যদিও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ইসরায়েলকে ড্রোন প্রযুক্তি ও ব্যবহারে শীর্ষে ধরা হয়, বাস্তবতা বলছে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর ড্রোন ব্যবহারের নতুন দিক দেখিয়েছে ইরানই।

কয়েক বছর আগে ইসরায়েল–লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো ইরানি ড্রোনের প্রসঙ্গ সামনে আসে। এরপর ইয়েমেনে হুথিদের ব্যবহৃত ড্রোন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞরা আবারও ইরানের প্রযুক্তিগত সংযোগ খুঁজে পান।

তবে ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইরান যখন রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে, তখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর কিছুদিন আগেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আকাশে ‘জেরেনিয়াম–২’ (শাহেদ–১৩৬) ড্রোন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তখনই সামনে আসে—চার দশকের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে ইরান আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তিগত সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম হলো? ড্রোন প্রযুক্তিতে তাদের এই সাফল্যের মূল শক্তি কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দেশটি ধীরে ধীরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা নিজস্ব সমাধান তৈরি করার দিকে মনোযোগ দেয়।

সেই সময় ইরানের নেতৃত্ব স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের ওপর আস্থা রাখে এবং তাদের উৎসাহিত করে দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করার জন্য।

নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ায় ইরান ধীরে ধীরে একটি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। কিছু ক্ষেত্রে তারা বেসামরিক প্রযুক্তিকেও সামরিক কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে।

সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ইরান ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে থাকে—যা পরবর্তীতে তাদের বড় সাফল্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছাড়ার সময় ইরানের হাতে ছিল ওই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক কাঠামো। তখন ইরানের বিমানবাহিনীতে ছিল আধুনিক এফ–১৪ টমক্যাট যুদ্ধবিমানসহ উন্নত প্রযুক্তির নানা সরঞ্জাম।

তবে এসব বিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ মূলত করতেন ইরানে অবস্থানরত বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। যন্ত্রাংশও আসত সরাসরি বিদেশি কোম্পানি থেকে। ফলে পুরো সামরিক কাঠামো কার্যত বাইরের দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

রাজতন্ত্রের পতনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। অনেক সামরিক কর্মকর্তা দেশ ত্যাগ করেন, কেউ নিহত হন, আবার কেউ কারাবন্দী হন। একই সময়ে বিদেশি প্রকৌশলীরাও ইরান ছেড়ে চলে যান এবং পশ্চিমা কোম্পানিগুলো নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

ফলে কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে—রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের অভাবে সেগুলো কার্যত ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়।

 

news