ঢাকা, শনিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৩ | ১৫ আশ্বিন ১৪৩০
Logo
logo

২৪ ঘন্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে জোড়া খুন মামলার মূল রহস্য উন্মোচন, একজন গ্রেফতার


এনবিএস ওয়েবডেস্ক     প্রকাশিত:  ১১ জুলাই, ২০২২, ০১:৩১ পিএম

২৪ ঘন্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে জোড়া খুন মামলার মূল রহস্য উন্মোচন, একজন গ্রেফতার

সুপারি গাছে লেগে থাকা মাটি দেখে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ব্রাহ্মনদী ইউনিয়নের উজান গোবিন্দি এলাকার লোমহর্ষক রাজিয়া সুলতানা ওরফে কাকুলি এবং তার শিশু সন্তান তালহা (০৮) হত্যা মামলার মূল রহস্য ২৪ ঘন্টার মধ্যে উন্মোচন করলো পিবিআই নারায়ণগঞ্জ। 

০৩ জুলাই ২০২২ তারিখ ভোর আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটের দিকে অত্র মামলার বাদীর মেয়ের স্বামীর বাড়ী হতে বাদীপক্ষকে ফোন করে জানায় তার মেয়ে ও তার মেয়ের ছেলে সন্তানকে কে বা কারা হত্যা করেছে। উক্ত সংবাদ পেয়ে বাদী তার মেয়ের শশুর বাড়ীর লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে, ০২ জুলাই ২০২২ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বাদীর মেয়ে ও তার নাতী প্রতিদিনের ন্যায় রাতের খাবার শেষ করে তাদের নিজ বসত ঘরে শুয়ে পরে।  ০৩ জুলাই ২০২২ তারিখ ভোর আনুমানিক ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে পাশের ঘরের বাদীর মেয়ের জামাইয়ের ভাতিজা বউ জান্নাত (২৫) ঘুম হইতে উঠিয়া ফজরের নামাজের অযু করার জন্য বাহির হইলে বাদীর মেয়ের বসত ঘরের কলাপসিবল গেইট খোলা দেখিতে পাইয়া ভিতরে প্রবেশ করতঃ ঘরের ভিতরে বাদীর মেয়ে ও তার ছেলের মৃত দেহ দেখিতে পাইয়া ডাক চিৎকার করিলে বাড়ীর অন্যান্য লোকজন আগাইয়া আসিয়া দেখিতে পায় যে, বাদীর মেয়ে রাজিয়া সুলতানা কাকলী এর মৃত দেহ বসত ঘরের দক্ষিন পাশের রুমের মেঝেতে মাথায় কাটা রক্তাক্ত জখম ও ধারালো বটি দিয়া গলা জবাই করা অবস্থায় এবং তার ছেলে তালহা (০৮) এর মৃত দেহ বসত ঘরের উত্তর পাশের কক্ষে খাটের উপর ধারালো বটি দিয়া গলা জবাই করা অবস্থায় এবং হত্যা কাজে ব্যবহৃত বটি ছেলের মৃত দেহের পাশেই বিছানার উপর রক্তমাখা অবস্থায় আছে। র্অথাৎ ০২ জুলাই ২০২২ তারিখ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে হতে ০৩ জুলাই ২০২২ তারিখ ভোর আনুমানিক ৪টা ৪০ মিনিটের মধ্যে যে কোন সময় অজ্ঞাতনামা দুস্কৃতকিারী/দুস্কৃতকিারীরা র্পূবপরিকল্পিত ভাবে আড়াইহাজার থানাধীন উজান গোবিন্দি পশ্চিম পাড়া সাকিনস্থ বাদীর মেয়ের বসত ঘরের ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া ধারালো বটি দ্বারা গলায় জবাই করিয়া বাদীর মেয়ে রাজিয়া সুলতানা কাকলী ও বাদীর নাতি তালহা কে হত্যা করিয়া পালাইয়া গিয়াছে। উক্ত ঘটনায় ডিসিস্ট রাজিয়ার মাতা বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানার মামলা নং-০৬,তাং-০৫/০৭/২০২২ ইং,ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড আইনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।  

হত্যাকান্ডের পর হতেই পিবিআই নারায়নগঞ্জ জেলার চৌকস টিম মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করা এবং ঘটনায় জড়িত আসামী গ্রেফতারের নিমিত্তে ব্যাপক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মামলা গ্রহনের দিনেই পিবিআই নারায়ণগঞ্জ ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম,পিপিএম মহোদয়,মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই(নিঃ) শাকিল হোসেন এবং সহযোগী এসআই(নিঃ) মাজহারুল ইসলাম সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের এক পর্যায়ে তদন্তকারী টিম ভিকটিমের বসতঘরের পেছনে দেয়াল এর সাথে লাগানো সুপারি গাছের গোড়া থেকে অনুমান ২ ফিট উপরে এক জায়গায় সদ্য মাটি লাগানো দেখতে পায়। তখন তদন্তকারী টিম সুপারি গাছের উপরে দিকে তাকিয়ে দেখে গাছে কোন সুপারি নাই। এই বিষয়টি তদন্ত দলের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। পিবিআইয়ের চৌকস টিম সাথে সাথে লোকাল সোর্সের সাথে আলোচনা করে জানতে পারে যে উক্ত বাড়ীর পেছনে ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ থাকায় ভিকটিম রাজিয়া সুলতান@কাকুলির ভাসুরের ছেলে অজিদ কাজী(১৬)সহ আরো দু একজন ছেলে উক্ত বাড়ীর পেছনে বসে ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে মোবাইলে নেট ব্রাউজ করে থাকে। এই তথ্য পেয়ে অজিদ কাজী সহ অন্যান্যদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে কাকুলির ভাসুরের ছেলে অজিদ কাজী(১৬) জানায় যে, সে মামলার ঘটনার দিন ০২ জুলাই ২০২২ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভিকটিমদ্বয়ের বাড়ীর পেছনে দেয়াল ঘেসে বসে ওয়াইফাই সংযোগের সাহায্যে মোবাইলে গেমস খেলার সময় হঠাৎ ভিকটিমের ছেলের একটি চিৎকার এর শব্দ শুনতে পায়। তারপর সে ভিকটিমের বাথরুমে কারো হাত ধোয়ার শব্দ শুনতে পায়। তখন সে সাথে সাথে ভিকটিমের বিল্ডিংয়ের পেছনে দেয়াল এর সাথে লাগানো সুপারি গাছ বেয়ে বাথরুমের ভেনটিলেটর দিয়ে উকিঁ দিয়ে একই এলাকার পার্শ্বর্বতী বাড়ীর সাদিকুর ওরফে সাদি (২৪), পিতা- মোঃ মোবারক হোসেন, মাতা- মাসুদা বেগম, সাং- উজান গোবিন্দি, ইউপি-ব্রাক্ষনদী, থানা-আড়াইহাজার, জেলা-নারায়নগঞ্জ কে ভিকটিমের রুমের এটাস্ট বাথরুমের পানির কলে হাত ধৌত করতে দেখে। তখন সে আসামী সাদিকুর কে দ্রুত ঐ ঘর হতে বাহির হয়ে যেতে দেখে। আসামী সাদিকুর বের হয়ে যাবার সময় ঘরের পেছনে অজিদ কাজী কে বসে থাকতে দেখে। অজিদ কাজী ভাবে তার কাকির সাথে সাদিকুরের অবৈধ সম্পর্ক আছে। পরবর্তীতে সকাল বেলা হত্যাকান্ডের ঘটনা প্রকাশিত হবার পরপরই আসামী সাদিকুর সাক্ষী অজিদ কাজীর সাথে দেখা করে বলে“আমার কথা কাউকে বললে তোরে জানে মেরে ফেলব।” এই ভয়ে অজিদ কাজী ঘটনা চেপে যায়। 

এই তথ্য পাওয়া মাত্র পিবিআইয়ের তদন্তকারী টিম সন্দিগ্ধ আসামী সাদিকুর ওরফে সাদিকে (২৪) তার নিজ বাড়ী হতে পিবিআই কর্তৃক মামলা গ্রহনের দিনই অর্থাৎ গত ৯ জুলাই ২০২২ তারিখে গ্রেফতার করে। ব্যাপক এবং নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে আসামী সাদিকুর ওরফে সাদি পিবিআই এর তদন্তকারী টিমের কাছে উক্ত জোড়া খুন মামলায় নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বিস্তারিত বর্ননা দেন। আসামী জানায় সে তাদের এলাকায় সাকিব নিটওয়্যার এ ফিটার ম্যান পোস্টে চাকরি করে। সে বেশ কিছু টাকা ধার করে আইপিএল ক্রিকেট এ জুয়া খেলে নষ্ট করেন। আসামী জানায় পরবর্তিতে পাওনাদারদের চাপে তার মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সে পাগলের মত আরো টাকা খুঁজতে থাকি। এক পর্যায়ে সে জানতে পারেন তার পাশের বাড়ির মৃত ভিকটিম কাকুলী ভাবির কাছে বেশ টাকা পয়সা আছে এবং তার ঘরে অনেক সোনাদানা আছে। সে জানত কাকুলি ভাবির একটা শিশু সন্তান ছাড়া ঐঘরে আর কেউ থাকতনা। কাকুলির স্বামী অনুমান ২ বছর আগেই মারা যায়। তখন আসামী সাদিকুর ওরফে সাদি মনে মনে কাকুলি ভাবির কাছ থেকে টাকা ধার করার চিন্তা করেন। ঘটনার দিন ০২ জুলাই ২০২২ তারিখ রোজ শনিবার সন্ধ্যার সময় অফিস থেকে বাড়িতে আসে এবং কাকুলি ভাবীর বাড়ীর আশপাশ দিয়া হাটাহাটি করতে থাকেন। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে যখন আশপাশের সবাই ঘুমিয়ে যায় তখন সে কাকুলি ভাবীর বাড়ীর গেইটে গিয়া কাকুলি ভাবিকে ৩/৪ বার ভাবি ভাবী বলে ডেকে গেট খুলতে বলে। কিছু সময় পর কাকুলি ভাবী দরজা খলে কলাপসিবল কেচি গেট খুললে সে ভাবী কে জানায় তার মা তাকে ভিকটিম কাকুলীর ইলেকট্রিক বেল্ডার ধার নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। তখন আসামী ভিকটিমের ঘরের ভেতরে ঢোকেন। আসামী রুমে প্রবেশ করে দেখেন তার ছেলে ভিকটিম তালহা (৮) ভাত খেয়ে ঘুমের ভাবে আছে। আসামী তখন ভিকটিম কাকুলী কে পাশের রুমে আসার জন্য বলেন। ভিকটিম কাকুলী পাশের রুমে আসার পর আসামী তখন ভিকটিম কাকুলীর হাতে পায় ধরে ১০ হাজার টাকা চান। ভিকটিম কাকুলী বলে তার কাছে কোন টাকা নাই। আসামী তখন অনেক জোরাজুরি করার পর ভিকটিম কাকুলী তাকে তার আলমারি খুলে বলে “দেখ আলমারিতে শুধু ১০০ টাকা আছে। আর কোন টাকা নাই।” আলমারিটা খুললে সে আলমারির ভিতরে একটি বাক্সে কিছু সোনার জিনিসপত্র দেখতে পায়। তখন সোনা নেওয়ার জন্য তার লোভ লেগে যায়।ভিকটিম কাকুলী তখন আলমারির চাবিটা আলমারির উপরে রাখলে আসামী দেখে ফেলেন। তখন আসামী ভিকটিম কাকুলী কে চেয়ারে বসিয়ে বিছানার উপর থেকে তার ব্যবহৃত ওড়না দিয়া গলায় ফাসঁ দেয়।ভিকটিম কাকুলী নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেলে বিছানার পাশেই রাখা ইস্ত্রি দিয়া ভিকটিম কাকুলীর মাথায় সজোরে আঘাত করলে ভিকটিম পুরাপুরি অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন আসামী সাদিকুর দ্রুত ভিকটিমের রান্না ঘর হতে সবজি কাটার বটি আনেন এবং ভিকটিম কাকুলীকে গলায় পোচ দিয়া জবাই করে ফেলেন। তারপর সে দ্রুত আলমারি খুলে স্বর্ণালংকার- ০১।  ২টি স্বর্ণের আংটি, ০২।  ২টি স্বর্ণের চেইন, ০৩।  ১ জোড়া কানের দূল নিয়ে নেয়। আসামী ঘরের ওয়ারড্রবসহ সব জায়গায় খুজেঁ নেওয়ার মত আর কিছু পায় নাই। তারপর সে পাশের রুমের খাটের উপর ঘুমন্ত তালহা (ভিকটিম কাকুলী) এর  ছেলে কে ঐ বটি দিয়াই গলায় পোচ দিয়া জবাই করে মুত্যু নিশ্চিত করেন। তখন তালহা একটি চিৎকার দিয়েছিল। তারপর আসামী সাদিকুর খুব দ্রুত ভয়ে সোনা নিয়া ঘর হতে বাহির হয়ে যায় এবং ভিকটিমের ঘরের পেছনে সাক্ষী অজিদ কে ফোন চাপতে দেখেন। আসামী তখন অজিদের সাথে কোন কথা না দ্রুত বাড়ি চলে যায়। 

গ্রেফতারকৃত আসামীকে পুলিশ হেফাজতে আনিয়া জিজ্ঞাসাবাদে আসামীর দেয়া তথ্যমতে ভিকটিম দ্বয়ের বসতঘর হতে খোয়া যাওয়া স্বর্ণালংকার- ০১।  ১টি স্বর্ণের আংটি, ০২।  ১টি স্বর্ণের চেইন, ০৩।  ১ জোড়া কানের দূল, আলামতসমূহ উপস্থিত স্বাক্ষীদের সম্মুখে তার শোবার ঘরের বিছানার তোশকের নীচ হতে জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে আসামীর দেওয়া তথ্যমতে ১টি স্বর্ণের আংটি এবং ১টি স্বর্ণের চেইন আড়াইহাজার থানাধীন ডরগাওঁ এলাকার ক্ষুদ্র স্বর্ণের দোকানদার জনৈক গোপাল(২৮), নামক ব্যক্তির কাছে থেকে জব্দ করা হয়। আসামী সাদিকুর এগুলি তার মায়ের স্বর্ন উল্লেখ করে বিপদে পড়ার কথা বলে ১৭ হাজার টাকায় বন্ধক রাখলে সেগুলি জব্দ তালিকামূলে জব্দ করা হয়। এছাড়াও আলামত হিসেবে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ১।  একটি লোহার হাতলযুক্ত বটি, ২।  ১টি ইলেকট্রিক কাপর ইস্ত্রী মেশিন, ০৩।  ১টি রক্তমাখা ওড়না জব্দতালিকামূলে জব্দ করা হয়। আসামী সাদিকুর ওরফে সাদি গত ১০ জুলাই ২২ তারিখে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যজিস্ট্রেট কাওসার আলমের আদালতে (নারায়নগঞ্জ আমলী আদালত) উল্লেখিত হত্যাকান্ডের দায় সেচ্ছায় স্বীকার করে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী অজিদ কাজী সাক্ষী হিসেবে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারা মোতাবেক জবানবন্দি প্রদান করে। আসামীদের দেয়া জবানবন্দী পর্যালোচনা করে, ভিকটিমদ্বয়ের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং আসামীর দেওয়া তথ্যাবলি যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে জড়িত আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।