ইরানজুড়ে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা সহিংস বিক্ষোভের মাঝে বড় ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, তার সরকার দেশের দুর্বল অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করবে এবং জনগণের কথা শোনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
রবিবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়নের পর থেকেই বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে হঠাৎ মুদ্রার পতনে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছে। প্রথমে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ হলেও পরে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয়।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “মানুষের উদ্বেগ আছে। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে বসা এবং দায়িত্ব থাকলে তাদের সমস্যা সমাধান করা। কিন্তু আরও বড় দায়িত্ব হলো, কিছু দাঙ্গাবাজ যেন পুরো সমাজকে ধ্বংস করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।” তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জনগণকে ‘দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পর থেকে এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানি কর্তৃপক্ষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিদেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহিংস গোষ্ঠীর পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও জনগণের ক্ষোভকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর যে চাপ পড়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
এদিকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সংসদে বক্তব্যে শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন। তিনি বলেন, সরকার জনগণের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে স্বীকৃতি দেবে, কিন্তু ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে।
সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে সামরিক পদক্ষেপ নেন, তাহলে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।
ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মতে, দেশজুড়ে ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন শিশু। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ এবং ব্যাপক ধরপাকড় চলছে।
ইরানের এই পরিস্থিতি এখন বিশ্বের নজরে। দেখা যাক পরবর্তী দিনগুলোতে কী ঘটে!
