লোকসভার অঙ্কে ‘দিদি মডেল’ ভাইয়ের, অখিলেশকে ‘লাল টুপি’ কটাক্ষ মোদীর
Reporter Name

লোকসভার অঙ্কে ‘দিদি মডেল’ ভাইয়ের, অখিলেশকে ‘লাল টুপি’ কটাক্ষ মোদীর

‘উত্তরপ্রদেশে লাল টুপি পরা লোকেরা রাজ্যের জন্য রেড এলার্ট। এরা ক্ষমতালোভী, ভয়ঙ্কর।’

জবাব এল, ‘লাল টুপি পরা লোকেরা বিজেপির জন্যই ভয়ঙ্কর। তারাই বিজেপি সরকারকে উৎখাত করে ছাড়বে।’


দুই শিবিরের দুই নেতার এই মন্তব্যের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়ের মূল কৌশল দেখতে পাচ্ছে রাজনৈতিক শিবির। প্রথম বক্তার নাম নরেন্দ্র মোদী। দ্বিতীয়জন অখিলেশ যাদব। লাল টুপি পরেন তাঁরই দল সমাজবাজী পার্টির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা। দলের ঘরোয়া বৈঠক থেকে জনসভা, রোড-শো, অখিলেশকে লাল টুপি ছাড়া বড় একটা দেখা যায় না। সমাজবাদী পার্টির এই দলীয় নিশানকেই মঙ্গলবার নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। মঙ্গলবার গোরখপুরের সভায় মোদী বলেন, ‘লাল টুপি পরা লোকেরা শুধু লালবাতি (সরকারি ক্ষমতা অর্থে) চড়ার বাসনায় রাজনীতি করে থাকে। এরা রাজ্যের জন্য লাল সতর্কতা। খুব সাবধান।’

কালক্ষেপ করেননি অখিলেশ। হিন্দি টুইটে লেখেন, লাল টুপি অবশ্যই রেড অ্যালার্ট। তবে তা বিজেপির জন্য। বিজেপি জমানায় বেরোজগারি, কৃষকের আত্মহত্যা, কৃষি বিল, লখিমপুর খেরি, হাথরাসের ঘটনার জবাব। লাল টুপি পরা লোকেরাই এবার বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করবে।

বিগত কয়েক মাস ধরেই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট নিয়ে সক্রিয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মোদী কখনও দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে, কখনও সশরীরে গিয়ে উত্তরপ্রদেশের জন্য একের পর উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা করছেন। কিন্তু এতদিন তিনি মূলত যোগী সরকারের কাজকর্মের প্রশংসাই করেছেন। নামমাত্র আক্রমণ করেছেন বিরোধীদের। তাও মোদী নিশানা করেন মূলত ওই রাজ্যে লুপ্তপ্রায় শক্তি কংগ্রেসকে। মোদীর কৌশল ছিল, নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধীকে প্রধান প্রতিপক্ষ করে তোলা। প্রচারের আলো থেকে অখিলেশকে দূরে রাখা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তাই এতদিন আক্রমণ করেছেন মূলত অমিত শাহ এবং যোগী। অন্যদিকে, অখিলেশ সেটাই আটকাতে তৎপর ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন, লড়াইটাকে প্রধানমন্ত্রী বনাম তাঁর করে তোলা। মুখ্যমন্ত্রী যোগীকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখা।

বিজেপি সূত্রের খবর, তারা দেখে নিতে চাইছিল, উত্তরপ্রদেশে বিরোধী শিবিরের চেহারাটা মূলত কেমন দাঁড়ায়। ২০১৭-র মতো মোদীকে এবারও সেখানে প্রচারে প্রধান মুখ হিসাবে তুলে ধরার কিছু বাস্তব সমস্যা আছে। আগের ভোটে উত্তরপ্রদেশে সরকারে ছিলেন অখিলেশ। বিজেপি ছিল বিরোধী শিবিরে। এবার বিজেপির পাঁচ বছরের সরকারের কাজকর্মই হল ভোটের প্রধান ইস্যু। প্রধানমন্ত্রীকে এবার প্রধান মুখ করে প্রচারে যাওয়ার সমস্যা হল পরিবর্তিত পরিস্থিতি। ভোটের ফল উল্টে গেলে লোকসভা ভোটের আগেই আবার প্রমাণ হয়ে যাবে মোদী ম্যাজিক শেষ। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে অসমে ক্ষমতা ধরে রাখা ছাড়া বিজেপির তেমন কোনও সাফল্য নেই। পাঁচ রাজ্যেই প্রচারে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মোদী। তাই উত্তরপ্রদেশ নিয়ে খানিক দ্বিধান্বিত ছিল বিজেপি।

এতদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, গত বছর বিহার বিধানসভা নির্বাচনের মুখে গড়ে ওঠা মহাগঠবন্ধন জাতীয় কোনও বিরোধী জোট হচ্ছে না উত্তরপ্রদেশে। কিন্তু অখিলেশ বেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী যোগীর তুলনায় তাঁর রাজনৈতিক ওজন ও ভাবমূর্তি দুই-ই বেশি। তাঁর জনসভাগুলিতে বেশ ভিড় হচ্ছে। বস্তত যত দিন গড়াচ্ছে, বিরোধী ভোটারদের বড় অংশই অখিলেশের দিকে ঝুঁকছেন। তাই মোদীকেই শেষ পর্যন্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মোকাবিলায় নামতে হল। যেমন তিনি পশ্চিমবঙ্গ-সহ আর পাঁচটা রাজ্যে করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরুর অনেক আগে থেকেই তাই প্রধানমন্ত্রী সমাজবাদী পার্টির নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করা শুরু করলেন।

মোদীর মঙ্গলবারের ভাষণে যদিও সমাজবাদী শিবির খুশি। অখিলেশ চাইছিলেন, লড়াইটা হোক তাঁর সঙ্গে মোদীর। যে কারণে কংগ্রেস নানাভাবে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি সনিয়া-প্রিয়ঙ্কার দলের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি হননি। কারণ সেক্ষেত্রে লড়াইটা হয়ে দাঁড়াবে মোদী বনাম রাহুল। উল্টে অখিলেশ এবার কংগ্রেস শূন্য উত্তরপ্রদেশ করার ডাক দিয়েছেন।

সমাজবাদী পার্টি সূত্রের খবর, অখিলেশ পুরোপুরি বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মডেল অনুসরণ করে এগোতে চাইছেন। তা হল, যতটা সম্ভব একার শক্তিতে বিজেপির মোকাবিলা। ইতিমধ্যেই অখিলেশ ঘোষণা করেছেন, কিছু ছোট দলের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টি আসন বোঝাপড়া করবে। তবে কে কোন আসন পাবে তার মাপকাঠি হবে একটাই, সংশ্লিষ্ট আসনে কোন দলের কোন প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তাতে এক-দুটি আসন তৃণমূলও পেতে পারে।

রাজনৈতিক মহল মনে করছে, অখিলেশের বাংলা মডেল সফল হলে তা অবশ্য দিদি মমতার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিধানসভায় সফল হলে লোকসভা ভোটে অখিলেশকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে তুলে ধরতে পারে তাঁর দল, যেমন মমতাকে তুলে ধরছে তৃণমূল।

মমতা-অখিলেশ সম্পর্কের রসায়ন এমনিতে যথেষ্ট ভালো। অখিলেশ বহু সময় নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই বলে উল্লেখ করেছেন। মোদী জমানায় নানা ইস্যুতেই তাঁরা একে-অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হালে উত্তরপ্রদেশে তৃণমূলের তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন অখিলেশ। মমতাও বলেছেন, অখিলেশের পাশে আছি। তবে উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের পর লোকসভা ভোটের অঙ্কে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায় সেটাই এখন দেখার। বরাবরই উত্তরপ্রদেশই লোকসভা ভোটে নির্ধারকের  ভূমিকা নিয়ে থাকে। খবর দ্য ওয়ালের/২০২১/এনবিএস/একে

ইউটিউবে এনবিএস-এর সব খবর দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি: