ঢাকা, শনিবার ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৮:০৪ অপরাহ্ন
একটি সুরক্ষিত সীমানা ও সীমানার জীবন
রাকিবুল ইসলাম রাফি

একটি সুরক্ষিত সীমানা ও সীমানার জীবন

মাইলের পর মাইল কাঁটাতারের বেড়া, মানচিত্রের মতো স্পষ্টভাবে দেওয়া কিছু সীমারেখা। অধিকাংশ মানুষের কাছেই এই সীমান্ত পেরিয়ে পাশের দেশে যাওয়া মানেই পাসপোর্ট-ভিসার মতো কিছু আনুষ্ঠানিকতা। যাওয়ার বেশ আগেই সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিতে হয়। কিন্তু, সীমান্তে যারা বসবাস করেন, তাদের কাছে বিষয়টি ভিন্ন রকমের। তাদের অনেকের কাছে সীমান্ত অদৃশ্য। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই তারা আসা-যাওয়া করেন এপার-ওপার।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত, যা ইঙ্গিত দেয় সুরক্ষা ও নিরাপত্তার। দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ এ সীমান্তের শান্তিপূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সীমান্ত হিসাবে পরিচিত। এ সীমানা অবারিত এবং অনেকটা বিপজ্জনক। উভয় দেশের মধ্যে ৪০৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা নদী ও জলাভূমি থেকে শুরু করে কৃষিজমি এবং কিছু জায়গায় মানুষের বসতবাড়ির মধ্য দিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে সীমান্তের সুরক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সীমান্তের কেবল একটি অংশ কাঁটাতারের বেড়াযুক্ত রাখা হয়েছে।

জীবিকা নির্বাহ, ব্যবসা এবং দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের জন্য প্রতিদিন অনেক মানুষ আইনসঙ্গতভাবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে। প্রকৃতপক্ষে, ভারতে পর্যটকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি, যারা স্থল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যায়। অপরাধমূলক ক্রিয়াকলাপ কেবল এই মানুষে-মানুষে যোগাযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ভারতের দুটি জেলার সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে। কুষ্টিয়ার সাথে নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ সীমান্তের কথাই ধরুন। এখানে বাংলাদেশের সীমানায় ভারতীয়দের ও ভারতীয় সীমানায় বাংলাদেশিদের দেখা মিলবে। তারা এই সীমান্তের চাষের জমিতে কাজ করার জন্য প্রতিটি দিন ‘সীমানা অতিক্রম’ করেন। তবে তাদের জন্য ‘সীমানা অতিক্রম’ শব্দটি সম্ভবত ঠিক প্রযোজ্য না। কারণ, কৃষিকাজের জন্যে তারা শুধুমাত্র তাদের জমিতে যান। অনেকে আবার কাঁটাতারের বেড়া থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়ান।

সীমান্তে দেখা হলো কুদ্দুস বিশ্বনাথের সঙ্গে। ৬৫ থেকে ৭০ বছর বয়স হবে তার। তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক। তার পাশে কাজ করছেন মামুন ও মামুনের ভাই। দুজনেই বাংলাদেশি। তাদের জমি এখনও ভারতের  গ্রামে। এখানকার সীমান্তটি বাংলাদেশ ও ভারতকে আলাদা করেছে এই জমির মাঝখান দিয়ে আড়াআড়িভাবে।

ছোট পিরামিড আকৃতির সীমানা চিহ্ন দেখিয়ে কুদ্দুস বলেছিলেন, “এখান থেকেই ভারত শুরু।” তার মাঠে আসতে হলে এর পাশ দিয়েই হেঁটে ভারতের ভূখণ্ডে আসতে হবে।

কুদ্দুস বিশ্বনাথ বলেন, “প্রতিদিন আমি আমার জমিতে আসার আগে বিএসএফের কাছে আমার আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয় পত্র) জমা দিয়ে আসি। বিকেল চারটায় ক্যাম্প বন্ধ হওয়ার আগে আমাকে কার্ড সংগ্রহ করতে ফিরে যেতে হয়।”

মামুন ও তার ভাইয়ের সীমান্ত পার হতে হাবিবুরের মতো বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে হয় না। মামুন বলেন, “আমরা জমির যত্ন নেই। চাষ করি, রাতে পাহারা দেই, যাতে ফসল চুরি না হয়।”

সীমান্তবর্তী অপর একটি জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে দুই দেশের সীমান্তের মাঝে নদী। যা আমাদের কাছে পদ্মা ও ভারতীয়দের কাছে গঙ্গা। অনেকটা অঘোষিত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে এই নদী। বর্ষায় নদীতে স্পিড বোর্ড ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে টহল দেয় বিজিবি এবং বিএসএফ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমানা ঘেষা বিএসএফ আওতাভুক্ত জেলাটি হলো নদীয়া।

নদীয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমানা ঘেঁষা নদীতে বেশকিছু বড় নৌকা রয়েছে। তবে সীমান্তের বাসিন্দারা ইচ্ছে করলেই নদী পার হতে পারেন না। নৌকাগুলো যাত্রী পারাপারের কাজে ব্যবহৃত হয় না। অভিযোগ আছে, নৌকাগুলো চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত হয়। জেলার তারাপুরের বাসিন্দাদের প্রায় সবাই গবাদি পশু লালন-পালন করেন ও চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নমোচাকপাড়ার পাশের ভারতীয় ভূখণ্ডে একটি জমিতে কাজ করছেন বাংলাদেশি একজন বর্গা চাষি। জমির মালিক ভারতীয় হলেও তিনি বাংলাদেশি চাষিদের দিয়ে কাজ করান। কারণ নিকটস্থ ভারতীয় গ্রাম মিলিক সুলতানপুর এই জমিটা থেকে অনেক দূরে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ-মাহদীপুর সীমান্ত। ইমিগ্রেশন অফিসে পৌঁছনোর বেশ কয়েকশ গজ আগে সীমান্তটি ‘এন-৬’ মহাসড়কটির একেবারে পাশ ঘেঁষে চলে গেছে। এত কাছে যে, যদি কোনো গাড়ি ‘এন-৬’ মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়ে, তাহলে তা ভারতের সীমানায় গিয়ে পড়বে।

সীমান্ত টহল কর্মীরা বলেছেন, তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রয়াস নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ও ভারত ইতোমধ্যেই একটি অ-প্রাণঘাতী অস্ত্র নীতি অনুসরণ করে। বিএসএফ ও বিজিবির দ্বারা গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি ও যৌথ টহল আগের চেয়ে ভালো। সম্প্রতি সব নিরস্ত্র ও নিরীহ সীমান্ত অতিক্রমকারীকে বিজিবির হাতে তুলে দিয়েছে বিএসএফ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ ধরনের ৬০ জন নিরাপদে দেশে ফিরে এসেছেন।

নাম, নাগরিকত্ব ও সম্ভবত রাষ্ট্র ধারণার ধার ধারেন না এই মানুষগুলো। কিন্তু তারা বাস করেন ঠিক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। তারা যা বোঝেন ও যা বোঝা দরকার তা হলো, বাংলাদেশ তাকে খাদ্য দেয়, ভারত তাকে আশ্রয় দেয়। এভাবেই তারা বেঁচে আছেন। কিন্তু সীমান্তের রেখা আন্তর্জাতিক আইন কিংবা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনীতি সম্পর্কে কতটুকুই বা জানেন এই মানুষজন।

তবে সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি সুরক্ষিত সীমানা বলতে কী বোঝায়? ১ হাজার ১১টি সীমান্ত জেলায় বসবাসকারী কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য এর মানে হলো নিরাপদ আশ্রয় এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা সীমান্তরক্ষী বাহিনী করে থাকে। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলের অব্যাহত অর্থনৈতিক বিকাশ এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের জন্য আশার আলো দেখাতে পারে।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *