ঢাকা, রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:০১ পূর্বাহ্ন
কেরলে নিপা-আতঙ্ক, করোনার মতোই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে আরও এক আরএনএ ভাইরাস
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

কেরলে নিপা-আতঙ্ক, করোনার মতোই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে আরও এক আরএনএ ভাইরাস

 ১২ বছরের ছেলেটা ভয়ঙ্কর সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল কোঝিকোড়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। প্রথমে ডাক্তারদের মনে হয়েছিল কোভিড, পরে রোগের উপসর্গ দেখে বোঝা যায় নিপা ভাইরাসের (Nipah Virus) সংক্রমণ ছড়িয়েছে বাচ্চাটির শরীরে। একই সঙ্গে এনসেফ্যালাইটিস ও মায়োকার্ডিটিস ধরে গিয়েছিল অর্থাৎ প্রদাহ শুরু হয়েছিল মস্তিষ্ক ও হার্টের পেশীতে। বাঁচানো যায়নি।

২০০১ সালে নিপা ভাইরাস মাথাচাড়া দিয়েছিল ভারতে। সংক্রমিত ৬৬, মৃত্যু কম করেও ৪৫। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল অবধি দাপিয়ে বেড়িয়েছে নিপা ভাইরাস। পশ্চিমবঙ্গে শিলিগুড়িতে একসময় এই ভাইরাসের সংক্রমণ খুব বেশিমাত্রায় ছড়িয়েছিল। গত দু’বছর ধরে করোনা আতঙ্কে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে কোনও সচেতনতাই তৈরি হয়নি। এখন ফের একবার এই সংক্রামক ভাইরাস মাথাচাড়া দিয়েছে। কেরলে ইতিমধ্যেই এই ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নিপা ভাইরাসকে বলে জুনটিক ভাইরাস (Zoonotic Virus), অর্থাৎ পশুর থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। এই ভাইরাসের বাহক বলা হয় বাদুড়কে। ফ্লাইং ফক্স (বৈজ্ঞানিক নাম পিটারোপাস মিডিয়াস)  নামে এক ফলভোজী বাদুড় এই ভাইরাসের বাহক। বাদুড় থেকে কুকুর, বিড়াল, ছাগল, ঘোড়া বা ভেড়ার শরীরে মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত পশুদের দেহের অবশিষ্টাংশ, বা মলমূত্র থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।


করোনাভাইরাস যেমন আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) ভাইরাস, নিপাও তাই। প্যারামাইক্সোভিরিডি পরিবারের অন্তর্গত, হেনিপাভাইরাস গণের। ১৯৯৯ সালের আগে অবধি এই ভাইরাসের কথা শোনা যায়নি। ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় হেন্দ্রা ভাইরাস (HeV) ছড়িয়ে পড়ে, নিপাও অনেকটা এরই মতো। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার একটি গ্রামে নিপা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সেই গ্রামের নাম থেকেই ভাইরাসের এই নাম দেওয়া হয়।


অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স (এইমস)-এর মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আশুতোষ বিশ্বাস বলেছেন, নিপা ভাইরাস আক্রান্ত হলে কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো কোনও টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে  মৃত্যুর হার বিশ্বে গড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ। রোগের উপসর্গ প্রথম অবস্থায় অন্য যে কোনও ভাইরাস সংক্রমণের মতোই। জ্বর, মাথাব্যথা, বমি। কিন্তু এর পরের ধাপেই ভাইরাস তার খেলা দেখাতে শুরু করে। মাথায় পৌঁছে যায় সংক্রমণের রেশ। শুরু হয় খিঁচুনি। গলা ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকে রোগী। বাড়াবাড়ি সংক্রমণে ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগী কোমা স্টেজে চলে যেতে পারেন৷ মস্তিষ্কের প্রদাহ শুরু হয়, হৃদপেশিতেও প্রদাহ হয় অনেকের। এনসেফ্যালাইটিস ও মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হয় রোগী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, আক্রান্ত মানুষকে দ্রুত এমন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, যেখানে রোগীকে সবার থেকে আলাদা রাখার ও ইনটেনসিভ সাপোর্টিভ কেয়ারের ব্যবস্থা আছে। নিপা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে কি না তা বুঝবার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত স্থানে পাঠাতে হবে। ভারতে পুণের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি এবং মণিপাল সেন্টার ফর ভাইরাল রিসার্চ, দু’টি পরীক্ষাগারেই কেবলমাত্র এ পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে।

করোনা ও নিপা দুই আরএনএ সংক্রামক ভাইরাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাদুড় থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। আরও অনেক পশু আছে যারা এই ভাইরাসের মধ্যবর্তী বাহক। কাজেই পশুর মাংস খাওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।  ধরুন যে, প্রাণীর মাংস আপনি খাচ্ছেন, হয়ত সে নিপার বাহক কোনও বাদুড়ের আধ খাওয়া লালা মিশ্রিত ফল খেয়েছিল। কিংবা মাঠে চরে ঘাস খেয়েছে, তাতে বাদুড়ের মূত্র লেগে ছিল। এমন হয়ে থাকলে ভয়ঙ্কর বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। তাই মাংস সুসিদ্ধ করে ভাল করে রান্না করে তবেই খান। আগুনের তাপে জীবাণু মরে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার থেকে ফল কেনার সময় সতর্ক থাকুন। কাটা ফল খাবেন না। নিপা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে ৭৫ শতাংশ বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই আগে থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে।

সাধারণ পরীক্ষায় নিপার সংক্রমণ ধরা পড়ে না৷ থ্রোট সোয়াব, অর্থাৎ গলা থেকে তরল নিয়ে রিয়েল টাইম পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন বা আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করে সংক্রমণ ধরতে হয়। কোভিডের মতোই আরএনএ ভাইরাস শণাক্ত করার জন্য আরটি-পিসিআর পরীক্ষাই সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। শিরদাঁড়ার তরল, ইউরিন ও রক্ত পরীক্ষাও করার ডাক্তাররা৷ ক্ষেত্রবিশেষে আইজিজি ও আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করেও দেখা হয়। খবর দ্য ওয়ালের/২০২১ / এনবিএস/একে 

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *