এনবিএস ওয়েবডেস্ক প্রকাশিত: ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক আচরণ এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে—এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটির সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে ভারত সরকার বৈষম্যমূলক নীতি, ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার মাধ্যমে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়মিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এসব ঘটনায় ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ও মানবাধিকার রক্ষার অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৬’-এ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৫ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ভাষ্য ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমা দিয়ে শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান ও রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকার সমালোচকদের কণ্ঠরোধে কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছে এবং গণমাধ্যমকে আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য করেছে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা ও বিজেপি সমর্থকদের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বেড়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, বৈষম্যমূলক নীতি, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও রাজনৈতিক মামলার মাধ্যমে ভারত সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে কার্যত স্বাভাবিক করে তুলেছে। মানবাধিকারের পক্ষে বৈশ্বিক কণ্ঠ হওয়ার বদলে বিজেপি সরকার ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৫২৯ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনের ভূমিকায় নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়ন লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ঠেকানোই বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসনসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির কারণে মানবাধিকার ব্যবস্থা যখন নজিরবিহীন হুমকির মুখে, তখন গণতান্ত্রিক দেশ ও নাগরিক সমাজকে কৌশলগত জোট গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী সশস্ত্র সংঘাত হয়। এর পরপরই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভিন্নমত দমনে স্বাধীন গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের কণ্ঠ সাময়িকভাবে রুদ্ধ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের জন্য বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে এবং শিক্ষাবিদ ও ব্যঙ্গকারদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়।
এছাড়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি ‘অবৈধ নির্মাণ’ বা ‘জঙ্গি ও অবৈধ অভিবাসীদের মালিকানাধীন’ দাবি করে ভেঙে ফেলা হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনারও লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে লাদাখে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠলে পুলিশ চারজনকে গুলি করে হত্যা করে। ওই সময় কর্তৃপক্ষ মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা আইনে শিক্ষক ও জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, এখনও বহু শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী কোনো অভিযোগ ছাড়াই কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাবন্দি রয়েছেন। বিদেশি তহবিল আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাজানো আর্থিক তদন্তের মাধ্যমে নাগরিক সমাজ সংগঠন, অধিকারকর্মী এবং বিজেপির রাজনৈতিক বিরোধীদের হয়রানি করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বেড়েছে। ভোট জালিয়াতি ও ভোটার তালিকার অসঙ্গতির অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সবশেষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মুসলমান, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নাগরিক সমাজ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।