এনবিএস ওয়েবডেস্ক প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের জটিল ও দালালনির্ভর ব্যবস্থার যুগ শেষ করে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করতে চলেছে মালয়েশিয়া। তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে সরাসরি বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য একটি নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবিত নতুন নিয়োগ পদ্ধতিটি এখনও চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। খুব শীঘ্রই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা শেষে এটিকে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
মানবসম্পদ মন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে তৃতীয় পক্ষ বা দালালদের জড়িত থাকা মালয়েশিয়ায় একটি পুরনো ও ব্যাপক সমালোচিত সমস্যা। সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে বারবার উঠে এসেছে যে, এই দালাল চক্র শ্রমিকদের উপর অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে দেয়, ঋণের জালে ফেলে এবং আধুনিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেয়। নতুন এই প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তারা সরাসরি বিদেশি শ্রমিকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। বর্তমানে নিয়োগকর্তাকে আগে একজন এজেন্টের সাথে কথা বলতে হয়। ফলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যে শ্রমিক সত্যিই চাকরির আসল শর্তে রাজি হয়েছে কিনা। এজন্যই অনেক শ্রমিক অভিযোগ করেন, 'চাকরি এ' বলে চুক্তি করলেও আসলে মালয়েশিয়ায় এসে 'চাকরি বি' করতে বাধ্য করা হয়।
মালয়েশিয়ার জাতীয় দৈনিক দ্য স্টার কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী আরও ভয়াবহ তথ্য দেন। তিনি জানান, অনেক শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় আসার আগেই ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত (প্রায় ১৯ হাজার থেকে ৩১ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত) দিতে হয়। এই বিশাল অর্থ আদান-প্রদান মানব পাচার, সামাজিক সমস্যা এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতি অনুযায়ী, বিদেশি ও গৃহকর্মী নিয়োগের ফি এক মাসের বেতনের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার রিঙ্গিত, আর নেপালি নিরাপত্তা গার্ডদের ক্ষেত্রে ১০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হয়।
নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত শ্রমিকের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হবে। পছন্দ হলে একটি ক্লিকেই ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকার নেওয়া যাবে। ভাষাগত সমস্যা দূর করতে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক তাৎক্ষণিক অনুবাদ সুবিধা। অর্থাৎ, নিয়োগকর্তা মালয় ভাষায় কথা বললে, এআই সেটি শ্রমিকের মাতৃভাষায় (যেমন বাংলা বা নেপালি) অনুবাদ করে দেবে।
মন্ত্রী জানান, এই উদ্যোগ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর আইন-কানুনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এগোতে আলোচনা চলছে। একই সাথে, ভবিষ্যতে বড় আকারের ব্যবহার সামলানোর জন্য টেকসই ও নিরাপদ প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তোলার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের একটি 'নৈতিক নিয়োগ কেন্দ্র' বা Ethical Recruitment Hub বানানো। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের 'ট্রাফিকিং ইন পারসনস' (TIP) রিপোর্টে মালয়েশিয়ার টিয়ার-১ অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই পদ্ধতি পুরোপুরি সরকার থেকে সরকার (G2G) ভিত্তিতে কাজ করবে, যেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা দালালের ভূমিকা থাকবে না। এতে 'মাই ডিজিটাল' ও অন্যান্য ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে শ্রমিকের পরিচয় যাচাই, বেতন প্রদান এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ আরও স্বচ্ছ ও সহজ হয়ে উঠবে। এই উদ্যোগ সফল হলে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে, খরচ কমবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, শ্রমিক শোষণ রোধে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে বলে মনে করছেন তারা।