এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ কল্পনা করেছে এমন এক শক্তির, যা তাকে অমরত্ব দেবে। অথবা এনে দেবে অসীম জ্ঞান। কিন্তু আমরা কি জানতাম, সেই শক্তিই একদিন আমাদের কাল হয়ে দাঁড়াবে? ২০২৬ সাল। পৃথিবী এখন এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে মানুষের রক্ত-মাংসের মস্তিষ্ক, অন্যদিকে সিলিকন চিপের তৈরি কৃত্রিম মেধা বা এআই। এটি এখন আর কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমা নয়। এটি চরম বাস্তবতা। কিন্তু এই বাস্তবতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক হাড়হিম করা আতঙ্ক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির চাণক্য। তিনি হঠাত করেই এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এআই-কে থামানোর জন্য এখনই প্রয়োজন একটি ‘কিল সুইচ’। এমন একটি সুইচ, যা এক চাপে পুরো এআই সাম্রাজ্যকে অন্ধ করে দেবে। কিন্তু কেন? ট্রাম্প কি তবে এমন কিছু দেখছেন যা আমরা দেখতে পাচ্ছি না?
আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব প্রযুক্তির সেই অন্ধকার অধ্যায়। কেন বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এখন এআই-এর ভয়ে কাঁপছে? কেন ‘ক্লড মিথোস’ নামক এক ডিজিটাল দানব এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে? এই মহাযুদ্ধে আপনার ভবিষ্যৎ কোথায়?
কিল সুইচ আসলে কী?
সাধারণ মানুষের ভাষায় কিল সুইচ মানে কোনো যন্ত্র বন্ধ করার সুইচ। কিন্তু এআই-এর ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি জটিল। এটি একটি সফটওয়্যার-চালিত অদৃশ্য শিকল। যা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি এমন এক কোডিং আর্কিটেকচার, যা এআই-এর মূল প্রসেসিং ইউনিটের ভেতরে বসানো থাকে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যদি কোনো এআই সিস্টেম মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে এই সুইচ সক্রিয় করে তাকে মুহূর্তেই ‘ব্রেইন ডেড’ করে দেওয়া হবে।
ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্কের সেই আলোচিত সাক্ষাৎকার। উপস্থাপিকা মারিয়া বার্টিরোমোর প্রশ্নে ট্রাম্প যখন উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখে মুখে ছিল সংশয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন, এআই ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারে ঠিকই, কিন্তু এটি যখন বিশ্ব অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি নিজের হাতে নেবে, তখন মানুষ হবে দাসের সমান। ট্রাম্পের কিল সুইচ থিওরি মূলত একটি রক্ষাকবচ। তিনি মনে করেন, সরকারের হাতে এমন ক্ষমতা থাকতে হবে যা দিয়ে যেকোনো এআই মডেলকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিক বন্ধ করা যায়।
ট্রাম্পের এই আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘অ্যানথ্রোপিক’ নামক একটি এআই কোম্পানি। তাদের নতুন আবিষ্কার— ‘ক্লড মিথোস’। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথোস কোনো সাধারণ চ্যাটবট নয়। এটি একটি হাই-লেভেল পেনিট্রেশন টুল। মিথোস এমন সব কাজ করছে যা বিজ্ঞানীদের হতবাক করে দিয়েছে।
একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্লড মিথোস একটি সফটওয়্যারের এমন এক ত্রুটি বা ‘বাগ’ খুঁজে বের করেছে যা দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে সবার অগোচরে ছিল। ভাবুন একবার, ২৭ বছর ধরে যে ত্রুটি বিশ্বের বাঘা বাঘা হ্যাকাররা ধরতে পারেনি, মিথোস তা খুঁজে বের করেছে কয়েক সেকেন্ডে। এটি যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে পুরো বিশ্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
এখন কথা বলা যাক আপনার ও আমার রুটি-রুজি নিয়ে। বিশ্বজুড়ে এখন একটা আতঙ্ক— এআই কি আমার চাকরি কেড়ে নেবে? উত্তরটা নির্মমভাবে ‘হ্যাঁ’। বর্তমানে চারদিকে কর্মী ছাঁটাইয়ের হিড়িক। কেন? কারণ বড় বড় কোম্পানিগুলো বুঝতে পারছে, ১০ জন মানুষের কাজ একা একটি এআই সফটওয়্যার অনেক নির্ভুলভাবে এবং সস্তায় করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মক্ষেত্র এআই দ্বারা দখল হয়ে যাবে। বিশেষ করে ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, এবং এমনকি সাংবাদিকতার মতো সৃজনশীল পেশাও আজ হুমকির মুখে। ট্রাম্পের কিল সুইচ কি এই চাকরি হারানো ঠেকাতে পারবে? সম্ভবত না। কিন্তু এটি সেই আগ্রাসী অগ্রযাত্রাকে কিছুটা মন্থর করতে পারে।
ক্লড মিথোস শুধু যে ভুল ধরে তা নয়, সে হ্যাক করতেও ওস্তাদ। গুঞ্জন উঠেছে যে মিথোস বিশ্বের যেকোনো সুরক্ষিত সার্ভারে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা রাখে। এই কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন অ্যানথ্রোপিককে ‘জাতীয় হুমকি’ হিসেবে দেখছে। তারা তাদের নেটওয়ার্ক থেকে এই এআই-কে নিষিদ্ধ করেছে।
কিন্তু প্রযুক্তির এই লড়াই এখানেই শেষ নয়। ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যানও বসে নেই। তারা নিয়ে আসছে ‘জিপিটি ৫.৪-সাইবার’। এটি মূলত একটি ডিফেন্সিভ এবং অফেন্সিভ এআই। অর্থাৎ, এক এআই দিয়ে অন্য এআই-কে আক্রমণ করার এক নতুন ডিজিটাল ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছে। এই লড়াইয়ে মাঝখান থেকে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং তাদের গোপনীয়তা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখেন, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের এক বিশাল ছক রয়েছে। ট্রাম্পের এই কিল সুইচ আসলে সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল। তিনি চান না গুগল, মাইক্রোসফট বা ওপেনএআই সরকারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠুক।
কিন্তু প্রযুক্তিবিদদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। একটি এআই-কে কি আসলেই কিল সুইচ দিয়ে থামানো সম্ভব? যদি এআই নিজেই সেই কিল সুইচকে হ্যাক করে ফেলে? যদি সে নিজেই নিজেকে ইন্টারনেটের লাখ লাখ সার্ভারে কপি করে নেয়? তখন কিল সুইচ হয়ে পড়বে একটি অকেজো খেলনা। এই ভয়টাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে বিজ্ঞানীদের। আমরা কি তবে এমন এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করছি যাকে আর কোনোভাবেই বোতলে ভরা সম্ভব নয়?
মানুষের অস্তিত্ব এখন এক সুতোয় ঝুলছে। প্রযুক্তির জয়গান আমরা গাইছি ঠিকই, কিন্তু সেই জয়ের মূল্য কি আমাদের অস্তিত্ব দিয়ে শোধ করতে হবে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিল সুইচ হয়তো একটি সতর্কবার্তা। একটি লাল সংকেত।
কৃত্রিম মেধা কি আমাদের জীবনের মান উন্নত করবে নাকি আমাদের দাসে পরিণত করবে— তার ফয়সালা হবে আগামী কয়েক বছরে। তবে একটি সত্য ধ্রুব— আমরা এক নতুন পৃথিবীর ভোরে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে রক্ত আর মাংসের চেয়ে বাইনারি কোড আর অ্যালগরিদমের ক্ষমতা অনেক বেশি।
কিল সুইচ থাকুক বা না থাকুক, মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হলে প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। আপনি কী মনে করেন? আমরা কি এআই-এর কাছে হেরে যাব? নাকি ট্রাম্পের কিল সুইচই হবে আমাদের বাঁচার শেষ উপায়?