ঢাকা, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০২৬ | ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২
Logo
logo

ড্রোনের ছায়ায় ইসরাইল! ২০০০ কিমি আতঙ্ক!


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০২:০২ এএম

ড্রোনের ছায়ায় ইসরাইল! ২০০০ কিমি আতঙ্ক!

শেষ হাসি সেই হাসে, যে আগে থেকে সব গুছিয়ে রাখে। আর বাজপাখির নজর যখন শিকারে পড়ে, তখন পালানোর পথ আর খোলা থাকে না। সারা বিশ্ব যখন আমেরিকার 'রিপার' ড্রোন নিয়ে গর্ব করত, ঠিক তখনই ইরান বাজারে নিয়ে এলো তাদের নতুন মাস্টারপিস—'মোহাজের-১০'। এটি কেবল একটি ড্রোন নয়, এটি একটি উড়ন্ত মিসাইল লঞ্চার! যা টানা ২৪ ঘণ্টা আকাশে থেকে শত্রুর ওপর ৩০০ কেজি ওজনের বোমা বর্ষণ করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এর পাল্লায় এখন পুরো ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি। আজ আমরা উন্মোচন করবো মোহাজের-১০ এর সেই গোপন প্রযুক্তি, যা দেখে পেন্টাগনের জেনারেলরা কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন।

ইরানের ড্রোন শিল্পের ইতিহাসে 'মোহাজের-১০' একটি মাইলফলক। এটি মূলত বিখ্যাত মোহাজের সিরিজের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েল ইরানকে অবরুদ্ধ করার ফন্দি আঁটছিল, ঠিক তখনই তেহরান তাদের এই নতুন ড্রোনটি বিশ্বের সামনে আনে। এর সক্ষমতা দেখে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন ড্রোনের প্রযুক্তিতে আমেরিকার প্রায় সমকক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

এই ড্রোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘস্থায়ী উড়ান ক্ষমতা। মোহাজের-১০ একটানা ২৪ ঘণ্টা আকাশে উড়তে পারে এবং ৭ হাজার মিটার উচ্চতায় উঠে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এর মানে হলো, এটি একবার উড়লে পুরো একদিন শত্রুর ওপর নজরদারি চালানো এবং যেকোনো সময় নিখুঁতভাবে আঘাত করার ক্ষমতা রাখে। এই অদম্য স্ট্যামিনা একে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ড্রোনের তালিকায় স্থান করে দিয়েছে যা পশ্চিমাদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন।

মোহাজের-১০ ড্রোনের পাল্লা বা রেঞ্জ হলো ২,০০০ কিলোমিটার। সহজ কথায় বললে, ইরান তার নিজের দেশ থেকেই এই ড্রোনটি উড়িয়ে সরাসরি ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে হামলা করতে পারবে এবং কাজ শেষ করে আবার ফিরেও আসতে পারবে। এই সক্ষমতা ইসরায়েলের সামরিক নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। তারা এখন বুঝতে পারছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ নিলে তার প্রতিদান হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং সরাসরি।

কেবল নজরদারি নয়, মোহাজের-১০ ড্রোনটি ৩০০ কেজি পর্যন্ত গোলাবারুদ বা বিভিন্ন ধরণের স্মার্ট বোমা বহন করতে সক্ষম। এর ডানাগুলোর নিচে একসাথে একাধিক মিসাইল যুক্ত করা যায়। অর্থাৎ এটি কেবল গোয়েন্দাগিরি করে না, বরং এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ যুদ্ধবিমান যা রাডার ফাঁকি দিয়ে শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে তাদের ঘাঁটি ধ্বংস করে দিতে পারে। ইরানের এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব আজ সারা বিশ্বের কাছে এক পরম বিস্ময়।

অনেকে মোহাজের-১০ কে আমেরিকার এমকিউ-৯ রিপার (MQ-9 Reaper) ড্রোনের সাথে তুলনা করছেন। তবে ইরানি ড্রোনের সুবিধা হলো এটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। যেখানে আমেরিকার একটি ড্রোনের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, ইরান সেখানে অর্ধেক খরচে একই বা তার চেয়েও বেশি কার্যকর ড্রোন তৈরি করছে। এই অর্থনৈতিক সুবিধা ইরানকে যুদ্ধের ময়দানে বড় ধরণের অ্যাডভান্টেজ বা সুবিধা এনে দিয়েছে।

মোহাজের-১০ এর ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম অত্যন্ত উন্নত। এটি শত্রুর সিগন্যাল জ্যাম করে দিতে পারে এবং নিজের অবস্থান লুকিয়ে রাখতে পারে। পেন্টাগনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই ড্রোনটি আমেরিকার তৈরি অনেক অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম। ইরানের এই সাইবার ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, তারা কেবল পেশী শক্তিতে নয় বরং প্রযুক্তিতেও বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক প্রবৃদ্ধি থামানো। কিন্তু মোহাজের-১০ এর সফল উড্ডয়ন প্রমাণ করে যে, নিষেধাজ্ঞার ফল হয়েছে উল্টো। ইরান এখন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তাদের ড্রোনের ইঞ্জিন এবং সফটওয়্যার তৈরি করছে। আজ তারা কোনো বিদেশি সাহায্যের তোয়াক্কা করে না, বরং তারা নিজেরাই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ড্রোন রপ্তানি করার সামর্থ্য অর্জন করেছে।

ইসরায়েলের 'আয়রণ ডোম' বা 'অ্যারো' ডিফেন্স সিস্টেম এই ধরণের ছোট এবং দ্রুতগামী ড্রোনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরণের সংশয় রয়েছে। কারণ মোহাজের-১০ একসাথে অনেকগুলো ড্রোন নিয়ে আক্রমণ করতে পারে। যদি একশোর বেশি ড্রোন একসাথে আক্রমণ চালায়, তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে। এটিই হলো ইরানের সেই 'আগুনের রিং' কৌশলের অংশ যা শত্রুকে পঙ্গু করে দেয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যখন এই ড্রোনের উদ্বোধন করেছিলেন, তখন তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন—ইরান আর কখনো কোনো আগ্রাসনের সামনে মাথা নত করবে না। মোহাজের-১০ হলো সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। আজ ইরান থেকে লেবানন, ইয়েমেন থেকে সিরিয়া—সবখানে ইরানের এই ড্রোন প্রযুক্তির জয়জয়কার। এই ড্রোনগুলো আজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রতিটি যোদ্ধার হাতে শক্তির নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মোহাজের-১০ কে নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত আমেরিকার ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। ট্রাম্পের জমানায় আমেরিকা যা হারিয়েছে, ইরান তা নিজেদের শক্তিতে অর্জন করেছে। এই ড্রোনের উপস্থিতি এখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের সমাপ্তি ঘোষণা করছে। আকাশ এখন আর কেবল পশ্চিমাদের নয়, আকাশ এখন স্বাধীনচেতা ইরানি বীরদের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে।

মোহাজের-১০ কেবল সামরিক কাজে নয়, এটি দূরপাল্লার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজেও অতুলনীয়। এটি সমুদ্রের ওপর নজরদারি চালাতে পারে এবং পারস্য উপসাগরে যেকোনো মার্কিন গতিবিধির এইচডি ভিডিও সরাসরি তেহরানের হেডকোয়ার্টারে পাঠাতে পারে। এর ফলে আমেরিকা এখন আর কোনো গোপন হামলা বা ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পাচ্ছে না। ইরানের চোখ এখন আকাশ থেকে মাটির গভীর পর্যন্ত সর্বত্র বিস্তৃত যা এক বিস্ময়কর সামরিক কৌশল।

ভবিষ্যতের যুদ্ধে ড্রোনই হবে প্রধান হাতিয়ার, আর ইরান সেই হাতিয়ার তৈরিতে এখন সবার শীর্ষে। মোহাজের-১০ এর পর ইরান এখন মোহাজের-১১ বা আরও উন্নত ড্রোনের কাজ শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের এই নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন বিশ্বের মজলুম দেশগুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণা। তারা আজ দেখিয়ে দিয়েছে যে, ঈমানি শক্তি আর বৈজ্ঞানিক মেধা থাকলে কোনো নিষেধাজ্ঞাই একটি জাতিকে তার লক্ষ্য থেকে সরাতে পারে না।

ট্রাম্প বা তার পরবর্তী শাসকরা যতই হুঙ্কার দিক না কেন, মোহাজের-১০ এর মতো ড্রোনগুলো ইরানের সার্বভৌমত্বের এক মজবুত দেয়াল। যুদ্ধের ময়দানে দামী দামী ট্যাঙ্কের চেয়েও এই ড্রোনগুলো এখন অনেক বেশি কার্যকর। ইরান আজ প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল নিজেদের রক্ষা করতেই জানে না, বরং শত্রুর ডেরায় ঢুকে তাদের ধ্বংস করার ক্ষমতাও রাখে। মোহাজের-১০ হলো সেই অদম্য তেহরানের এক অজেয় তলোয়ার।

শেষে বলা যায়, মোহাজের-১০ ড্রোনটি ইরানের সামরিক সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি একটি বার্তা—যেখানে বলা হয়েছে ইরান আর কখনো অবদমিত থাকবে না। আমেরিকা ও ইসরায়েলের জোটকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে, কারণ ইরানের এই বাজপাখিরা এখন আকাশে টহল দিচ্ছে। ইরানের এই অগ্রযাত্রা ইতিহাস বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে যা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও সত্য।

দর্শক, আপনি কি মনে করেন মোহাজের-১০ ড্রোনটি কি সত্যিই ইসরায়েলের গেম শেষ করে দেবে? নাকি আমেরিকা নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে আসবে এই ড্রোনের মোকাবিলায়? আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত কমেন্টে জানান।