ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬ | ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি: বিশ্বাসযোগ্যতা না রাজনৈতিক প্রতারণা?


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ০৭ আগস্ট, ২০২৫, ০৬:০৮ এএম

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি: বিশ্বাসযোগ্যতা না রাজনৈতিক প্রতারণা?

ইউরোপ-আমেরিকার চুক্তি: সত্যিই কি ‘সেরা’?

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ একটি চুক্তির ঘোষণা দেন, যাতে বলা হয়—যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করবে। এর পরিবর্তে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনবে এবং অতিরিক্ত ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। একইসঙ্গে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্যও অর্থ বরাদ্দ থাকবে। এই চুক্তিকে ‘সেরা’ বলা হলেও, এর বাস্তবিক অর্থ ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ট্রাম্পের অতীত আচরণ বিবেচনায় রেখে অনেকেই মনে করছেন—এই চুক্তি রাজনৈতিক শক্তির শোডাউন মাত্র।


ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি: কি কেবল শক্তির খেলা?

চুক্তির পেছনে থাকা রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, আইন প্রতিষ্ঠান, এমনকি সংবাদমাধ্যমও ভাবছে—ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করা মানে কি কেবল তার রাজনৈতিক খেলার অংশ হওয়া? নাকি এটা আইন ও নৈতিকতার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া? ট্রাম্পের চুক্তি মানেই যেন এক অন্ধকার বাস্তবতায় প্রবেশ, যেখানে শাসন নেই, নিয়ম নেই, কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছাই শেষ কথা।


আইনের শাসন না থাকলে চুক্তির ভিত্তি দুর্বল

সুস্থ বাজারব্যবস্থা নির্ভর করে আইনের শাসনের ওপর। যে চুক্তি আইনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে একতরফাভাবে পরিবর্তনযোগ্য হয়, তা কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রে আইনের অনুশাসনের জায়গায় এসেছে নির্বাহী আদেশের দাপট। ফলে বিদেশি বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য এই চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ও অবিশ্বাস্য হয়ে পড়ছে।


আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘চুক্তি’: ভয় না কি বুদ্ধিমত্তা?

ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ৯টি আইনপ্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে ৯৪০ মিলিয়ন ডলারের আইনি সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল—তাদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল হবে, সরকারি কাজ থেকে বাদ দেওয়া হবে, এমনকি আদালতেও ঢুকতে দেওয়া হবে না। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান আদালতে গিয়ে জয় পায়, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—যারা আইনের রক্ষক, তারাই কি এখন রাজনৈতিক চাপে আইনভঙ্গ করতে বাধ্য হচ্ছে?


যখন আইনজীবীরাও নিরাপদ নন

আইনের পক্ষে থাকা মানেই এখন আর নিরাপদ থাকা নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আইন প্রয়োগ’ মানেই নিজের ইচ্ছামতো শাস্তি দেওয়া। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে, যেকোনো সময় তিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—আইনি কাঠামোর তোয়াক্কা না করেই। এই অবস্থায় যারা ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করতে চায়, তারা আসলে আইন নয়, ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে।


ট্রাম্পের ক্ষমতার অপব্যবহার: ১৭৯৮ সালের আইন ও বাস্তবতা

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প ১৭৯৮ সালের এলিয়েন এনিমিস অ্যাক্ট ব্যবহার করে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। এই আইন সাধারণত যুদ্ধ বা বিদেশি হুমকির সময় কার্যকর হয়, কিন্তু ট্রাম্প এটিকে ব্যবহার করেছেন ভেনেজুয়েলার মাদকচক্রের বিরুদ্ধে। এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে যেকোনো বিদেশি নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।


নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ: সংবিধানও অগ্রাহ্য?

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্মগ্রহণকারী সবাই নাগরিকত্ব পায়। কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ এই মৌলিক অধিকার বাতিল করে দেয়। এমন সিদ্ধান্ত শুধু মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনই ভাঙে না, বরং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নৈতিকতার ওপরও আঘাত হানে। এই আচরণ দেখিয়ে দেয়, ট্রাম্প কোনো নিয়ম মানেন না; তিনি যা চান, সেটাই নিয়ম।


বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শঙ্কায়

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বড় দোটানায়। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের হুমকি দিচ্ছে—যদি তার নীতিমালা অনুসরণ না করে, তাহলে সরকারি অনুদান ও কর ছাড় বাতিল হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি ট্রাম্পকে খুশি রাখতে নীতিহীন চুক্তি করবে, নাকি এক হয়ে প্রতিবাদ জানাবে? শিক্ষার মতো নীতিনিষ্ঠ একটি খাতে যদি চুক্তি হয় রাজনৈতিক হুমকির ভিত্তিতে, তাহলে এর ফল কী হতে পারে?


একতরফাভাবে পরিবর্তনযোগ্য চুক্তি মানেই ফাঁকা বুলি

চুক্তির মূল শক্তি হলো বিশ্বাস, দায়বদ্ধতা ও আইনগত স্থায়িত্ব। যদি একটি চুক্তি প্রেসিডেন্টের মর্জির ওপর নির্ভর করে—আজ আছে, কাল নেই—তাহলে সেই চুক্তিকে আর চুক্তি বলা চলে না। সেটা একটি ফাঁকা কাগজ, যা আত্মপ্রবঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও এটাই বাস্তবতা।


উপসংহার: ট্রাম্পকে ভরসা করা কি ভবিষ্যতের জন্য হুমকি?

ট্রাম্পের অতীত ও বর্তমান নীতিমালা বিবেচনায় এটা স্পষ্ট—তিনি বিশ্বাসযোগ্য নন। চুক্তি মানে তাঁর কাছে সুযোগ নেওয়ার উপায় মাত্র। এমন এক নেতার সঙ্গে চুক্তি করা মানে হলো—আইনের বাইরে গিয়ে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানো। ইউরোপ হোক বা অন্য কেউ—তাদের বুঝে নেওয়া উচিত, ট্রাম্পের সঙ্গে করা কোনো চুক্তিই স্থায়ী নয়, কারণ তিনি নিজেই নিয়মের বাইরে অবস্থান করেন।


সারাংশ:
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করা মানে কেবল একটি রাজনৈতিক নাটকের অংশ হওয়া নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে আইনের শাসনকে অস্বীকার করার এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। বিশ্ব যখন স্থায়িত্ব ও নৈতিকতার পক্ষে, তখন ট্রাম্পের নেতৃত্ব এই ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।