ঢাকা, সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:০৯ অপরাহ্ন
ডেঙ্গি-করোনার জোড়া ফলায় বিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা, কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা?
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

 
ডেঙ্গি-করোনার জোড়া ফলায় বিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা, কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা?

করোনা করোনা নিয়ে শোরগোল ফেলে, ডেঙ্গি, (Dengue) ম্যালেরিয়ার সচেতনতা কি ফিকে হয়ে গেল? একেই করোনার (coronavirus) নতুন নতুন প্রজাতি, সেই সঙ্গে ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়া (Malaria) হলে কী হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল স্বাস্থ্য দফতর। এখন সেই আতঙ্কই ফের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।


গত বছর রাজ্যের শেষ পরিসংখ্যাণ বলছে ডেঙ্গি কেসের সংখ্যা অনেক কমেছে। আক্রান্তের সংখ্যার মাপকাঠিতে কলকাতা (Kolkata) ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এগিয়ে ছিল। কমেছিল ম্যালেরিয়াও। ২০১৯ সালে যেমন হাজার তিনেকের বেশি ডেঙ্গি কেস ধরা পড়েছিল রাজ্যে। গত বছর সেখানে সংখ্যাটা ছিল একশোর কিছু বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডেঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ কমেছিল, সচেতনতার প্রচারও হয়নি সেভাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। দেশের কয়েকটি রাজ্যে ডেঙ্গির প্রভাব মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এ রাজ্যে ডেঙ্গির সঙ্গে বাড়ছে ম্যালেরিয়ার প্রকোপও। বাংলাদেশে আবার ডেঙ্গির অতি সংক্রামক প্রজাতি ‘ডেনভি-৩’ ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। কাজেই করোনার মধ্যে যদি ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়া আরও আছড়ে পড়ে তাহলে কী হবে সে নিয়ে চিন্তা বেড়েছে স্বাস্থ্য ভবনের। আরও একটা ব্যাপার হল রোগ চিনে নেওয়া। জ্বর মানেই যে সেটা কোভিড তা নাও হতে পারে। রোগের লক্ষণ চিনতে ভুল হলে চিকিৎসাতেও দেরি হবে। আর যদি ডেঙ্গি ও কোভিড একসঙ্গে হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে কী করণীয়, কীভাবে সতর্ক থাকতে হবে, সে নিয়ে জরুরি পরামর্শ দিলেন রাজ্যের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা।

বর্ষার এই সময়টা ডেঙ্গির উপদ্রব বাড়ে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের চিকিৎসক অরুনাংশু তালুকদার বললেন, এখন ডেঙ্গির সিজন চলছে। তাই অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের খেয়াল রাখতে হবে, কী লক্ষণ নিয়ে রোগী হাসপাতালে আসছে। ডেঙ্গির জ্বর আর কোভিডের জ্বর কিন্তু এক নয়। কিছুটা ফারাক আছে, সেটা ধরতে হবে। যেমন ডেঙ্গি হলে প্রথম থেকেই ধুম জ্বর আসে। কোভিডেও হতে পারে, কিন্তু ডেঙ্গি হলে জ্বরের সঙ্গে মাথা যন্ত্রণা সাঙ্ঘাতিকভাবে বেড়ে যায়। মনে হয় মাথার দু’পাশটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সারা গা-হাত পায়ে ভয়ানক ব্যথা হয়। হাড় ভেঙে গেলে যেমন যন্ত্রণা হয়, ডেঙ্গি হলে সারা গায়ে ঠিক তেমনই ব্যথা শুরু হয়।

এটা হল একদম প্রাথমিক লক্ষণ। এর পরে যেটা হতে পারে তা হল সারা গায়ে র‍্যাশ বেরনো। অনেক ডেঙ্গি রোগীরই গায়ে চাকা চাকা র‍্যাশ বের হতে পারে। কোভিড হলে শ্বাসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, দম নিতে কষ্ট নয়, ডেঙ্গিতে তেমন কিছু হয় না। করোনা হলে শ্বাসনালীতে সংক্রমণ হয়, ডেঙ্গির চরিত্র আবার আলাদা। সেক্ষেত্রে বমিভাব, ডায়েরিয়া হতে পারে রোগীর। বাড়াবাড়ি হলে রক্তে প্লেটলেট বা অনুচক্রিয়া কমতে শুরু করবে।


ডা. অরুণাংশু তালুকদার বলছেন, ধরুন কোনও রোগীর জ্বর কমছে না। হাসপাতালে এলে আগে তার রক্ত পরীক্ষা করানো হচ্ছে। কারণ ডেঙ্গিতে প্লেটলেট কমতে থাকে, করোনার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আবার আলাদা, প্লেটলেট বেড়ে যায়। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দু’জায়গাতেই একই রকম, বিশেষ কোনও ট্রিটমেন্ট নেই। বেশি করে জল খাওয়া, রোগীকে বিশ্রামে থাকতে বলা আসলে কোভিড-ভীতির কারণে মানুষের মধ্যে জ্বর লুকনোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাই ঠিক কতজন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন তার সঠিক পরিসংখ্যাণ মেলেনি এখনও। রক্ত পরীক্ষাতে জানা যাবে ম্যালেরিয়া হয়েছে কি না।

এই বিষয়ে ফর্টিস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ রাজা ধর বলছেন, যেহেতু ডেঙ্গির সময় তাই তিনটে জিনিস মাথায় রাখতেই হবে। এক, রোগীর জ্বর, দুই, কম প্লেটলেট ও তিন, গায়ে র‍্যাশ। তখন আর দেরি করা চলবে না, পরীক্ষা করে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে কোভিড টেস্টও মাস্ট। ডেঙ্গি হলেই যে করোনা হবে না তেমনটা তো নয়। তাই একদিকে যেমন রক্তের কিছু পরীক্ষা জরুরি, তেমনি সেই রোগীর আরটি-পিসিআর টেস্টও করিয়ে নিতে হবে।

ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া এবং করোনা কি একসঙ্গেই হতে পারে? তাহলে কী হবে?
ডা. অরুণাংশু তালুকদার বলছেন, ডেঙ্গি ও করোনা একসঙ্গে হয়েছে এমন নজির কম। তবে অসম্ভব নয়। ডেঙ্গি যেহেতু মশাবাহিত রোগ, তাই করোনা রোগীকে ডেঙ্গির মশা কামড়ালে ডেঙ্গু ভাইরাসও ঢুকবে শরীরে। ডেঙ্গি ও করোনা দুইই আরএনএ ভাইরাস। করোনা যেমন ছোঁয়াচে, একজনের থেকে অন্যজনের হতে পারে, ডেঙ্গি তেমন নয়। তবে ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে ঢুকলে খুব তাড়াতাড়ি বংশবৃদ্ধি করে রোগ ছড়াতে পারে। তখন জটিল অবস্থা তৈরি হবে, বিপদ বাড়বে।

ডা. রাজা ধর বলছেন, কোভিড রোগীর ডেঙ্গি হতে দেখা গেছে, কাজেই দুই রোগ সহাবস্থান করতে পারে এমন প্রমাণ মিলেছে। দুটো অসুখকে এখন আলাদা করার চেষ্টা করাটা যুক্তিযুক্ত নয়। যেহেতু করোনা এখনও যায়নি, আবার ডেঙ্গির মরসুমও শুরু হয়ে গেছে, তাই ঝুঁকির কারণ রয়েছে।


বস্তুত, গত বছরই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কোভিড, ডেঙ্গি ও এনসেফেলাইটিসের সংক্রমণ নিয়ে একটি শিশু ভর্তি হয়েছিল। একজনের শরীরে ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম ছিল, সেই সঙ্গেই করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। অন্য আর একটি শিশুর এনসেফেলাইটিসের চিকিৎসা চলছিল। পরে জানা যায় সে করোনা আক্রান্ত। কাজেই কোভিডের সঙ্গে অন্যান্য সংক্রামক রোগও ধরা পড়ছে রোগীর শরীরে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, ডেঙ্গির সবথেকে মারাত্মক পর্যায় হল এই ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম। ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম হলে শরীরে জলের পরিমাণ কমে যায়। পালস রেট বাড়ে, রক্তচাপও কমে যায়। সেই সঙ্গে করোনা ধরা পড়লে তার উপসর্গও দেখা দেয়। এইসময় দ্রুত চিকিৎসা দরকার, রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

 
করোনা ও ডেঙ্গি দুটোই যদি সিভিয়ার হয়ে যায়, তাহলে লড়াইটা কঠিন হবে, বললেন, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কমিউনিটি মেডিসিন) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. অনির্বাণ দলুই। ডাক্তারবাবু জানাচ্ছেন, কোভিড হলে ফুসফুসের ক্ষতি হবে, আর ডেঙ্গি সিভিয়ার হলে রক্তক্ষরণ বা হেমারেজের আশঙ্কা থাকে। হেমারেজিক ডেঙ্গি ফিভার হলে রক্তের মধ্যে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা কমে যায় এবং রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়। যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং চামড়ায় ছোট ছোট রক্তের দাগের মত র্যা শ হয় ।কাজেই দুটো রোগ একসঙ্গে হলে এবং জটিল পর্যায়ে গেলে তখন খুব সতর্কভাবে চিকিৎসা করতে হবে।

করোনা ও ডেঙ্গি দুই রোগেরই নির্দিষ্ট ওষুধপত্র নেই। তাই এখানেও সতর্কতা দরকার। ডা. অনির্বাণ দলুই বলছেন, কোভিড রোগীদের স্টেরয়েড দেওয়া হয় শারীরিক অবস্থা দেখে, কিন্তু সেই রোগীরই ডেঙ্গি হলে তখন স্টেরয়েড দেওয়ার ব্যাপারে ভাবতে হবে। সাধারণ ভাবে ডেঙ্গি জ্বরের চিকিৎসা রোগের ব্যাপকতা এবং লক্ষণ অনুযায়ী করা হয়। যদি রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, পালস রেট বেড়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায়— তা হলে তা বিপদের লক্ষণ। এই অবস্থায় রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ডেঙ্গি ভাইরাসের কোনও স্বীকৃত টিকা নেই। এর প্রতিরোধ নির্ভর করে জীবাণুবাহী মশা নিয়ন্ত্রণ ও তার কামড় থেকে বাঁচার উপরে। ডা. অনির্বাণ দলুই বলছেন, সাধারণত দেখা যায়, যে অঞ্চলে একটি ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে, সেখানে অন্য সংক্রামক রোগের প্রকোপ কম হয়। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। ডেঙ্গি মশা নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক পদ্ধতি হল এর বৃদ্ধির পরিবেশকে ধ্বংস করা। ডেঙ্গির মশা সাধারণত স্থির ও পরিষ্কার জলে ডিম পারে। তাই বাড়ির চারপাশে যাতে কোনও জায়গায় জল না জমে থাকে তা দেখতে হবে। বাড়ির আশপাশের নর্দমা, ডোবা জল জমতে না দেওয়া ও পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া বাড়িতে জল জমিয়ে রাখা যাবে না। ভাঙাপাত্র, টবে যাতে জল না জমে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন রকম মশা নিরোধক কীটনাশক বা বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল এজেন্ট স্প্রে করা যেতে পারে। আর মশা উপদ্রত অঞ্চলে মশারি টাঙানো মাস্ট।

পাশাপাশি, কোভিড গাইডলাইন মেনে চলতে হবে। ডেঙ্গি মশাও আগেও ছিল, এখনও আছে, এরই সঙ্গে করোনা থাবা বসিয়েছে। কাজেই সচেতনতা ও প্রতিরোধই এই দুই ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ​। ​খবর দ্য ওয়ালের/এনবিএস/২০২১/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *