয়। আর এই কাজ করে দেয়ার জন্য ব্যাংক কিছু টাকা কমিশন পায়।

এখন আপনি যদি এমন কোন ব্যবস্থা চান যেখানে কোন ধরনের দুর্নীতি হবে না, তথ্যকে পরিবর্তন করা যাবে না, তাহলে এমন লোকের সাথে হয়তো লেনদেন করতে হবে যাদের আপনি বিশ্বাস করতে পারেন।  আপনি হয়তো এক ব্যক্তিকে বিশ্বাস নাও করতে পারেন, কিন্তু যখন এই লেনদেন হাজার হাজার ব্যক্তির সামনে হবে তখন?  তখন অবশ্যই এটি বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে।  আর এই ধারণা থেকেই মূলত বিট-কয়েন এসেছে।

বিট-কয়েনে একটি ব্লক-চেইন ব্যবস্থায় আপনার লেনদেন সেভ থাকবে।  ব্যাংকে লেনদেনের পর যেখানে সেই তথ্য শুধুমাত্র ব্যাংকে থাকতো, ক্রিপটোকারেন্সিতে সেই লেনদেন থাকবে প্রতিটি ক্রিপ্টো ইউজারদের কাছে। আপনার লেনদেনের পর ইউজারদের অনুমোদনের ভিত্তিতে লেনদেন সম্পন্ন হবে আর এজন্য এই এই ব্যবস্থায় লেনদেন অন্য যেকোনো ব্যবস্থার চেয়ে অনেক গুন বেশি নিরাপদ। তাছাড়া কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতেই পারে কিন্তু ক্রিপটোকারেন্সিতে সেভ থাকা রেকর্ড কোন দিন মুছবে না।

তাই বলা যায় এই ক্রিপটোকারেন্সি এমন একটি ধারণা যেখানে লেনদেনের রেকর্ড কোন কেন্দ্রীয় মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকবে না, এটি বিশ্বজুড়ে সকল ইউজারদের মধ্যে স্থানান্তরিত হবে। যখন কোন লেনদেন হবে তখন সবাই এটিকে চেক করবে এবং অনুমোদন দেবে এবং নিজ নিজ রেকর্ড আপডেট করবে। আর এই রেকর্ড আপডেট করার কাজকেই বলা হয় বিট-কয়েন  মাইনিং।

এখানে কোন থার্ডপার্টি লাগবে না ব্লক-চেইন নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাই প্রতিনিয়ত ডেটা আপডেট করে যাবে এবং লেনদেন সম্পন্ন হবে৷ যেহেতু বিশাল কমিউনিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হয় সুতরাং একজন ব্যক্তি চাইলেও এটির কোন ধরনের পরিবর্তন করতে পারে না। সুতরাং ব্যাংকের মত এখানে থাকবে না কোন ব্যান, লিমিট, অতিরিক্ত চার্জ এবং প্রতিবন্ধকতা।

বিট-কয়েন মাইনিং কি

চলুন বিট-কয়েন মাইনিং এর বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। খুব সহজ ভাষায় মাইনিং করা হয় মূলত ব্লক চেইনের ডেটা রেকর্ডের আপডেটের জন্য। বিট-কয়েন তৈরি করার পর এর জনক Satoshi Nakamoto কে একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, বিট-কয়েনে লেনদেন হলে সেগুলো আপডেট কে করবে এবং কিভাবে প্রক্রিয়াটি চলতে থাকবে। Satoshi Nakamoto এই কাজের জন্য মাইনারদের সিলেক্ট করেন। মাইনারদের কাজ হচ্ছে প্রতিটি লেনদেনের দিকে নজর রাখা, সেগুলো ভেরিফাই করা এবং প্রতিটি লেনদেনের আপডেট প্রদান করা।

এবার আপনি প্রশ্ন করতে পারে এত এত লেনদেন কোন ব্যক্তি কিভাবে ভেরিফাই করবে, বিষয়টি হলে, কোন ব্যক্তিকে এই কাজটি করতে হবে না কম্পিউটারে পাওয়ার দেয়া থাকলে সেটিই সকল কাজ করবে। আর এই প্রক্রিয়াটিই হল বিট-কয়েন মাইনিং।

আপনি যখন কাউকে বিট-কয়েন পাঠাবেন তখন সেখানে  অনেক জটিল গাণিতিক সমস্যা তৈরি হবে। এই সমস্যা সলভ হলেই কেবল লেনদেনটি হবে। আর এই গাণিতিক সমস্যা সমাধানের কাজ করবে মাইনারদের কম্পিউটার।  কম্পিউটারকে মাইনিং এ যুক্ত করে দিলে সেটা এই সমস্যার সমাধান করে সার্ভারে পাঠাবে।

গাণিতিক যুক্তি গুলো ম্যাচ হওয়া মানে প্রতিটি ইউজারের কাছ থেকে লেনদেনের অনুমোদন পাওয়া। বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে ততটা সহজ নয়। গাণিতিক যুক্তি গুলো সলভ করার কাজ করে কম্পিউটারের GPU। আর এভাবে ব্লক গুলোতে লেনদেন অব্যাহত রাখতে অবদানের জন্য মাইনারদের অল্প পরিমাণে বিট-কয়েন কমিশন দেয়া হয়।

পৃথিবীতে বিট-কয়েন এর পরিমাণ ২১ মিলিয়ন। প্রতিটি লেনদেন হওয়ার পর বিট-কয়েন ব্লকে উন্মুক্ত হয়। আর এটা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না এই উন্মুক্ত হবার কাজটি করে বিট-কয়েন মাইনাররা। মাইনিং এর বাংলা অর্থ হচ্ছে খনি থেকে মূল্যবান কিছু আহরণ করা, আর এটির সাথে মিল থাকার জন্যই একে বিট কয়েন মাইনিং বলা হয়।

বিট-কয়েন মাইনিং কি এখন লাভজনক হবে?

আমি জানি বিট কয়েন মাইনিং এর বিষয়টি জানার পর আপনারও মাইনিং এর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে, হওয়াটা স্বাভাবিক। এই মুহূর্তে বিট কয়েন মাইন করা আপনার জন্য লাভজনক হবে কি হবে না চলুন সেটা জানি।

প্রথমদিকে বিট-কয়েন মাইনিং এর কাজটি করতো Satoshi Nakamoto নিজে এবং তার একজন সহযোগী কিন্তু যখন লেনদেনের পরিমাণ বাড়তে থাকে তখন এটা তাদের পক্ষে করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তারপর থেকেই এই কাজে যুক্ত হয়েছে মাইনাররা। ২০১২ সালে কম্পিউটারের GPU দিয়ে বিট-কয়েন মাইনিং এর পদ্ধতি সবার সামনে আসে।  কিন্তু কিছু দিন পর বাজারে GPU এর সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায় কয়েক গুন।

যখন GPU দিয়ে আর সম্ভব হচ্ছিল না তখন বাজারে আসে বিট-কয়েন মাইন করার জন্য আলাদা মাইনিং মেশিন। মেশিন গুলো ASIC মাইনার নামে পরিচিত। ASIC মাইনার মেশিন গুলো বেশ পাওয়ার ফুল এবং কম খরচে বেশি মাইনিং করা যায়।

অনেক আগে থেকে বিট কয়েন মাইনিং করার জন্য বিভিন্ন ফার্ম কাজ করছে যেখানে মেশিন গুলো ব্যবহার করা হয়। এবং প্রতি চারবছর পর পর মাইনিং এর কমিশনও কমতে থাকে। এবার নিজেই চিন্তা করুন, ব্যক্তিগত ভাবে মাইনিং আপনার জন্য কতটা লাভজনক হবে?

বিট-কয়েন এর উদ্ভাবক Satoshi Nakamoto বিট-কয়েনকে ২১ মিলিয়নে লিমিট করে দিয়েছে। বলা হয় শেষ বিট-কয়েন মাইন হতে ২১৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। বিট-কয়েন কেন এত ভ্যালুয়েবল? এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে মানুষ এটিকে চায়, মানুষ আর্থিক লেনদেনে স্বাধীনতা চায়।

বিট-কয়েন কিভাবে মেইনটেইন করা হয়

বিট-কয়েন একটি ওপেন-সোর্স সিস্টেম তাই এটিকে যেকেউ কোড করতে পারে অথবা এর কোড এডিট কর‍তে পারে। গত দশ বছর ধরে একই কোডিং এ চলে আসছে এটা বললে অবশ্যই ভুল হবে৷ তাছাড়া সব কিছু সঠিক ভাবে চলতে অবশ্যই কোডিং এর দরকার হয়। তবে কোন কোড পরিবর্তন করতে হলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটিকে বলা হয় Bitcoin Improvement Proposal অথবা BIP। BIP হচ্ছে মূলত বিট-কয়েন ব্যবস্থার কোর কোড পরিবর্তনের একটি ডকুমেন্ট প্রস্তাব। আপনি যদি কোন কোড এডিট করতে চান তাহলে আপনাকে নিয়ম মেনে বিস্তারিত একটা প্রস্তাব দাখিল করতে হবে এবং কমিউনিটি যদি আপনাকে সম্মতি দেয় তাহলেই আপনি এটা করতে পারবেন। আপনাকে মনে রাখতে হবে বিশাল এই কমিউনিটির সম্মতি পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়, তাছাড়া আপনি আসলেই এটা করার যোগ্য কিনা সেটা তো প্রমাণ করতেই হবে।

Bitcoin সূচনা

২০০৯ সালের ৩ জানুয়ারি, প্রথমবারের মত প্রথম ব্লকে মাইন করা হয়। এই ব্লকে একটি স্পেশাল মেসেজ ছিল, “Chancellor on brink of second bailout of banks”। এর মাধ্যমেই হয়তো ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল বিট কয়েন একসময় বর্তমান অর্থ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেবে। যাই হোক প্রথম ব্লক মাইন হবার মাত্র নবম দিনেই প্রথম বিট-কয়েন লেনদেনটি সম্পন্ন হয়ে যায়। লেনদেনটি হয়েছিল, বিট-কয়েন নির্মাতা Satoshi Nakamoto এবং আরেকজন বিট-কয়েন আগ্রহী Finney সাথে। তাদের মধ্যকার লেনদেন হওয়া বিট-কয়েন এর পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ বিট-কয়েন।

Satoshi Nakamoto প্রথমবারের মত তার উদ্ভাবিত নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ঘোষণা দেয় ৯ জুলাই ২০০৯ সালে। শুরুর দিকে Finney এবং Satoshi মিলেই বিট-কয়েন এর বিভিন্ন বাগ ফিক্স করতো।

ক্রিপটোকারেন্সি ধারনার উদ্ভব

আপনার জানা উচিত এই বিট-কয়েন কিন্তু ২০০৯ সালের কোন ধারণা ছিল না।  এটি ছিল বেশ পুরনো একটি চিন্তা, যার বিস্তারিত জানতে আপনাকে চলে যেতে হবে ১৯৮৩ সালে।

Bitcoin এর দাদা বলা হয় David Chaum কে। ১৯৮৩ সালে David Chaum ইলেকট্রনিক ক্যাশ পদ্ধতি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছিল। তিনি Cyperpunk নামের একটি মুভমেন্টের অংশ ছিলেন। তাদের এই আন্দোলনে বাধা দেয়ার মত অনেকেই ছিল যারা চাইতো না ক্রিপটোকারেন্সি বলে কিছু হোক। David Chaum নিজ প্রচেষ্টায় তৈরি করে Blind Signature Scheme। Blind Signature Scheme বিষয়টি এমন ছিল যেখানে, অপর পক্ষের স্বাক্ষর পাওয়া যাবে কিন্তু তারপরিচয় থাকবে সম্পূর্ণ গোপন। আর এটিকেই বলা হয় আধুনিক ব্লক চেইন টেকনোলজির ফাউন্ডেশন।  একই সাথে David Chaum ক্রিপ্টোগ্রাফিক ইলেকট্রনিক মানি  সিস্টেম নিয়ে নিজের ধারণাকে আরও উন্নত করতে থাকে।

১৯৮৯ সালে David Chaum দ্বারা DigiCash নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়।  সেই কোম্পানির অন্যতম একজন কর্মী Nick Szabo ছিলেন একজন ক্রিপটোগ্রাফার। প্রথম দিকের ক্রিপ্টো স্পেসে তার অবদান রয়েছে। ১৯৯৩ সালে DigiCash প্রথমবারের মত তাদের ই-ক্যাশ সিস্টেম চালু করে। যার মাধ্যমে ইন্টারনেটে পরিচয় গোপন রেখেই নিরাপদে লেনদেনের পথ সৃষ্টি হয়।

DigiCash সম্পর্কে David  Chaum এর মতামত ছিল চমৎকার, একই সাথে তিনি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনকে অনিরাপদ বলে উল্লেখ্য করে। তখন DigiCash এর ই-ক্যাশ সিস্টেম ভাল ভাবে কাজ করতে থাকলে, গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হতে থাকে এবং প্রাইভেসি গত বিভিন্ন সমস্যা তাদের সামনে চলে আসে। সেই সময় David Chaum উদ্দেশ্য ভাল থাকলেও সেটা ছিল ঝুঁকির, কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এটিকে ভাল ভাবে গ্রহণ করে নি।  আর ভাল ভাবে গ্রহণ না করার অন্যতম কারণ ছিল, কেউ ক্রাইম করলেও সেটা ধরার মত ব্যবস্থা ছিল না।

এখনকার বিট-কয়েন এর মতই তখন ই-ক্যাশ ছিল জনগণের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে৷ শুনা গেছে তখন এটার হাইপ এতটাই ছিল যে বিল গেটসও এটির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল এবং Windows 95 এর সকল কপিতে ই-ক্যাশ যুক্ত করতে চেয়েছিল। জানা গেছে এই প্রজেক্টের জন্য David Chaum, বিল গেটসের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলারের অফার পেয়েছিল। কর্মীরা জানিয়েছে এমন আরও অফার সে পেয়েছিল কিন্তু সব গুলো বাতিল করে দেন। David তার লক্ষ্যের মধ্যে থাকতে চেয়েছিল এবং বিশ্বাস করতো তার আরও ভাল অফার আসবে।

কিন্তু বিভিন্ন কারণে ১৯৯৮ সালে, DigiCash কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যায় আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটে ক্রিপটোকারেন্সি ধারণা দেয়া সর্বপ্রথম কোম্পানিটি, কিন্তু শেষ হয়ে যায় নি সেই ক্রিপ্টো ধারনাটি।

৯০ দশকে ক্রিপটোকারেন্সি

DigiCash কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলেও বন্ধ থাকে নি ক্রিপটোকারেন্সি নিয়ে গবেষণা। গবেষকরা নতুন করে ভাবতে থাকে এটিকে নিয়ে। সেই সময় শক্তিশালী কোন লিডার না থাকলে মানুষ স্বপ্ন দেখছিল নতুন এই অর্থনৈতিক ধারণা নিয়ে। জনপ্রিয় অর্থনীতিবিদ Milton Friedman বলেছিলেন, নতুন এই ইন্টারনেটের জন্য একটি ইলেকট্রনিক ক্যাশ ব্যবস্থার প্রয়োজন, যার সরকারের হস্তক্ষেপ কিছুটা কমাতে পারবে। তিনি বলতে চেয়েছিলেন অর্থ আগমন বা পলিসি কম্পিউটারে থাকা উচিৎ যেখানে কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না।

১৯৯৮ সালে Wadeye নামে এক ব্যক্তি BMoney ধারণা নিয়ে আসে৷ B Money এমন ধারণা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যেখানে বাইরের কোন আইন ছাড়াই অনলাইন অর্থনীতি চালিত হবে।  তবে এই ধারনা জনপ্রিয় হলেও তা তাত্ত্বিক ভাবে থেকে যায় বাস্তবে পরিণত হয় নি। বলা যায় DigiCash, বর্তমান সময়ের বিট-কয়েন ধারণার জনক এবং ক্রিপটোকারেন্সির বিল্ডিং ব্লক  হলেও সেটিও বাস্তবে রূপ পায় নি বা সেটা ছিল থিউরিটিক্যাল একটা ধারণা।

যাইহোক বিভিন্ন আশা নিরাশার মধ্য দিয়ে এই বিট-কয়েন আগ্রহী বা ক্রিপ্টোগ্রাফাররা প্রায় এক দশক নীরব ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে সেই ধারণা আবার সবার সামনে আসে।

Bitcoin এর পথচলা

২০০৮ সালের আগস্টে Bitcoin.org নামে একটি ডোমেইন কেনা হয়।  অক্টোবরে  BitCoin এর একটি পেপার রিলিজ হয়। পেপারটি Post করা হয়েছিল ক্রিপ্টোগ্রাফি মেইল লিস্টে, পেপারটিতে সাইন ছিল Satoshi Nakamoto  এর। এই পেপারের মাধ্যমে Satoshi Nakamoto বিশ্ববাসীকে বিট-কয়েন এর ধারণা দেয়।

বিট-কয়েন এবং বর্তমান বিশ্ব

বর্তমানে বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ডিজিটাল কারেন্সি চাচ্ছে। অনেক দেশ চাচ্ছে তাদের জনগণ যেন বিটকয়েনে বিল পে করে, তাদের কর্মীরা যেন বিটকয়েনে বেতন পায়। Paypal, MasterCard, Apple Pay বর্তমানে বিটকয়েনে যুক্ত হচ্ছে। কিছু দিন আগে Tesla পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিট-কয়েন কিনেছে, General Motors তাদের ব্যালেন্স শিটে বিট-কয়েন রাখার চিন্তা ভাবনা করছে, এছাড়া ও আরও বড় বড় কোম্পানি বিট-কয়েন এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করছে।

বলা যায় বিট-কয়েন সব জায়গায় কার্যকর হলে Double Spending সমস্যার সমাধান হবে। অর্থ লেনদেনে কোন তৃতীয় পক্ষ থাকবে না।  বিশ্বাসযোগ্য ভাবে এবং নিশ্চিন্তে গ্রাহকরা লেনদেন করতে পারবে। এখানে আরেকটি বিষয় বলা দরকার সেটা হল, DigiCash এ ছিল থার্ডপার্টি ব্যাংক যা এই বিটকয়েনে নেই। ২০০৯ সাল থেকে এই বিট-কয়েন চালু রয়েছে এবং ট্রেডিং এর সাথে সাথে এর ভ্যালু বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য ২০০৯ সালে বিট-কয়েন নিয়ে, “The Good Wife নামে একটি টিভি ড্রামাও তৈরি হয়েছিল।

Satoshi Nakamoto রহস্য

বিট-কয়েন এর মত এমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের পর এর উদ্ভাবক Satoshi Nakamoto রহস্য জনক ভাবেই হারিয়ে যায়। যেহেতু সে পুরোপুরি Anonymous সুতরাং তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। ২০১১ সালে একটি ইমেইলের মাধ্যমে সে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে।  তার ফাইনাল মেসেজ ছিল, “I’ve Moved on to other Things. It’s good hands with gavin and everyone “। Satoshi এখনো এক মিলিয়ন বিট-কয়েন এর মালিক যা এখনো তার ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে সড়ে নি। যদি বিট-কয়েন এর মূল্য ১৯৭, ০০০ ডলারে পৌছায় তাহলে সে হবে বিশ্বের ১ নাম্বার ধনী ব্যক্তি।

কেন Satoshi Nakamoto হারিয়ে গেল এবং কে সে, এটা এখনো একটা রহস্য হয়ে থেকে গেছে।

শেষ কথাঃ

এই টিউন পড়ার পর যেকোনো ব্যক্তির বিট-কয়েন এর প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে এমনকি বেশিরভাগ দেশেই এই বিট-কয়েন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ৷ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, আপনি বিট-কয়েন লেনদেন থেকে শুরু করে বিট-কয়েন মাইনিং করতে গেলে জেলে পর্যন্ত যেতে পারেন।

তো কেমন হল এই বিশ্লেষণমূলক টিউনটি জানাতে অবশ্যই টিউমেন্ট করুন। আজকে এই পর্যন্তই, পরবর্তী টিউন পর্যন্ত ভাল থাকুন আল্লাহ হাফেজ।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *