ঢাকা, বুধবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধে তেল-গ্যাস সংকটের শঙ্কা, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ


এনবিএস ওয়েবডেস্ক   প্রকাশিত:  ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধে তেল-গ্যাস সংকটের শঙ্কা, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের বন্দরগুলোতে যাতায়াত করা জাহাজের ওপর সোমবার থেকে মার্কিন অবরোধ কার্যকর হয়েছে।

এর আগে তিনি সতর্ক করেছিলেন, ইরানের “হামলাকারী জাহাজ” যদি মার্কিন নৌ অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের বন্দরে যাওয়া-আসা করছে না—এমন জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বহু প্রতীক্ষিত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে।

জ্বালানি বাজার খোলার পর সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ৭.৫ শতাংশ বেড়ে ১০২.৩৭ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময় ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড ৮.৩ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৫৬ ডলারে পৌঁছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ছে, ফলে অনেক দেশ ইতোমধ্যে চাপে পড়েছে। আয়ারল্যান্ডে বিক্ষোভের পর পেট্রোল ও ডিজেলের কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় পরিবহন খাত বড় ধাক্কার মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জার্মানিও জ্বালানির দাম কমাতে কর হ্রাস করেছে।

ভারতের ওপর বড় প্রভাবের শঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট ভারতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ভারত জ্বালানির জন্য বড় অংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসে অধিকাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এই পথ দিয়েই পরিবহন হয়।

ভারত তার পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। একই সঙ্গে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভোক্তা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন ৪১টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হলেও মধ্যপ্রাচ্য এখনও সবচেয়ে বড় উৎস।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৫০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো ধরনের অবরোধ সরাসরি জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশের ৫০ শতাংশেরও বেশি তেল এসেছে ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।

২০১৯–২০২২ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভারতের নির্ভরতা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা এখনও বড় উদ্বেগের কারণ।

তবে সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের ৭০ শতাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালির বাইরে থেকেও আনা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এলপিজি ও এলএনজিতে চাপ

ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এলএনজি এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি আমদানিকারক দেশ।

বিশেষজ্ঞ হর্ষ পন্থ বলেন, ভারতের এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করা হয়, যার ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারী দেশ। ব্লুমবার্গ বলছে, ভারতের এলপিজির বড় অংশ এবং এলএনজির দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসে।

কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কাতারের উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। কাতার বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি সরবরাহ করে, যার প্রধান উৎস রাস লাফান গ্যাস ফিল্ড।

ইরানের হামলায় এই গ্যাস ফিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

বর্তমানে শিল্পখাতে ভারতের কোম্পানিগুলোর জন্য এলএনজি সরবরাহ ২০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা এসেছে।

ভারত সরকার অবশ্য জানিয়েছে, গৃহস্থালি, পরিবহন এবং এলপিজি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে।

এদিকে ইরান থেকে ভারতের দিকে ২০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ট্যাংকার আসার খবরও সামনে এসেছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এই তেল আমদানি করেছে বলে জানা গেছে।

প্রায় সাত বছর পর ইরান থেকে আবার ভারতে তেল আসছে।

সার, কৃষি ও শিল্পে বড় ঝুঁকি

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রুটে সার পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার ব্যবহারকারী দেশ। বছরে প্রায় ৪ কোটি টন ইউরিয়া ব্যবহার হয়, যার ওপর সরকার ভর্তুকি দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন-জুলাই মাসে কৃষি মৌসুম শুরু হওয়ায় ইউরিয়া সরবরাহে সমস্যা হলে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

ইউরিয়া তৈরির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, যার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়।

অর্থনীতিতে প্রভাব

ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক ২০২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৬.৯ শতাংশ করেছে।

আগে এই হার ৭.৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি, এলএনজি, সার ও রাসায়নিক খাতে এই সংকট শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।