ঢাকা, বুধবার ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২৮ অপরাহ্ন
‘মায়ের সঙ্গে কাকু শারীরিক সম্পর্ক করে, আমরা আর বাড়ি ফিরব না ’
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

‘মায়ের সঙ্গে কাকু শারীরিক সম্পর্ক করে, আমরা আর বাড়ি ফিরব না ’

 ‘সাহায্য করুন..বাঁচান আমাদের..বাড়ি ফিরতে চাই না’..ফোনের ওপার থেকে এই ক’টা কথাই ভেসে আসছিল। গলাটা কোনও কমবয়সী মেয়ের তা বোঝা গিয়েছিল স্পষ্ট। অসংলগ্ন কথাগুলো একইভাবে আওড়ে চলেছিল। কী বিপদে পড়েছে মেয়েটা তা ভেবেই তড়িঘড়ি তৈরি হলেন পুলিশ কর্তারা।


কন্ট্রোলরুমের হেল্পলাইন নম্বরে তখনও ফোন বেজে চলেছে। রিসিভ করলেই একই গলায় সেই একই কথা।
আর দেরি করেননি পুলিশ কর্তারা। ফোনটা কোথা থেকে আসছে লোকেশন ট্র্যাক করে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। পুলিশ দেখেই ছুটে এসেছিল দুটি বাচ্চা মেয়ে। তাদের মুখে ভয়ের ছাপ নেই, কিন্তু কেমন এক বিষাদ আর ঘৃণা বড় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল। চারপাশে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি পুলিশের। মেয়ে দুটিকে শান্ত করতে তারা যা জানায় তাতেই চোখ কপালে ওঠে অফিসারদের। এমনও অভিযোগ সম্ভব!

পুলিশের কেস ডায়রিতে কোনও বাচ্চা মেয়ের কাছ থেকে এমন অভিযোগ হয়ত কস্মিনকালেও শুনতে হয়নি কোনও তদন্তকারী অফিসারকে।


বাচ্চা মেয়ে দুটি বলেছিল, “মা ঠিক করছে না জানেন। আমাদেরই কাকুর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করেছে। বাবা যখন বাড়ি থাকে না, মা আর কাকুর মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও হয়। আমরা দেখেছি। আমাদের চোখের সামনেই সবটা হয়। মাকে আর ভাল লাগছে না। ওই বাড়িতে আমরা আর ফিরতে চাই না।” (Relationship)

এই অভিযোগ কোনও অপরাধের তালিকায় যোগ হতে পারে না। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে কী হচ্ছে সে নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার এক্তিয়ার পুলিশের নেই। সবটাই জানতেন তদন্তকারীরা, তাও বাচ্চা মেয়েদুটির অভিযোগ শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। নিজের মায়ের প্রতি কতটা অবিশ্বাস, ঘৃণা তৈরি হলে পুলিশের কাছে এমন নালিশ জানাতে পারে দুই কিশোরী মেয়ে।

এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। অবৈধ সম্পর্কের কথা স্বীকার করে নেন ওই মহিলা। এমনকি তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিজের দেওরের সঙ্গেই থাকতে চান। গোটা পরিবারকে বসিয়ে কাউন্সেলিং করিয়েও লাভ হয়নি। কারণ মেয়ে দুটির মা ওই সম্পর্ক থেকে বেরতে চান না। পরিবারের অসম্মানের কথা ভেবে মহিলার স্বামীও কোনও অভিযোগ দায়ের করতে রাজি নন। কাজেই এই ব্যাপারে পুলিশের আর কোনও ভূমিকা নেই।

আহমেদাবাদের এই ঘটনা অনেক প্রশ্ন তুলে দেয়। আইনের খাতায় অপরাধ নয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে এর প্রভাব অতি মারাত্মক। এই ব্যাপারে কলকাতার বিশিষ্ট পেরেন্টিক কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্পর্কে জড়াতেই পারেন। কিন্তু সেই সম্পর্কের প্রকাশ যদি নিজের সন্তানদের সামনে রুচিহীনভাবে আত্মপ্রকাশ করে তাহলে এর ছাপ পড়তে পারে বাচ্চাদের মানসিক গঠনে। নিজের মায়ের প্রতি সন্তানের যে ধারণা তৈরি হবে তা আগামী দিনে তাদের ব্যক্তিগত জীবনকেও সাঙ্ঘাতিকভাবে প্রভাবিত করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের ওপরই ছেলেমেয়েদের সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা তৈরি হয়। বাচ্চার ভাল লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুর ওপরেই মায়ের প্রভাব পড়ে। কিন্তু জীবন শুরু গোড়াতেই মায়ের ওপর এই বিশ্বাস ও নির্ভরতার ভিত যদি টলে যায় তাহলে সন্তানের চারিত্রিক বিকাশেও খামতি তেকে যায়।’ পায়েল ঘোষ বললেন, ‘মা যদি তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরকে এমন খোলাখুলিভাবে সামনে নিয়ে আসেন তাহলে সমাজের নানা সম্পর্কের প্রতি বাচ্চার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে। এর ছাপ পড়বে মানসিক গঠনে। সন্দেহপ্রবণ মন তৈরি হবে। ভবিষ্যতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কোনও সম্পর্কের প্রতিও বিশ্বাস থাকবে না। প্রচণ্ড রুক্ষ, জটিল মানসিকতা তৈরি হবে। এমনকি প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হওয়াও আশ্চর্যের নয়।’

তাহলে এমন পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের কী করা উচিত? পেরেন্টিক কনসালট্যান্ট পায়েল বললেন, ‘যদি বাবা বা মায়ের এমন কোনও সম্পর্কের কথা বাচ্চ জেনে যায় বা চোখের সামনে এমন কিছু ঘটতে দেখে তাহলে বাবা-মাকেই সেটা ভাল করে বুঝিয়ে বলতে হবে। বাচ্চার মনে যাতে নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কোনওরকম তিক্ততা বা অবিশ্বাস তৈরি না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব তাঁদেরই। প্রথমত, নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসরের গোপন বিষয়ে সন্তানের সামনে না আনাই উচিত। দ্বিতীয়ত, যদি বাচ্চার সামনে বিষয়টা আপত্তিকরভাবে চলে আসে তাহলে বাবা বা মা এভাবে বলতে পারেন যে, “নতুন একজন বন্ধু হয়েছে, কিন্তু এই বন্ধুত্বটা গাঢ় নয়। বরং আমাদের নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বটা অনেক বেশি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুমনে সব সময়েই পছন্দ-অপছন্দ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার দ্বন্দ্ব চলে। শৈশব বা কৈশোরের ভাল-মন্দ অনেক ঘটনার রেশ থেকে যায় পরবর্তী জীবনে। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া কোনও একটি ঘটনার অভিঘাত পরবর্তী জীবনকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। তাই শৈশবে অর্থাৎ জীবনের প্রথম পর্যায় থেকেই তার মানসিক গঠন ও আচার আচরণকে একটি নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে হবে বাবা-মাকেই। শিশুর মনোজগৎ এবং বড়দের জগতের মধ্যে একটা বিপরীতমুখী চিন্তার প্রাচীর রয়েছে। সেই প্রাচীর ভাঙার কাজ শিশুর নয়, বড়দেরই। ধরুন, বড়রা যে বিষয়টাকে স্বাভাবিক ভাবছেন, বাচ্চাদের কাছে সেটা অস্বাভাবিক হতেই পারে। নিজেদের পরিচিত সম্পর্কের প্রতি বাচ্চাদের শ্রদ্ধা তৈরি হয়, সনিদের বাবা-মা বাচ্চারা একরকমভাবে দেখতে অভ্যস্ত। সেখানে অন্যরকম সম্পর্ক দেখলে সেটা মনে সাঙ্ঘাতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান পরিবেশে অধিকাংশ পরিবারই ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’-র ধারণায় বিশ্বাসী। সেই জগতে শিশুর জগত গড়ে ওঠে তার বাবা-মাকে কেন্দ্র করেই। আর সেখানে কোনও জটিলতা তৈরি হলে তা বাচ্চার মনোজগতে অন্ধকারের প্রাচীর তৈরি করে। অভিভাবকের প্রতি ঘৃণা তৈরি হলে তার অত্যন্ত কুপ্রভাব পড়বে বাচ্চার জীবনে। আহমেদাবাদের বাচ্চা মেয়েদুটির মতোই আতঙ্কিত, দিশাহারা হয়ে পড়বে যা কখনওই কাম্য নয়।।খবর  দ্য ওয়ালের /এনবিএস/২০২১/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *