ঢাকা, সোমবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন
কঙ্গনার ‘স্বাধীনতা’ মন্তব্যে উস্কে দিচ্ছে ৭৫ বছর আগের বিতর্ক
এনবিএস ওয়েবডেস্ক :

কঙ্গনার ‘স্বাধীনতা’ মন্তব্যে উস্কে দিচ্ছে ৭৫ বছর আগের বিতর্ক

বিতর্ক তৈরিতে তাঁর স্ট্রাইক রেট যে কোনও মারকুটে টি-২০ খেলোয়াড়কে ঈর্ষান্বিত করতে পারে। সেই তিনি কঙ্গনা রানাউত (Kangana Ranaut) এবার দেশের (India) স্বাধীনতা (Independence) নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন যা উস্কে দিচ্ছে ৭৫ বছর আগের একটি বিতর্ক। যখন ব্রিটিশদের শেকলমুক্ত হওয়া ভারত কার্যত দুধের শিশু। কমিউনিস্টদের কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়।’


কী বলেছেন কঙ্গনা?

কঙ্গনার ঠোঁটে কিছু আটকায় না। ছত্রপতি শিবাজী, মোঘল সাম্রাজ্য, পাকিস্তান ক্রিকেট—সমস্ত কিছু নিয়েই তিনি এমন এমন তত্ত্ব সব সামনে এনেছেন যা সাধারণত ইতিহাস বইয়ে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অনেকে তাঁকে কটাক্ষ করে বলেন, কোথায় পেলেন এসব? কঙ্গনা সেসবের জবাব দেন না। উল্টে নতুন কোন ও বিতর্ক তৈরি করে দেন।


এখন কঙ্গনার টপিক হল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। সেইসঙ্গে নেতাজি ও গান্ধীজি। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন শো-এ ‘মণিকর্ণিকা ফিলমসের’ মালকিন বলেছেন, ১৯৪৭ সালে ভারত যে স্বাধীনতা পেয়েছিল তা ভিক্ষে করে পাওয়া। তাঁর মোদ্দাকথা, ১৯৪৭- এ নয়, ভারত আসল স্বাধীনতা পেয়েছে ২০১৪- তে। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। কঙ্গনা এও বলেছেন, যদি কেউ গান্ধীজির সমর্থক হন তার মানে তিনি সুভাষচন্দ্র বসু ও ভগৎ সিংহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। দু’জনকে একসঙ্গে কখনও সমর্থন করা যায় না।

১৯৪৮ সালে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে বিটি রণদিভেও একই কথা বলেছিলেন। তাঁর কথা ছিল, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়!’ এখন কঙ্গনার এই ‘ভিক্ষে স্বাধীনতা’ মন্তব্যে নতুন করে সেই বিতর্ক উস্কে গিয়েছে। চায়ের দোকানে, লোকাল ট্রেনের কামরায় বাঙালির সহজাত রাজনীতির আলোচনায় কঙ্গনার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই বলছেন, এ কথা তো কমিউনিস্টরাও বলেছিল! এ আর নতুন কী!

যদিও পর্যবেক্ষকদের মতে এ ভাবে কঙ্গনার কথার সঙ্গে কমিউনিস্টদের সেই অবস্থানকে জুড়ে দেওয়া নেহাতই শিশুসুলভ চপলতা।

কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪৮ সালে সেকথা বললেও পরে তা সংশোধন করে। দলের দলিলেও তার সংশোধন হয়েছে। যে কারণে ১৯৫১ সালে মাদুরাইয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসে বিটি আরকে সরিয়ে অজয় ঘোষকে পার্টির সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথা প্রবীণ সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, “ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে। তা চলেছিল ’৪৭-এর ১৪ অগস্ট পর্যন্ত। এই লম্বা সংগ্রামকে অস্বীকার করে ওই ভদ্রমহিলা নরেন্দ্র মোদীর গুডবুকে নাম তুলতে পারেন, আরএসএস-কে সন্তুষ্ট করতে পারেন, কিন্তু যাঁরা ন্যূনতম ইতিহাস জানেন তাঁরা ওঁকে মতলববাজ বলবেন।” তিনি আরও বলেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের গৌরবজ্বল ভূমিকা রয়েছে। আরএসএসের তা নেই। কমিউনিস্টরা যা বলেছিলেন তা শুধরেও নিয়েছিলেন। একথা তো ঠিক, তাঁরা যেটা মনে করেন এই স্বাধীনতা আসলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা , অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়। এ ব্যাপারেও আমরাও অনেকে একমত।”

আরএক প্রবীণ সাংবাদিক তথা রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভাশিস মৈত্র বলেন, “গত বছর রামমন্দির নির্মাণের সূচনা অনুষ্ঠানের দিনটিকে স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যেহেতু স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দুত্ববাদীদের কোনও প্রত্যক্ষ অবদান ছিল না সেহেতু ওঁদের মধ্যে স্বাধীনতাকে ছোট করার একটা ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়।” তাঁর কথায়, “উনি ধারাবাহিক ভাবে এসব বলে যাচ্ছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে পুরস্কৃতও হয়েছেন। উনি খুবই উঁচু দরের অভিনেত্রী এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে ওরকম অভিনেত্রী আরও রয়েছেন। শুধু অভিনয়ের জন্যই এত কম বয়সে এই পুরস্কার ওঁর পাওয়ার কথা নয়!” শুভাশিসবাবু যেটা বলেননি সেটা মোটামুটি অনেকের কাছেই স্পষ্ট বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের অনেকের।

দেবাশিস ভট্টাচার্যের মতো শুভাশিসবাবুও বলেছেন, কমিউনিস্টরা যা বলেছিলেন তার সংশোধনও করেছিলেন। এ নিয়ে তিনটি লাইন সেইসময়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিল। একটা বিটি রণদিভেরা যা বলেছিলেন। আর একট লাইনের কথা পিসি যোশীরা বলতেন। তাঁদের মোদ্দা কথা ছিল এই স্বাধীনতাকে সমর্থন ও সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখতে হবে। আর একটি লাইনে ছিলেন অজয় ঘোষরা।

এ ব্যাপারে দুই মূল ধারার কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই ও সিপিএমেরও বক্তব্য প্রায় এক। সিপিআই রাজ্য সম্পাদক স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কঙ্গনা যা বলছেন সবটাই আরএসএসের কথা। আজাদি ঝুটা হ্যায় বিতর্কের কথা উনি জানেন বা পড়েছেন বলেও মনে হয় না। উনি এমন একটা মতাদর্শগত গোষ্ঠীর স্নেহধন্য যাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনও ভূমিকাই ছিল না।” সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তথা প্রাক্তন সাংসদ শমীক লাহিড়ি বলেন, “কঙ্গনা রানাউত যা বলছেন সবটাই আরএসএসের সিলেবাসে পড়ে বলছেন। এর বাইরে ওঁর আর কিছু বলারও থাকতে পারে না। কারণ কমিউনিস্টরা বা জাতীয়তাবাদীরা যখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন, জেলে যাচ্ছেন তখন ওঁর প্রভুরা ব্রিটিশের বুট পরিষ্কার করত! এর বেশি উনি আর কীই বা বলবেন!”। খবর দ্য ওয়ালের/২০২১/এনবিএস/একে 

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি: