ঢাকা, রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন
‘নস্টালজিয়া’ আঁকড়ে জার্মানির বুকে প্রথম বাংলা ব্যান্ড
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

‘নস্টালজিয়া’ আঁকড়ে জার্মানির বুকে প্রথম বাংলা ব্যান্ড

জার্মানির অলিতে-গলিতে ব্যান্ডের ছড়াছড়ি। জ্যাজ়, পপ, রক, মেটাল কী নেই! সবকটা ইউরোপীয় ভাষাতেই ব্যান্ড রয়েছে এখন। তবে নেই কোনও বাংলা ব্যান্ড। সেই অভাবটাই বেশি করে চোখে পড়েছিল প্রবাসী বাঙালি অর্ণব গুহর। কর্মসূত্রে জার্মানিতে আছেন দশ বছর। পাকাপাকি বাসিন্দা হয়ে গেছেন এখন। তবু কলকাতার স্মৃতিরা ভিড় করে আসে। হারিয়ে যাওয়া গান আর শব্দরা উঁকি দিয়ে যায় বাঙালি সত্ত্বায়। কোথায় বাঙালিয়ানা, কোথায় সেই প্যাশন! জার্মানির রাস্তায় দাঁড়িয়ে “শহরের উষ্ণতম দিনে” গাইবার বড় সাধ তাঁর। কিন্তু শেকড়ের চিহ্নটুকুও খুঁজে পান না। শেষে চেতনার গভীর থেকে এক এক করে বিদ্রোহ উঠে আসে। ঠিক করেন, ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে বসেই কিছু একটা করতে হবে। হৃদয় থেকে মহীনের ঘোড়াগুলোকে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবেন না তিনি।


প্রথাগত তালিম না থাকলেও গানটা ভালই গান অর্ণব। শিখেছেন তবলাও। তাই সঙ্গী জুটে গেল জার্মানিতেও। গিটারিস্ট ইন্দ্রনীল রায়। আর পেলেন ফিমেল ভোকালিস্ট পিয়ালী ভৌমিককে। তাঁরাও অবশ্য কর্মসূত্রেই জার্মানিতে। সঙ্গীত তাঁদেরও প্যাশন। অর্ণবের স্ত্রী সোনালী নাথ গুহ আবার লেখালেখি করেন। নতুন কিছু গড়ে তুলতে তাঁরও উৎসাহ কম নয়। সমমনস্করা একজায়গায় হতেই হঠাৎই একটা বড়সড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেললেন অর্ণব। তৈরি করলেন জার্মানির বুকে প্রথম বাংলা ব্যান্ড। নাম ‘নস্টালজিয়া’।

 কেমন সেই পরিকল্পনা? জার্মানি থেকে দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অর্ণব জানান, বাংলা ব্যান্ড হলেও শুরুতে অন্য ভাষার গানও গাইবে ‘নস্টালজিয়া’। কারণ, যেকোনও দেশেই ভারতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি গানের জনপ্রিয়তা রয়েছে। বোঝেনও অনেকেই। কিন্তু বাংলা গান গাইলে শুরুতে দর্শক নাও জমতে পারে। তাই হিন্দি বাংলা পাঁচ মিশেলি গানের কভার করে আগে বিদেশের মাটিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চান অর্ণব।

জানান, তাঁর স্বপ্ন সত্যি হওয়ার প্রথম ধাপ এটাই। তারপর একদিন পরপর দশটা গানই গাইবেন বাংলায়। মুগ্ধ হয়ে শুনবেন জার্মানবাসী।

তবে এ সবকিছুরই পরিকল্পনা হয়েছিল গত বছর। করোনার আতঙ্কে গৃহবন্দী তখন গোটা বিশ্ব। একসঙ্গে হয়ে গানবাজনা করবেন এমন পরিস্থিতি ছিল না। ওয়ার্ক ফ্রম হোমের শেষে ফোন আর ভিডিও কলেই কথাবার্তা চলত। তাই ব্যান্ড গড়া তখনই সম্ভব হল না।


ব্যান্ড আগেও গড়েছেন অর্ণব। এমবিএ শেষ করে যখন বেঙ্গালুরুতে কর্মরত ছিলেন, বাঙালি বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘আলপিন’। সেই আলপিনই সব হত, যদি না কাজের সূত্রেই ফের জার্মানিতে বদলি হতেন। ‘আলপিনে’র সদস্য হয়ে হিন্দি বাংলা পাঁচমেশালি গানের পারফর্ম করতেন অর্ণব। তবে জার্মানিতে বসে এতবছর পর ব্যান্ড তৈরির ইচ্ছেটা আসে অন্য তাগিদ থেকে।

অর্ণব জানান, বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে এখানকার মানুষের তেমন ধারণা নেই। এমনকী জার্মানিতে বড় হওয়া বাঙালি ছেলেমেয়েরাও শোনে না বাংলা ব্যান্ড। বড় হয়ে গান বাজনার জগতে পা রাখলেও তাদের মুখ থেকে চট করে বাংলা গান বেরোয় না। কিন্তু অর্ণব চাইছেন বাংলা গানই শুনুক জার্মানি। ভাষা যাঁরা বোঝেন না তাঁদের কাছেও বাংলার মাধুর্য্য পৌঁছে দেবার লক্ষ্য নিয়েছে ‘নস্টালজিয়া’।

এমনকী জার্মান ভাষায় রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। রবীন্দ্র সংগীতের মূল ভাব অক্ষুন্ন রেখে মন মাতানো ফিউশন গড়তে চায় নস্টালজিয়া। লোকে কী বলবে সে নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন অর্ণব। বাঙালির মনেপ্রাণে প্রেম, বিদ্রোহ, দেশাত্মবোধের যে ঐশ্বর্য্য লুকোনো রয়েছে তাই বিশ্বের সামনে মেলে ধরার তাগিদটা অনেক বড়। আর সেই অনুপ্রেরণা রবি ঠাকুরই। নস্টালজিয়ার পারফরম্যান্সে তাই বেশ কয়েকটি রবীন্দ্র সংগীত থাকবেই।

তবে এখনই নয়। অর্ণব জানান, তিনি ছোট্ট ছোট্ট লক্ষ্য স্থির করার পক্ষপাতী। করোনার বিধ্বস্ততা কাটিয়ে আগে গড়ে উঠুক ব্যান্ড। নিয়মিত রিহ্যার্সাল শুরু হোক। তারপরই শো। তার আগে সিটিসেন্টার বা জাইলেই স্ট্রিট শো শুরু করতে চায় ‘নস্টালজিয়া’। আপাতত মিউজিশিয়ান খুঁজছেন। ঠিকঠাক ড্রামার, কিবোর্ড আর্টিস্ট না পেলে ব্যান্ড তৈরি হবে কী করে! নস্টালজিয়ার এখনও অনেক পথ হাঁটা বাকি। তবে একটু একটু করে পাখা মেলছে।

ঘরবন্দী অবস্থায় আড্ডায় গানে একঝলক নস্টালজিয়া রেকর্ড করে অর্ণবরা তুলে দিয়েছেন ইউটিউবে। সেই আদলেই শুরু হয়ে গিয়েছে ব্যান্ড। পেশা নয়, প্যাশনটুকু সম্বল করেই আগামীদিনে এগিয়ে চলবে নস্টালজিয়া। যেখানে বিশ্বের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের জন্যই গাইবেন অর্ণবরা। গাইবেন বিশ্বের মাঝে বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখতে। খবর  দ্য ওয়ালের/ এনবিএস/২০২১/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *