ঢাকা, সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১২ অপরাহ্ন
অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে, অপহরণকারীদের নিরাপদ আস্তানায় ক্যাম্পগুলো
রাকিবুল ইসলাম রাফি

অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে, অপহরণকারীদের নিরাপদ আস্তানায় ক্যাম্পগুলো

সময় যত গড়াচ্ছে, অপরাধপ্রবণতাও তত বাড়ছে কক্সবাজারের ৩৪ ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের মধ্যে। খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচার ছাড়াও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মাত্রা গত চার বছর ধরে ক্রমাগত বাড়ছে তাদের ভেতর। সেই সাথে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো হয়ে উঠেছে অপহরণকারীদের নিরাপদ আস্তানা। অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় আর হত্যার ঘটনায় চরম উদ্বেগে বাসিন্দারা। এ সব ঘটনায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে স্থানীয়রাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। 

২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি; আসামি ছিল ১৫৯ রোহিঙ্গা। অথচ চলতি বছর মাত্র ছয় মাসেই ৫৬৭টি মামলায় রোহিঙ্গা আসামির সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন অপরাধজনিত কারণে বর্তমানে কক্সবাজার কারাগারে রয়েছে চার শতাধিক রোহিঙ্গা। অপহরণের মতো অপরাধে জড়িয়ে এদের অনেকে বিপুল অর্থসম্পদের মালিকও হয়েছে।

গত ২৪ আগস্ট (শুক্রবার) সকালে টেকনাফের পাহাড়ি ঝরনা 'স্বপ্নপুরি'তে সংঘটিত ঘটনাটি এর একটি ছোট উদাহরণ। কলেজপড়ূয়া নয়জন ছাত্র গোসল করতে গিয়েছিল সেখানে। এ সময় মুখোশধারী রোহিঙ্গা ডাকাত দল তাদের অস্ত্রের মুখে পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে রাখে। পরে মুক্তিপণ আদায় করে এই ছাত্রদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

টেকনাফের বাহারছড়ার উত্তর শিলখালীর বাসিন্দা মাহামুদুল করিম-অটোরিকশাচালক। ৩১শে জুন রাতে হোয়াইক্যাং থেকে শামলাপুর স্টেশনে ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। স্বজনরা মুক্তিপণের ৫০ হাজার টাকা দিয়েও তাকে জীবিত ফেরাতে পারেনি। মাস খানেক পর তার মরদেহ পাওয়া যায় নির্জন পাহাড়ি এলাকায়।  

স্থানীয় হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী জানান, গত সপ্তাহে আবু সৈয়দ প্রকাশ আবদুল্লাহ (৩৮) নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে পাহাড়ি ছড়ায় পাওয়া যায়। এর আগে ৯ আগস্ট টেকনাফের ২৫নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপহরণের এক চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদকে (৩০) অপহরণের চেষ্টা চালায় সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা। কিন্তু টহলরত এপিবিএন সদস্যরা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। গত জুলাইয়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয় অপহৃত দুই ব্যক্তিকে। লেদা ২৪ নম্বর ক্যাম্পের আবুল হোসেন (৬৫) এবং মো. লেয়াকত আলীকে (৫৩) সেখানকার বাজার থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। এ সময় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীর এক সদস্যকে আটক করে এপিবিএন।

গত মার্চে কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে অপহৃত হয় সাত বছরের শিশু শাহিনা আক্তার আঁখি। তাকে ২৭নং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেন এপিবিএন সদস্যরা। একই মাসে মহেশখালী থেকে অপহৃত কিশোর মোহাম্মদ মোজাহিদ মিয়াকে কুতুপালং ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৬ এপিবিএন নিয়ন্ত্রিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ৬৪টি অপহরণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। তবে এর বাইরেও অপহরণের ঘটনা আছে আরো শতাধিক। 

পরিস্থিতি এমন, আতঙ্কে অনেকে সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকেও বের হন না। স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও এই অপরাধে জড়িতদের বিচার চান।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে অপহৃত এক ব্যক্তিকে কুতুপালং ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে র‌্যাব। আবার ক্যাম্প থেকে অপহৃত এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয় চকরিয়ায়। এসব কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীরা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলছেন অনেকে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এখন পর্যন্ত যেসকল অপরাধ সংগঠিত হয়েছে তা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এখনই এসব বিষয়ে আরও জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে।

এপিবিএনও বলছে, এসব অপরাধে স্থানীয়দের যোগসাজশ পাওয়া গেছে। ১৬ এপিবিএন অধিনায়ক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ী এলাকাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি অপরাধ চক্র গড়ে উঠেছে। কিছু কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা এবং বাঙালিরা একত্র হয়ে যায়।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেছেন, অপহরণ ও মানব পাচারকারীদের ছত্রছায়ায় থেকে ক্যাম্পের আরও অনেকেই অপহরণ, মানব এবং ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। অভিযানে যারা ধরা পড়ছে, তারা তো বহনকারী কিংবা সহযোগী। আমরা চেষ্টা করছি রোহিঙ্গা গডফাদারদের ধরার।

কেবল অপহরণ, মানব কিংবা মাদক পাচার নয়, স্বর্ণ পাচারেও জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। গত সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম কোনারপাড়া শূন্যরেখা থেকে জয়নুল আবেদীন (৫৫) নামে এক রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪৭০ ভরি ওজনের ৩৩টি স্বর্ণবার।

জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ১২৯৮টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি হয়েছেন দুই হাজার ৮৫০ রোহিঙ্গা। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে- ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক পাচার, মানব পাচার ইত্যাদি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭০টি খুনের মামলা হয়েছে গত চার বছরে। এই সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অন্যান্য অপরাধে হয়েছে ৮৯টি মামলা।

২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি। আসামি ছিল ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি। যার আসামি ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৮৪ মামলায় হয়েছে ৪৪৯ আসামি। চলতি বছরের ছয় মাসে ৫৬৭ মামলায় আসামির সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *