ঢাকা, বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:২৪ অপরাহ্ন
রাজবাড়ীতে রাজনৈতিক নেতাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও অর্থের জোগান
রাকিবুল ইসলাম রাফি

রাজবাড়ীতে রাজনৈতিক নেতাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও অর্থের জোগান

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী জেলা। এর মধ্যে পাংশা স্পর্শকাতর ও সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল জুড়ে অপরাধপ্রবণতার জন্য এই উপজেলাটির পরিচিতি আশির দশক থেকে।

দুই হাজার সাতের পরে যে ‘নতুন ধারার পর্বের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার এই অঞ্চলের মানুষের রাজনীতি ক্রমশ সুস্থ ও ইতিবাচক হয়ে উঠবে। প্রথম দু'য়েক বছর মোটামুটি ভালো চললেও পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে দূষিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে মূল ধারার রাজনীতি লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। 

বর্তমানে পাংশায় হাতুড়ি বাহিনী, কুদ্দুস বাহিনী, মতিন গ্রুপ, ওমল বাহিনী, বিপুল বাহিনী সহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। যাদের নামে গ্রুপ গুলোর নামকরণ তাদের অনেকে বিভিন্ন মিশনে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও দাপট টিকিয়ে রাখতেই গ্রুপগুলোর অন্য সদস্যরা একই নামে চালাচ্ছে। যাদের নামে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এই ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ তারা অনেকেই ছিলেন আশির দশকের পোরেত বাহিনী কিংব বাংলা বাহিনীর মতো বড় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য। বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ হলেও স্থানীয় তারা মূলত এক সংসদ সদস্য ও চারজন ইউপি চেয়ারম্যান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়াও শুধু পাংশায় রাজনৈতিক দলের অন্তত ৬টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ সহ ১৩টি গ্রুপ অস্ত্র কেনাবেচায় জড়িত। এই গ্রুপের আথে জড়িত নেতারা বন্দুকের জোরে ভোট আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। তারপর তারা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় গিয়ে যত অনাচার করে। এরা সারাবছরই কমবেশি সক্রিয় থাকলেও বিশেষ বিশেষ সময়ে অধিক পরিমাণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় পুরো উপজেলার সন্ত্রাসীরা তাদের নির্বাচনী প্রার্থীর অর্ডার মোতাবেক বিস্ফোরক ও অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। একই সঙ্গে করে প্রচারনা কাজ।

প্রতিদিনই তারা উপজেলা ও উপজেলার বাইরে বিভিন্ন স্থান জুড়ে অপ্রীতিকর ঘটনা আর আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। দখল করছে নিম্নবর্গের মধ্যে নিমজ্জিত থাকা আতঙ্ককে। সেই আতঙ্ক পুঁজি করে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আধিপত্য আর ক্ষমতাকে। একদিকে প্রতিনিয়ত প্রশাসন যেমন সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে উদ্ধার করছে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র অন্যদিকে কথিত রাজনৈতিক ও সমাজসেবকেরা তৈরি করছে সন্ত্রাসী সংগঠনের নতুন সদস্য আর প্রশাসনের হাতে জব্দ হওয়া পুরনো অস্ত্রের বদলে আমদানি করছে শক্তিশালী এবং আধুনিকতায় সজ্জিত আগ্নেয়াস্ত্র সহ বিভিন্ন অবৈধ অস্ত্র।

অস্ত্র চোরাকারবারিদের সঙ্গে রয়েছে পাংশার একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা। একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে গত বছর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে কুষ্টিয়া পেরাকপুর সীমান্ত হয়ে ভারত থেকে নয়টি অস্ত্র আনা হয়েছিল পাংশায়। একই সময়ে গুলি আনা হয়েছিল ৫০ রাউন্ড, ম্যাগজিন ১৬টি ও ওয়ান শূটার গান ৩টি। সূত্র বলছে সীমান্ত থেকে এসকল অবৈধ অস্ত্র ভারত থেকে ভারতে অবস্থানরত পাংশার শীর্ষ সন্ত্রাসী ওমল পাঠিয়েছিল পাংশার এক রাজনৈতিক নেতার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের কাছে। অপর এক তথ্যে জানা গেছে, একই বছর ১৪ মার্চ সকালের দিকে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি পিস্তল, তিনটি শূটার গান, দুটি ম্যাগজিন ও ১০ রাউন্ড গুলি পাংশায় আসে। একই দিন পাংশা শৈলকূপার উপজেলা সীমান্ত গড়াই নদী হয়ে কলিমহর ও কসবা মাজাইল ইউনিয়নের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিকট আসে দুটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগজিন ও ১২ রাউন্ড গুলি। যার অর্থায়নের মূলে ছিল ওই এলাকার এক ইউপি চেয়ারম্যান। 

রাজনীতি সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হওয়াই অনেকে বর্তমান সময়ে এসে এই ব্যবসায় ওয়ার্ড থেকে শুরু করে উপজেলা-জেলায় পদ নিয়ে বসে আছেন। আর একারণেই নেপথ্যে রাজবাড়ী জেলার পাশাপাশি উপজেলার রাজনীতির ক্রমধারা। কারণ বিবেচনায় এমন তথ্যই নিশ্চিত করেছেন কয়েকজন অপরাধ বিশ্লেষক। সম্প্রতি জেলায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা থেকে এ ধারণা করা যায়। কিছু ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থেকে মিলেছে এমন প্রমাণও। যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের দলীয় পদে থাকা স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

২০১৪ সালের পর পাংশায় পিস্তল-রিভলবার জাতীয় ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের চোরাচালান বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ভারত সীমান্ত থেকে পাবনা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ রুট হয়ে নদী পথে আসা এসব অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে জেলার আতঙ্কিত উপজেলা পাংশার আনাচে-কানাচে। হাত বাড়ালেই মিলছে আগ্নেয়াস্ত্র। পাংশায় রাজনৈতিক তৎপরতা, সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জমি দখল থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায় ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারেও ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহার করছে রাজনৈতিক নেতা ও ক্যাডাররা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতার প্রশ্রয়ে জেলার অন্তত ৮টি রুট হয়ে এই উপজেলায় ঢুকছে ছোট ছোট অবৈধ অস্ত্রের চালান। যার প্রতিটি অস্ত্রের আনুমানিক আমদানি মূল্য ২৫-৩০ হাজার টাকা। এসব অস্ত্র বিক্রি হচ্ছে ৫০-৮০ হাজার টাকায়। চোরাইপথে আগ্নেয়াস্ত্রের অধিকাংশ চালানই আসছে ভারত থেকে। জেলায় আমদানি করা অবৈধ অস্ত্রের সিংহভাগের মালিকানা পায় পাংশায় অবস্থানকারী সন্ত্রাসীরা।

অনুসন্ধানের সূত্র ধরে জানা যায় রাজবাড়ীর এই উপজেলার আঞ্চলিকদলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অস্ত্রসহ নানান রশদ ক্রয় করতে অর্থের যোগান দিচ্ছে রেজিস্ট্রি অফিসে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে দলিল মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ। এভাবেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে থেকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে যাচ্ছে পাংশা রেজিস্ট্রি অফিস।

জমি রেজিস্ট্রিতে সরকার নির্ধারিত ফি'র চেয়ে অতিরিক্ত হারে অবৈধভাবে ফি নিয়ে তা আবার বন্টন করা হয় দলিল লেখক থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার মাঝে। রাজনীতির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে জনসেবকের মুখোশের আড়ালে নিজের প্রভাব ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে লালন-পালন করছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী। আর এই সন্ত্রাসী পালনের অর্থের জোগান আসছে নির্দিষ্ট সময় পর পর অনিয়মের আতুড় ঘর এই রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া অবৈধভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ থেকে।

পাংশা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রাজনৈতিক পদে থাকা কয়েকজন দলিল লেখকের অস্ত্রধারীদের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে এমন কয়েকটি প্রমাণও মিলেছে অনুসন্ধানে।

স্থানীয় রাজনৈতিক চক্রের ধারাবাহিকতায়, অর্থায়নের প্রাতিস্বিক যোগানের কারণে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের উর্বর ভূমি হয়ে উঠছে পাংশা। তবে পাংশার এ পরিবর্তনের হেতুর উৎস খুঁজে বের করার জন্য অধিক গবেষণার প্রয়োজন এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল হতে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের যৌথ প্রয়াসে শুধু পাংশা নয় পুরো জেলাকেই সুস্থ, সুন্দর ও সত্যের পূজারী হয়ে উঠার স্বার্থকতা অর্জন করার কৃতিত্ব অর্জন করতে হবে। অনুসন্ধানে সাক্ষাতকালে এমনটাই বলেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব, এসজিপি ,এএফডব্লিউসি, পিএসসি।

প্রথাগতভাবে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীরা তাদের নিজস্ব এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং লক্ষ্যবস্তুও নির্ধারণ করে নিজ এলাকার মাটি মানুষকে। তাঁদের দাপটে, সন্ত্রাসে, অর্থ-বিত্তের ক্ষমতায় ও আত্মীয়তার জোরে দলের নীতিবান, সৎ, সজ্জন ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মীরা প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

সময়ের বিবর্তনে, বিশ্বায়নের সামগ্রিকতায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলগুলো তাদের সংগঠনকে দৃঢ় মনোবল রাখার প্রত্যয়ে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিংবা পাশ করা শিক্ষার্থীরা এ রাজনীতিতি যোগ দিলেও কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেও দেখা গেছে। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে ও বিনির্মাণে প্রযুক্তির উপর্যুপরি ব্যবহারে জীবনমান একদিকে যেমন উজ্জ্বল্য আকার ধারণ করছে অন্যদিকে জীবনকে জটিল ও কলুষিত করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার বিদ্যমান। আর যার প্রভাব পড়ছে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা অপরাধীদের সক্রিয় করে রাখতেও শিক্ষিত যুবকদের ভূমিকা রাখতে বাধ্য করছে। কেননা শিক্ষিত যুবকেরাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিক অবকাঠামো, পরিকল্পনা ও আইন শক্তিমত্তা সম্বন্ধে খুব সহজেই অবগত হতে পারে। বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়েই আন্তর্জাতিক অপরাধীদের পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং তাদের কার্যক্রমকে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ করে তুলছে ও নিজেরা হয়ে উঠছে ভয়ংকর।

আমরা প্রায় দূষিত রাজনীতির জন্য রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করি। নিন্দা করি। দূষিত রাজনীতি ও দুর্বৃত্ত নেতাদের যারা প্রশ্রয় দেয়, আমরা তাদেরও সমালোচনা করি। কিন্তু নির্দল নাগরিকও কি এ জন্য কম দায়ী? সবাই ভোট দিয়েই তো তাঁদের নেতা বানিয়েছি। সত্যের খাতিরে বলা দরকার, সব রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীরা দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত নন। বড় কয়েকজন নেতা আর তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি অংশ, অঙ্গসংগঠনের নেতাদের একটি অংশ এই দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে পাংশার রাজনীতি প্রসঙ্গে এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ নাজমুল। 

বিখ্যাত রাজনীতিবিজ্ঞানী জোসেফ নাঈ বলেছেন, বিশ্বায়নের উন্নয়নই যুদ্ধকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং এ সুযোগটাই সন্ত্রাসীরা কাজে লাগাচ্ছে। যার প্রভাব দেশের ছোট্ট গ্রামগুলোকেও রক্ষা দিচ্ছে না।

রাজবাড়ীর ভয়ঙ্কর এই জনপদের সন্ত্রাসী এবং তাদের পরিচালনার অর্থের যোগানদাতা রাজনৈতিক নেতাদের চিহ্নিত করতে মাঠে মাঠে কি নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা কোনো তদন্ত কমিটি আছে? 

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *