ঢাকা, শনিবার ২৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৫:০৪ অপরাহ্ন
লিভার সিরোসিস : এই রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
Reporter Name

লিভার সিরোসিস : এই রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

এটি একটি মারাত্মক ও অনিরাময়যোগ্য রোগ বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। এই রোগে আক্রান্ত হলে যকৃতে ট্রান্সপ্লান বা প্রতিস্থাপন ছাড়া পুরোপুরি আরোগ্য হয় না। লিভারের নানারকম রোগের মধ্যে লিভার সিরোসিসকে চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি রোগ বলে গণ্য করা হয়। এই কারণে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের প্রতি গুরুত্ব দেন চিকিৎসকরা । বিবিসি  বাংলা

লিভার সিরোসিস কি?

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এনএইচএস এর তথ্য অনুযায়ী, যখন লিভারের রোগের নানা পর্যায়ের পর কোষগুলো এমনভাবে আক্রান্ত হয় যে লিভার আর কাজ করতে পারে না সেই পর্যায়কে লিভার সিরোসিস বলে বর্ণনা করা হয়। যখন এই রোগে আক্রান্ত হয় তখন লিভার বা যকৃত তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না। যেমন…

১. বিপাক ক্রিয়া
২. রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরি
৩. ওষুধ বা রাসায়নিকের শোষণ
৪. খাদ্যে পুষ্টি উপাদানের ব্যবস্থাপনা
৫. লিভার সিরোসিস হলে লিভারে সূক্ষ্ম সুতার জালের মতো ফাইব্রোসিসের বিস্তার ঘটে
২. যকৃতে ছোট ছোট দানা বাঁধে ও সেটির বিস্তার ঘটে
৩. ফাইব্রোসিস ছড়িয়ে পড়লে লিভার সংকুচিত হয়ে পড়ে

লিভার সিরোসিস কোনো হয়?

ন্যাশনাল লিভারের ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বি.বি.সি বাংলাকে বলেছেন, বি.সি এবং ডি ভাইরাসের আক্রমণে লিভারে প্রদাহের তৈরি হয়। লিভারে প্রদাহের তৈরি করে বলেই একে বলা হয় হেপাটাইটিস, ফলে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বি ও সি ভাইরাসের আক্রমণে লিভার বা যকৃতের কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে যায়, কার্যক্রম আস্তে আস্তে ব্যাহত হয়। একেই লিভার সিরোসিস বলা হয়ে থাকে।

লিভার সিরোসিস হওয়ার একটি বড় কারণ ফ্যাটি লিভার বা যকৃতি চর্বি জমে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে লিভারে যদি চর্বি জমে গেলে লিভারের কার্যকারিতা কমে যায়।

বাংলাদেশের অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বলে সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে।

ফ্যাটি লিভারের কারণ :

চর্বি তৈরির প্রধান কারণ অ্যালকোহল। এটি ছাড়াও অনেক কারণে চর্বি হয়ে থাকে। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও ফ্যাটি লিভার অনেক বেশি হয়। এর বাইরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন অথবা অন্যান্য রোগের কারণে ফ্যাটি লিভার হয়ে থাকে। স্বাভাবিক ওজন কিংবা কম ওজনের মানুষেরও হতে পারে, সেটিকে লিন ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ

ফ্যাটি লিভার অনেকটা নীরব ঘাতক। স্বাভাবিক বা ফ্যাটের সময় কোনো মানুষই সেভাবে বুঝতে পারেন না। আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে ধরা পড়ে। শুরুর দিকে লিভারের চারপাশে কিছু চর্বি জমা হয়, অন্য কোনো লক্ষণ থাকে না। এরপর ধীরে ধীরে সেখানে প্রদাহ শুরু হয়। এ সময় লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুরুতে শরীরে শক্তি কমে যায় এবং দুর্বল অনুভব করে। ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। এর বাইরে জন্ডিস হতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশ, চোখ, মুখ, হাত হলুদ হতে পারে।

লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা

চিকিৎসকরা যকৃতের রোগে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিকারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন। বর্তমানে বিশ্বে লিভার সিরোসিসের অনেক আধুনিক চিকিৎসা উদ্ভাবিত হয়েছে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-র ক্ষেত্রে শিশুদের জন্মের পরপরই টিকা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্করাও এই টিকা নিতে পারেন।

হেপাটাইটিস সি- থেকে বাঁচতে এক রেজরে একাধিক ব্যক্তির শেভ না করা, রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা পরীক্ষা করে নেয়া, অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক পরিহার – ইত্যাদির মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।দুষিত পানি, অতিরিক্ত মদ্যপান, খোলা ফলমূলের মতো যেসব কারণে যকৃতের রোগ হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

ডা. মোহাম্মদ আলী বলছেন, ”অনেকগুলো কারণে লিভার সিরোসিস বা লিভারের রোগ হয়ে থাকে। সতর্ক হলে অনেকাংশে এগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, শারীরিক পরিশ্রম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা, কোলোস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা, স্থূলতা দূর করা ইত্যাদির মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। বাংলাদেশে এখন লিভার বা যকৃতের উন্নত মানের চিকিৎসা হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে তো বটেই, জেলা বা উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসা সহজলভ্য হয়েছে। লিভার সিরোসিস হলে সারা জীবন বহন করতে হয়, পুরোপুরি আরোগ্য লাভ হয় না। তবে সঠিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জটিলতা দূর করা যেতে পারে।” বলছেন ড. আলী।

এই রোগের ক্ষেত্রে সর্বশেষ চিকিৎসা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা যকৃত প্রতিস্থাপন। বাংলাদেশেই এখন যকৃতের প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছে।

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি: