ঢাকা, রবিবার, মার্চ ১৫, ২০২৬ | ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২
Logo
logo

জামায়াতের একই রাজনীতি? ৭১ থেকে মব জাস্টিস!


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ১৪ মার্চ, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

জামায়াতের একই রাজনীতি? ৭১ থেকে মব জাস্টিস!

এনবিএস রিপোর্ট: কয়লার ময়লা যায় না ধুইলে, আর স্বভাব যায় না মইলে— প্রাচীন এই প্রবাদটি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে সবচাইতে প্রাসঙ্গিক। একাত্তরের সেই বিভীষিকা থেকে শুরু করে আজকের মব জাস্টিস, প্রতিটি বাঁকে এই সংগঠনটি জন্ম দিয়েছে অসংখ্য বিতর্ক আর রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। আজ আমরা উন্মোচন করবো জামায়াতের সেইসব অন্ধকার অধ্যায়, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে বারবার হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে কলঙ্কিত অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময় ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ আর ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছিল যাদের প্রত্যক্ষ মদদে, তারা হলো এই জামায়াতে ইসলামী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন করে এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করার সেই পৈশাচিক ইতিহাস আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।

একাত্তরের পরাজয়ের পর জামায়াত পর্দার আড়ালে থাকলেও আশির দশকে তারা পুনরায় মাথাচারা দিয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে পুরো জাতির আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নেয় এই দলটি। গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনের সাথে বেইমানি করে স্বৈরাচারী ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে জামায়াতের সেই ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। যা আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের মাটিতে জেএমবি ও বাংলাভাইয়ের র'ক্তা'ক্ত স'হিং'সতা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সে সময় তৎকালীন জামাত আমীর প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, জেএমবি নাকি মিডিয়ার সৃষ্টি। অথচ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে জামায়াতের সাথে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর নিবিড় সম্পর্কের কথা। ধর্মের দোহাই দিয়ে উগ্রবাদ ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রাথমিক কারিগর হিসেবে জামায়াতের নাম বারবার সামনে এসেছে।

২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল চট্টগ্রামের সিইউএফএল ঘাটে ১০ ট্রাক অ'স্ত্র খালাসের ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার জন্য আনা এই বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্রের পেছনে সরাসরি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আই'এস'আই এবং তৎকালীন জামায়াতী মন্ত্রীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। নিজ দেশের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে অরাজকতা তৈরির এই পরিকল্পনা ছিল সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংসের মূলে ছিল তথাকথিত 'উত্তরা কেলেঙ্কারি'। জামায়াতে ইসলামীর চতুর কৌশলে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণেই ১/১১-এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই দেশের শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়। মূলত জামায়াতের উচ্চাভিলাষী এবং ধ্বংসাত্মক রাজনীতিই এদেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ ও দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরশাসন বা মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল।

বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ থাকলেও জামায়াতের মূল লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণভাবে দলটিকে দুর্বল করা। ১/১১-এর সময় তারেক রহমানের ওপর চলা পৈশাচিক নির্যাতনের পেছনেও জামায়াতের ভুল পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের প্রভাব ছিল অপরিসীম। এমনকি আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু এবং সন্তান হারানোর বেদনায় বেগম জিয়ার অশ্রু বিসর্জনের নেপথ্যেও জামায়াতের সেই হঠকারী রাজনীতির দায়ভার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

উইকিলিক্সের লিক হওয়া গোপন তারবার্তায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, জামায়াত সব সময়ই বিএনপির সাথে দ্বিমুখী আচরণ করেছে। প্রকাশ্যে জোটের কথা বললেও তলে তলে তারা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। প্রবীণ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখাতেও বারবার উঠে এসেছে জামায়াতের মোনাফেকীর চিত্র। তারা জোটবদ্ধ রাজনীতিকে কেবল নিজেদের অপরাধ আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

২০১৩ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে এক আজগুবি ও নোংরা গুজব ছড়িয়েছিল জামায়াত-শিবির। এই মিথ্যাচারের ওপর ভিত্তি করে দেশব্যাপী তারা যে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছিল, তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও পুলিশ সদস্য। ধর্মের মতো পবিত্র বিষয়কে রাজনৈতিক স্বার্থে এমন জঘন্যভাবে ব্যবহার করার নজির আধুনিক বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত ও তাদের অনুসারীরা অনলাইন এবং অফলাইনে ব্যাপক সাইবার বুলিং ও স্লাটশেমিং শুরু করেছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অমানবিক গালাগালি এবং আক্রমণাত্মক স্লোগান তাদের উগ্র মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে তারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিষাক্ত করে তুলছে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও বাউল আস্তানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সৃজনশীল কাজে বাধা দেওয়ার পেছনে মব জাস্টিসের সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এই প্রতিটি মববাজীর নেপথ্যে জামায়াত-শিবিরের প্রশিক্ষিত কর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করে একটি উগ্রবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা এই মাজার এবং আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে আঘাত হানছে।

নারীদের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই রক্ষণশীল ও অবমাননাকর। বিভিন্ন সময়ে তাদের নেতাদের বক্তব্যে ধ'র্ষিতা নারীকে "ন'ষ্টা নারী" আখ্যা দেওয়া কিংবা কর্মজীবী নারীদের "প'তি'তা"র সাথে তুলনা করার মতো ধৃষ্টতা দেখা গেছে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ছে, সেখানে জামায়াতের এমন নারী বিদ্বেষী ফতোয়া সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরিয়ে নেওয়ার এক অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।

জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা দেশের অর্থনীতির মূল ধারার সাথে মিশে গিয়ে নিজেদের একটি আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এই অর্থনৈতিক শক্তিকে তারা ব্যবহার করে দলীয় ক্যাডার পোষণ এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে। ফলে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে মেধাবী তরুণদের মগজ ধোলাই করার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কিশোর ও যুবকদের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের উগ্রবাদী পথে ধাবিত করা হচ্ছে। এর ফলে শত শত মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের এই ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার জন্য দায়ী বলে শিক্ষাবিদগণ মনে করেন।

শেষে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড দেশের অস্তিত্ব ও সংহতির পরিপন্থী। যতদিন এই আদর্শ ও সংগঠন বাংলাদেশে সক্রিয় থাকবে, ততদিন জাতিকে সাম্প্রদায়িকতা ও স'হিং'সতার শাস্তি ভোগ করতে হবে। একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে হলে এই অপশক্তির রাজনৈতিক বিলুপ্তি এখন সময়ের দাবি।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যারা রক্তের বিনিময়ে কেনা পতাকাকে অস্বীকার করে, তারা কখনোই দেশের মঙ্গল কামনায় নিয়োজিত হতে পারে না। জামায়াতে ইসলামীর এই দীর্ঘ বেইমানির খতিয়ান নতুন প্রজন্মের কাছে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আপনারা কী মনে করেন? এই অপশক্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী? আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান।