মাঝরাতে বিয়েবাড়ির ভোজ নিয়ে স্টেশনে হাজির ‘অন্নপূর্ণা’ পাপিয়া, উৎসবে মাতলেন অভুক্ত
Reporter Name

মাঝরাতে বিয়েবাড়ির ভোজ নিয়ে স্টেশনে হাজির ‘অন্নপূর্ণা’ পাপিয়া, উৎসবে মাতলেন অভুক্তরা

 শীতের রাতে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। কেউ খালিপেটে, কেউ বা আধপেটে। এমন করেই তো তাঁরা ঘুমোন রোজ, খোলা আকাশের নীচেই। রানাঘাট স্টেশন চত্বরই ঠিকানা গৃহহীন মানুষগুলোর। কিন্তু সেদিন এই মানুষগুলিই ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন বিয়েবাড়ির পাত পেড়ে! না, স্বপ্ন নয়। তবে স্বপ্নের মতোই সুন্দর বৈকী!
শুক্রবার রাতে এমনই এক কাণ্ড ঘিরে মেতে উঠলেন স্টেশনবাসীরা। পেট ভরে খেলেন রাধাবল্লভি, ভাত, মাছ, চিকেন, দই! সৌজন্যে, পাপিয়া কর। রানাঘাটের বাসিন্দা পাপিয়ার ভাইয়ের বৌভাত ছিল ওইদিন। বৌভাতে বেঁচে যাওয়া খাবারের ভাণ্ডার নষ্ট না করে তিনি নিজে নিয়ে আসেন স্টেশনে। রাত তখন একটা। বিয়েবাড়ির কাজ মিটিয়ে, পরনের শাড়িটুকুও ছাড়ার সুযোগ পাননি পাপিয়া, সোজা এসে পৌঁছেছেন স্টেশনে। তাঁর হাতেই পেট ভরে খেলেন সকলে। আশীর্বাদ করে বললেন, ‘যেন সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা!’

এ ঘটনার ছবি, ভিডিও অচিরেই ভাইরাল হয়ে যায়। তবে অনেকেই জানেন, পাপিয়ার এই কাজ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিনি সারা বছরই রানাঘাট স্টেশন চত্বরের ‘মা অন্নপূর্ণা’। বছরের ৩৬৫ দিনই নিজে হাতে রেঁধে পাত পেড়ে খাওয়ান কয়েকশো মানুষকে। ‘অন্নপূর্ণার সরাইঘর’ অনেকের মুখে হাসি ফোটায় প্রতিনিয়ত।

শুধু তাই নয়, পাপিয়াকে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় পথের প্রান্তে থাকা মানুষজনের সঙ্গে। কখনও তিনি ধুলোমাখা কোনও শিশুকে আদর করছেন কোলে নিয়ে, কখনও বা শারীরিক ভাবে অক্ষম কোনও মানুষকে পরম যত্নে খাইয়ে দিচ্ছেন নিজের হাতে।

কিন্তু এইদিনটা ছিল বিশেষ। ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা! সেখানে এত জন অতিথি ভাল-মন্দ খাবেন, আর স্টেশনে থাকা পাপিয়ার যত্নের মানুষগুলো অভুক্ত থাকবেন, তাই কি হতে পারে! তাই মাঝরাতে বেনারসি পরেই স্টেশনে হাজির পাপিয়া।

কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা পাপিয়া একটি বিউটি পার্লারে কাজ করেন। তাঁর স্বামী অমরেশ সব্জি বিক্রেতা। শুক্রবার পাপিয়ার ভাই দীপঙ্করের বৌভাত ছিল রানাঘাটের সূর্যনগর গ্রামে। সেখানকার কিছু ভবঘুরেকে তিনি ভাইয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণও করেছিলেন। তবে তার পরেও যাঁরা বাদ পড়েছিলেন, তাঁদের কাছে পৌঁছে গেলেন পাপিয়া নিজে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় পাপিয়ার এই কাণ্ড ভাইরাল হতেই কুর্নিশ ও প্রশংসার ঝড় বয়ে গেছে। বড় বড় অনুষ্ঠানে বহু খাবার নষ্ট হওয়ার ছবিই যখন সবসময় সামনে আসে, তখন উল্টোদিকের এই মানবিক ছবি দেখে আপ্লুত সকলে। কিছুজন অবশ্য সমালোচনাও করেছেন এই বলে যে, পাপিয়া আসলে প্রচার পাওয়ার জন্যই এ কাজ করছেন। কিন্তু এর উত্তরও দিয়েছেন পাপিয়া।

পাপিয়া কর সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “…আসল কথাটা সকলকে বলেই ফেলি, সেদিন আমি আর আমার স্বামী দুজনে আরও ৫০ জনের রান্না বেশি করি৷ আমাদের বাবা নেই , তাই অভিভাবক ছিলাম আমরা দুজনে। সবাই যাতে ঠিক ঠাক খাবার পান, কারোর যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেটা আমরা ২ জনেই দেখছিলাম। সেদিন কনেযাত্রীরা রাত বারোটায় ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা গরম খাবার নিয়ে বেরিয়ে যাই।… আর একটা কথা সেজেগুজে ভাইরাল হতে যাইনি, সাজগোজ খুলতে আরও রাত হয়ে যেতো। তাই আমি ওইভাবেই বেরিয়ে যায়। ভাইরাল হতে নয়। দেরি করলে ওদের সাথে আমারও খেতে দেরি হয়ে যেত। …আমি চেয়েছিলাম এখন বিয়ের মরশুম, তাই এই পোস্ট দেখে সকলেই যদি বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো বাসি না করে রাতেই ওই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু এই কাজেও যে এতো গালাগালি খেতে হবে কে ভেবেছিল!”। খবর দ্য ওয়ালের /এনবিএস/২০২১/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি: