ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬ | ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

হিরোশিমা-নাগাসাকি: পারমাণবিক ধ্বংসের যন্ত্রণায় জন্ম নিল গডজিলা! দানবের আড়ালে লুকানো সত্য


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ১০ আগস্ট, ২০২৫, ০৫:০৮ এএম

হিরোশিমা-নাগাসাকি: পারমাণবিক ধ্বংসের যন্ত্রণায় জন্ম নিল গডজিলা! দানবের আড়ালে লুকানো সত্য

৮০ বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড আজও মানুষ ভুলতে পারেনি। ১৯৫৪ সালে জাপানে মুক্তি পায় একটি সিনেমা, নাম ‘গজিরা’। আজকের বিশ্ব সিনেমায় যাকে আমরা ‘গডজিলা’ নামে চিনি। বাকি বিশ্বের কাছে এটি হয়তো একটি রঙিন অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র। কিন্তু জাপানের মানুষের কাছে এই ছবি একেবারে অন্য রকম অর্থ বহন করে।

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফাটিয়ে জাপান ভয়ের অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। সেই ধোঁয়া-কুয়াশা যেন পর্দায় এসে প্রাণ পায় গডজিলার আকারে! অনেক দর্শক সেই ছবি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালে যখন একই ছবি আমেরিকায় মুক্তি পায়, তখন আমেরিকানরা হাসাহাসি করেছিল। কেন? এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকার দুটি পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার ফলাফল শুধু লাখো মানুষের মৃত্যু নয়, পুরো মানব সভ্যতার সামনে এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা দিয়েছিল। যুদ্ধের পর জাপান ছিল নিঃস্ব, আতঙ্কিত এবং ধ্বংসস্তূপে ডুবে। তরুণ সম্রাট হিরোহিতো অবশেষে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন, যেখান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়।

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও পারমাণবিক ভয়ের ছায়া দূর হয়নি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত জাপান ছিল মিত্রশক্তির দখলে, আর আমেরিকান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ছিলেন এর নিয়ন্ত্রক। সে সময় কেউ পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলত না। জাপানি লেখক উইলিয়াম সুতসুইয়ের মতে, “চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীরা কখনই মুক্তভাবে পারমাণবিক বোমার বিষয়ে কথা বলতে পারতেন না। সাধারণ মানুষও বিষয়টি নিয়ে খুব কম কথা বলত, কারণ প্রত্যেকের মনের মধ্যে লজ্জা ও অপরাধবোধ কাজ করত।”

১৯৫২ সালে আমেরিকা জাপান থেকে চলে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন চলচ্চিত্র নির্মাতা ইশিরো হন্ডার মাথায় আসে অদ্ভুত এক মনস্টারের ধারণা, যেটা হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসে। গডজিলার সৃষ্টি হয় সেই সময়ের বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকে। গডজিলার জন্ম নিয়ে ইশিরো হন্ডার স্ত্রী কিমি হন্ডা বলেন, “বোমা না থাকলে গডজিলা থাকত না।”

গডজিলা হচ্ছেন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এক বিপন্ন ডাইনোসর, যাকে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত করে। ছবিতে সেই বিশাল প্রাণী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে আসে। তেজস্ক্রিয় এই দানবের রূপে সাধারণ জাপানিরা নিজেদের বেদনা ও ক্রোধ দেখতে পায়।

১৯৫৪ সালের অক্টোবরে মুক্তি পাওয়া ‘গজিরা’ ছবির ঠিক আগে আমেরিকা বিকিনি দ্বীপপুঞ্জে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালায়। সেই বিস্ফোরণের ক্ষত থেকে মাছধরা একটি নৌকা তেজস্ক্রিয় হয়ে ওঠে, আর সেই একই ঘটনা ‘গজিরা’ ছবিতেও ফুটে ওঠে।

বিশ্ব তখন পারমাণবিক ধ্বংসের আতঙ্কে কাঁপছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির পর পরই অন্য শহরগুলোও একই ভয় থেকে মুক্ত নয়, কারণ আমেরিকা এখন হাইড্রোজেন বোমা বানিয়ে ফেলেছে। বিশ্ববাসী গডজিলা দেখে মুগ্ধ হয়, কারণ ছবির শেষে বলা হয়, একদিন আবারও এমন একটা দানব উঠে আসতে পারে যদি মানুষ সচেতন না হয়।

তবে আমেরিকার কাছে ‘গডজিলা’ ছিল শুধুমাত্র বিনোদনের ছবি। ১৯৫৬ সালে ছবিটি আমেরিকায় মুক্তির সময় মার্কিন টেকনিশিয়ানরা অনেক রাজনৈতিক বার্তা কেটে ফেলেছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ‘অতিরঞ্জিত’ অংশগুলো বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছিল। ছবির শেষে বলা হয় পৃথিবী আবার নিরাপদ। এই ধরনের ছাঁটাই একরকম অপরাধবোধকে প্রতিফলিত করে।

১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গডজিলা’ ছবিতে দেখানো হয়, এই দানবটির সৃষ্টি ফরাসিদের পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন বোমার কারণে। অর্থাৎ নিজেদের অপরাধ অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা।

তবে যতই চেষ্টা করুক আমেরিকা, ইশিরো হন্ডার এই অমর সৃষ্টি আজও হিরোশিমা-নাগাসাকির ভয়াবহতা ও মানুষের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে আছে। সেই অপরাধবোধ আজও আমেরিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং ভবিষ্যতেও তা চলতেই থাকবে।