ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬ | ৭ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

বাংলাদেশ বনাম ভারত-নেপাল: ডিজেল ও পেট্রোলের দাম


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

বাংলাদেশ বনাম ভারত-নেপাল: ডিজেল ও পেট্রোলের দাম

শহরজুড়ে একটা চাপা উত্তেজনা। চায়ের কাপে ঝড়, বাসস্ট্যান্ডে হাহাকার আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগুনের ফুলকি। হঠাৎ এক বিষাদময় বিকেলে ঘোষণা এলো—তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ, নিম্নবিত্তের চোখে অন্ধকার। সবাই যখন রাজপথে স্লোগান দিচ্ছে, যখন সমালোচনার বিষবাণ ছোঁড়া হচ্ছে বর্তমান সরকারের দিকে—ঠিক তখনই কিছু প্রশ্ন পর্দার আড়ালে রয়ে যাচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কি কেবলই একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র, বিশাল কোনো অর্থনৈতিক যুদ্ধ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার অদৃশ্য হাত?

কেন বাংলাদেশ সরকার এতকাল দাম না বাড়িয়েও এখন বাড়াতে বাধ্য হলো? আইএমএফ (IMF) কেন ঠিক এই মুহূর্তেই ঋণ আটকে দিল? দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানে খাদের কিনারায়, সেখানে বাংলাদেশ কতটা লড়াই করছে? এই বিশাল ক্যানভাসের প্রতিটি বিন্দু আজ আমরা মেলাব। শুরু করছি আজকের বিশেষ বিশ্লেষণ: "জ্বালানির রাজনীতি: সত্য বনাম ষড়যন্ত্র।"

তেলের দাম বেড়েছে—এটি একটি রূঢ় সত্য। কিন্তু সত্যের মুদ্রার উল্টো পিঠটি আরও ভয়ঙ্কর। আমাদের বুঝতে হবে গত কয়েক মাসের প্রেক্ষাপট। যখন সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজারে আগুন লেগেছিল, যখন ইউরোপের উন্নত দেশগুলো হাহাকার করছিল, তখন বাংলাদেশ ছিল এক ব্যতিক্রমী দ্বীপ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী, সরকার তখন নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রেখেছিল।

ভেতরের খবর হলো, গত কয়েক মাস ধরে দেশের তেলের বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছিল। বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আমদানিকারকরা বারবার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা চেয়েছিল এখনই দাম আকাশচুম্বী করা হোক যেন তাদের মুনাফা বাড়ে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার সেই চাপের মুখে নতিস্বীকার করেনি। জনগণের কষ্টের কথা ভেবে বারবার সিন্ডিকেটের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু নাটকের মোড় ঘুরল শুক্রবার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ হঠাৎ করেই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ঋণের কিস্তি আটকে দিয়েছে। কেন? তাদের দাবি ছিল—জ্বালানি খাতে কোনো ভর্তুকি রাখা যাবে না। আইএমএফ চায় বাংলাদেশ যেন বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করে। কিন্তু আমাদের সরকার জানত, হুট করে দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠবে।

আইএমএফ এমন কিছু কঠিন শর্ত দিয়েছিল যা মেনে নেওয়া মানে ছিল দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া। বর্তমান সরকার সেই আপোষহীন অবস্থান থেকে সরেনি। তারা আইএমএফের অযৌক্তিক শর্তে রাজি না হওয়ায় সংস্থাটি তাদের অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দেয়। অর্থাৎ, একপাশে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যপাশে দেশের ভেতরের সিন্ডিকেট—সরকারকে এক ভয়াবহ চোরবালির মুখে দাঁড় করানো হয়েছে।

আপনারা কি জানেন, শুধুমাত্র গত মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার তেলের ওপর প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে? অংকটা একবার কল্পনা করুন। একদিনে ১৬৭ কোটি টাকা! মাসে যা দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা সরকার কোনো বিদেশ থেকে পায়নি, এটি ছিল উন্নয়নের টাকা, যা আপনাদের পকেটের ওপর চাপ কমাতে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র কতদিন এভাবে নিজের রক্তক্ষরণ সহ্য করতে পারে? যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে টানাটানি, সেখানে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা স্রেফ হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না। সমালোচনার আগে এই অংকটা মেলাতে ভুলবেন না। এই দাম বাড়ানোটা বিলাসিতা নয়, বরং রাষ্ট্রকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচানোর এক চরম এবং তিক্ত পদক্ষেপ।

আবেগ সরিয়ে এবার একটু মানচিত্রের দিকে তাকান। আমরা যখন নিজেদের ভাগ্য নিয়ে বিলাপ করছি, তখন আমাদের প্রতিবেশীরা কোন নরকবাস করছে, তা কি আমরা জানি? আপনারা যারা সমালোচনা করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ—দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো একটি দেশকে মানদণ্ড ধরুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন আমাদের অবস্থা কেমন।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই নেপালের বর্তমান সরকারের প্রশংসা করেন। কিন্তু সেই নেপালের বাস্তব চিত্রটা কী? নেপালে এক লিটার পেট্রোলের দাম আজ ১৯৮ টাকা। ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৭ টাকায়। সেখানে মানুষের যাতায়াত খরচ আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ। জেন-জি সরকার আসার পরেও তারা কিন্তু তেলের দাম কমাতে পারেনি, বরং বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়িয়েই চলেছে।

এবার আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকান। সেখানে পেট্রোলের গড় দাম ১৫৩ টাকা এবং ডিজেল ১২২ টাকা। ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতি যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ ১১৫ টাকায় ডিজেল এবং ১৩৫ টাকায় পেট্রোল দিচ্ছে। ভারত তার নিজস্ব বিশাল শোধনাগার থাকা সত্ত্বেও দাম কমাতে পারছে না, সেখানে আমদানিনির্ভর দেশ হয়েও বাংলাদেশ এখনও তাদের চেয়ে অনেক কম দামে তেল দিচ্ছে।

যাদের কাছে পাকিস্তানের অর্থনীতি একসময় উদাহরণ ছিল, তাদের জানাই—সেখানে পেট্রোল ১৬২ টাকা এবং ডিজেল ১৭০ টাকা। পাকিস্তান আইএমএফের সব শর্ত মেনে নিয়েও তাদের জনগণকে রক্ষা করতে পারেনি। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, তেল নেই, আর দাম তো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

এবার নিজের দেশের নতুন দামের দিকে নজর দিন। তেলের দাম বাড়ার পর বাংলাদেশে পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা। আপনি যদি এই দামগুলোকে ভারতের ১৫৩ বা নেপালের ১৯৮ টাকার সাথে তুলনা করেন, তবে কি আপনি এখনও বলবেন সরকার আপনাকে শোষণ করছে? সরকার প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এই দামকে ১১৫ টাকায় আটকে রেখেছে। যদি ভর্তুকি সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হতো, তবে আজ ডিজেলের দাম হতো ১৫০ টাকার ওপরে।

বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে গুটিকয়েক শক্তিশালী দেশ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। যখন আইএমএফ পিঠ ফিরিয়ে নেয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়েই আমাদের লড়াই করতে হয়। আর সেই লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই এই সামান্য মূল্যবৃদ্ধি।

সমালোচনা করা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। কিবোর্ডের এক ক্লিকে বা রাজপথের এক স্লোগানে সরকারকে তুলোধুনো করা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার গদিতে বসে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকার লোকসান গোনা আর আন্তর্জাতিক মোড়লদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করা মোটেও সহজ নয়।

আমরা কি চাই আমাদের দেশটা শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া হয়ে যাক? আমরা কি চাই আইএমএফের সব দাসত্ব মেনে নিয়ে জ্বালানির দাম ২০০ টাকা হোক? নিশ্চয়ই না। বর্তমান সরকার যা করছে, তা হলো একটি ধসে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা। তেলের এই দাম বৃদ্ধি কোনো রাজনৈতিক শখ নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।

নেপাল, ভারত বা পাকিস্তানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, আমরা এখনও কতটা স্থিতিশীল আছি। গুজব আর আবেগে ভেসে যাওয়ার আগে তথ্যগুলো একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। দেশ আপনার, সম্পদও আপনার। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বও আপনার বিবেকের। মনে রাখবেন, সত্য সবসময় সুন্দর হয় না, মাঝে মাঝে সত্য হয় অত্যন্ত তিক্ত। আর সেই তিক্ত সত্য হলো—আজকের এই ত্যাগই আমাদের আগামীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে।