জাপানে ইংরেজি শেখাতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার তরুণী, ধুঁকে মারা গেলেন জেলে
Reporter Name

জাপানে ইংরেজি শেখাতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার তরুণী, ধুঁকে মারা গেলেন জেলে

 ছোট্টবেলায় প্রিয় টিভি সিরিজ ‘ওশিন’ দেখতে দেখতে ছোট্ট উইশমা ভাবতেন, তিনিও একদিন জাপান যাবেন। জাপান দেশটাকে যেন স্বপ্নের মতো ভালবেসে ফেলেছিলেন ওই অতটুকু বয়সে। বড় হয়ে সে স্বপ্ন পূরণও হয় তাঁর। কিন্তু কে জানত, এই স্বপ্নই এমন মর্মান্তিক পরিণতি ঘটাবে উইশমার! রীতিমতো অত্যাচার ও অনাচারের কারণে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে হবে তাঁকে!

শ্রীলঙ্কার মেয়ে উইশমা রাথনায়েকে। ১৯৮৮ সালে জন্মেছিলেন কলম্বো শহরে। উইশমা ছোটবেলা থেকেই বাবার উৎসাহে জাপানি ভাষা শিখতে শুরু করেন। তার পরে পড়াশোনা শেষ করেন, স্নাতক হল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আরও কয়েক বছর চেষ্টার পরে ২০১৭ সালে তিনি জাপানে যান শিক্ষা ভিসায়। তবে এ জন্য অনেক টাকা লেগেছিল, তাই বন্ধক রেখেছিলেন নিজেদের বাড়ি। এর পরে টোকিওর নারিতায় গিয়ে থাকতে শুরু করেন ২৯ বছরের উইশমা। পড়াতে শুরু করেন ইংরেজি।

প্রথম-প্রথম সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো চলছিল। তিনি নানা জায়গায় ঘুরছিলেন, নতুন নতুন লোকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছিলেন। সে সব ছবি, গল্প রয়েছেও তঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। শ্রীলঙ্কায় থাকা তাঁর দুই বোন ওয়েওমি ও পূর্ণিমার সঙ্গেও নিয়মিত গল্প হতো তাঁর।দুই বোনের সঙ্গে উইশমা রাথনায়েকে (মাঝে)কিন্তু এসবই বদলে যায় এক বছর পরেই। ২০১৮ সালে তাঁকে বরখাস্ত করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। ক্যানসেল হয়ে যায় তাঁর ভিসা। বাধ্য হয়ে একটি কারখানায় কাজ নেন তিনি। এর পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি জাপানে রাজনৈতিক আশ্রয় চান। তবে ২০১৯ সালে জানুয়ারিতে তাঁর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। অর্থাৎ তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে জাপানে থাকছিলেন। তবে এসব কোনও কথাই তিনি পরিবারের কাউকে জানাননি কখনও।

২০২০ সালের অগস্ট মাসে শিজুওকার একটি থানায় আত্মসমর্পণ করেন উইশমা। জানান, তাঁর কাছে ইমিগ্রেশনের টাকা নেই। সেই সঙ্গেই উল্লেখ করেন তাঁর সঙ্গীর। সেই সঙ্গী তাঁকে রীতিমতো ব্ল্যাকমেল করছে বলে জানান উইশমা। জাপান ছেড়ে গেলে তাঁকে খুন করা হবে বলেও নাকি হুমকি দিয়েছিল সেই সঙ্গী। যদিও এ বিষয়ে খুব বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। কোনও সমস্যায় উইশমা ফেঁসে গেছিলেন কিনা, তাও স্পষ্ট নয়।May be an image of 5 people and people standingএবছরের মার্চ মাসে উইশমার অবস্থা জানতে পারে পরিবার। ততদিনে তিনি বাড়িতে ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছেন। সন্দেহ হওয়ায় টোকিওর শ্রীলঙ্কা হাইকমিশনে যোগাযোগ করে পরিবার। তাঁদের জানানো হয়, উইশমা মারা গেছেন! তবে এ কথা বিশ্বাস করেনি পরিবার। তাঁরা হাইকমিশনের কাছে মৃত বোনের ছবিও চান, যা হাইকমিশন দিতে পারেনি। এর পরে উইশমার দুই বোন ওয়েওমি ও পূর্ণিমা সোজা জাপানে চলে যান দিদির খোঁজে।

অনেক খুঁজে শেষে সন্ধান মেলে উইশমার। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন তিনি। উইশমার বোন পূর্ণিমা জানান, দিদির গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছিল, ওজন কমে গেছিল ২০ কেজি! কী করে এমন অবস্থা হল উইশমার, তা জানতে চেয়ে ওই জেলের ভিডিও দেখতে চেয়েছিলেন পূর্ণিমা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ভিডিও দেখায়নি।অভিবাসন আইন নিয়ে জাপানে প্রতিবাদশেষমেশ ৬ মার্চ মারা যান উইশমা। তথ্য বলছে, উইশমা একা নন। ১৯৯৭ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ২৭ জন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন জাপানে। কিন্তু উইশনার মৃত্যুর পরে জাপানের এই নির্মম আচরণ সামনে এসেছে বিশ্বের। আন্তর্জাতিক মহলে মুখ পুড়েছে তাদের। এখন এই নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন উইশমার দুই বোন। দিদিকে হারিয়েছেন তাঁরা, আর কারও যেন এমনটা না হয়, সেটাই চান। খবর দ্য ওয়ালের/২০২১/এনবিএস/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি: