ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬ | ৬ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

ইরান-রাশিয়া জোট হুমকিতে! ইরানকে রুখে দিল ইউক্রেন!


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:০৪ এএম

ইরান-রাশিয়া জোট হুমকিতে! ইরানকে রুখে দিল ইউক্রেন!

বিশ্বের মানচিত্রে এখন কেবল দুটি সীমান্ত নয়, বরং কয়েক হাজার মাইল দূরের দুটি ভিন্ন রণক্ষেত্র যেন একই সুতোয় গেঁথে গেছে। ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে যখন রাশিয়ার কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছে, ঠিক তখন সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরের তপ্ত মরুর আকাশে দানা বাঁধছে এক নতুন রহস্য। ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে নিজ দেশে অস্তিত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত একটি দেশ কয়েক মহাদেশ পাড়ি দিয়ে অন্য একটি অঞ্চলের সামরিক সমীকরণ পাল্টে দিচ্ছে।

ইউক্রেন—যাকে অনেকে ভেবেছিল কেবল সাহায্যের মুখাপেক্ষী একটি রাষ্ট্র, তারা আজ মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইরানের মুখোমুখি। কিন্তু কেন? কেন ইউক্রেনীয় কমান্ডোরা তাদের ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ঘাঁটি গেড়েছে? কেন আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থারাও এই অভিযানের গভীরতা দেখে চমকে উঠেছে? এটি কেবল একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, বরং এটি ইরানের ড্রোন সাম্রাজ্যের পতনের এক নীল নকশা। আজ আমরা আলোচনা করব সেই গোপন অভিযান নিয়ে, যা বিশ্ব গণমাধ্যমে কেবল মাত্র আসতে শুরু করেছে। তৈরি হয়ে নিন এক রোমহর্ষক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য।

ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে যে বোমা ফাটিয়েছেন, তা সারা বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। জেলেনস্কি সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞরা মধ্যপ্রাচ্যে কেবল প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন না, তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইউক্রেনীয় সেনারা সেখানে কী ধ্বংস করছে? উত্তরটি সহজ কিন্তু ভয়ংকর—ইরানের তৈরি 'শাহেদ' (Shahed) ড্রোন।
ইউক্রেনের 'ইন্টারসেপ্টর' বিপ্লব: ইউক্রেন সেখানে এক বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যাকে বলা হচ্ছে 'ইন্টারসেপ্টর ড্রোন'। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োগ করছে। ইরানের শাহেদ ড্রোনগুলো রাশিয়ার হাতে পড়ে ইউক্রেনের শহরগুলোকে ধ্বংস করেছে। এখন ইউক্রেন সেই একই ড্রোনের উৎস মূলে আঘাত হানছে।

ইউক্রেনের তৈরি 'স্টিং' (Sting) ড্রোনের কথা ভাবুন। এটি একটি ড্রোনের চেয়েও বেশি কিছু, এটি একটি উড়ন্ত শিকারি। এটি ঘণ্টায় ৩৪৩ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। যেখানে ইরানের শাহেদ ড্রোনগুলো আকারে বড় এবং কিছুটা ধীরগতির, সেখানে ইউক্রেনের এই ছোট ড্রোনগুলো মৌমাছির মতো হানা দিয়ে শাহেদকে মাঝ আকাশেই গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশে এই অপারেশনগুলো চালানো হচ্ছে। ইউক্রেনীয় সেনারা এফপিভি (FPV) গগলস চোখে লাগিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে এই ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ইউক্রেন কেন নিজের সৈন্য অন্য দেশে পাঠাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে বিনিময়ের শর্তে। ইউক্রেন মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, আর বিনিময়ে তারা পাচ্ছে জ্বালানি তেল, ডিজেল এবং কোটি কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দেশগুলো ইউক্রেনকে এমন সব আধুনিক অস্ত্র দিচ্ছে যা পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় দিতে দ্বিধা করে। ইউক্রেন এখন মধ্যপ্রাচ্যে একটি 'সামরিক সার্ভিস প্রোভাইডার' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ইউক্রেনীয় অস্ত্রাগারে কেবল 'স্টিং' নয়, রয়েছে 'পি-১ সান' এবং 'বুলেট' এর মতো ড্রোন। এর মধ্যে অনেকগুলো ড্রোন থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তৈরি। অর্থাৎ, যুদ্ধের ময়দানেই এগুলো দ্রুত উৎপাদন করা সম্ভব। ইউক্রেন এখন প্রতিদিন ১০০০টি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই উৎপাদনের জন্য অর্থায়ন করছে, যা প্রকারান্তরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধকেই শক্তিশালী করছে।

ইউক্রেনের এই পদক্ষেপ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ইরানের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে গর্ব করে আসত যে তাদের ড্রোন প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু ইউক্রেন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কয়েক হাজার ডলারের ছোট ড্রোন দিয়ে ইরানের লাখো ডলারের শাহেদ ড্রোনকে খেলনা হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

তেহরান এই বিষয়ে চুপ নেই। ইরানের আইনপ্রণেতারা ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে একটি 'বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইরান দেখছে যে, ইউক্রেন কেবল তাদের ড্রোন ধ্বংস করছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যে একচেত্র আধিপত্য ছিল, তাতে ফাটল ধরাচ্ছে। এর ফলে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক জোট আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। রাশিয়া হয়তো ইরানকে আরও উন্নতমানের মিসাইল প্রযুক্তি দেবে, যাতে ইউক্রেনকে নিজ মাটিতে পর্যুদস্ত করা যায়। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি করছে।

এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সাথে ইউক্রেনের সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইউক্রেন এই অভিযানের মাধ্যমে আমেরিকাকে এক শক্তিশালী বার্তা দিল। তারা প্রমাণ করল যে, ন্যাটোর সদস্য না হয়েও ইউক্রেন আমেরিকার মিত্রদের এমন নিরাপত্তা দিতে পারে যা খোদ আমেরিকাও পারছে না। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী যখন ইরানের হুমকির মুখে, তখন ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো সেখানে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় চমক।

এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইউক্রেন যদি সফলভাবে ইরানের ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করতে পারে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল অবকাঠামো নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ইরান যদি ক্ষিপ্ত হয়ে পাল্টা আঘাত হানে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। ইউক্রেন এখানে একটি 'ডাবল-এজ সোর্ড' বা দুধারী তলোয়ারের ওপর দিয়ে হাঁটছে।

চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে, প্রভাবশালী ও অনুপ্রেরণামূলক) উপসংহারে বলা যায়, ইউক্রেন এখন আর কেবল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নয়। তারা এখন একটি বৈশ্বিক সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যারা মহাদেশ পেরিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালিতে ইউক্রেনীয় সেনারা যে লড়াই করছে, তার ফল নির্ধারণ করবে আগামীর বিশ্বব্যবস্থা।

ইরান তার ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে যে ভয় তৈরি করেছিল, ইউক্রেন তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ভেঙে দিচ্ছে। এটি একটি প্রযুক্তির লড়াই, এটি একটি টিকে থাকার লড়াই। পুতিন হয়তো ভেবেছিলেন ইউক্রেনকে একা করে দেবেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইউক্রেন আজ এমন সব মিত্র খুঁজে পেয়েছে যারা রাশিয়ার চিরকালীন বন্ধু ছিল।

এই রহস্যময় যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আধুনিক যুদ্ধে আকার নয়, প্রযুক্তি এবং সাহসই শেষ কথা বলে। পারস্য উপসাগরের আকাশে যখন একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন একটি শাহেদকে আঘাত করে, তখন সেটি কেবল একটি ড্রোন ধ্বংস করে না, বরং ভেঙে দেয় একটি ঔদ্ধত্যের দেয়াল। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে—এই দাবা খেলায় ইরানের পরবর্তী চাল কী হবে? আর ইউক্রেন কি পারবে এই জয়যাত্রা ধরে রাখতে?