ঢাকা, বুধবার, এপ্রিল ২২, ২০২৬ | ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

গাড়ি নয়, এবার মরণাস্ত্র! ট্রাম্পের নিশানায় চীন?


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

গাড়ি নয়, এবার মরণাস্ত্র! ট্রাম্পের নিশানায় চীন?

শান্ত পৃথিবীর বুকে কি তবে মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে? ওপর দিয়ে যখন শান্তির কপোত ওড়ানো হচ্ছে, ঠিক তখনই কি পর্দার আড়ালে দানা বাঁধছে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের নীল নকশা? যে আমেরিকা গত আট দশক ধরে শিল্পবিপ্লব আর অর্থনীতির দোহাই দিয়ে এসেছে, সেই ওয়াশিংটন কেন আজ হঠাত তাদের গাড়ি তৈরির কারখানাগুলোকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির নির্দেশ দিল?

১৯৩৯ সাল। বিশ্ব কাঁপছে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বুটের আওয়াজে। ঠিক সেই সময়ে রুজভেল্ট প্রশাসন আমেরিকার সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকে রূপান্তর করেছিল এক একটি মরণাস্ত্র তৈরির কারখানায়। দীর্ঘ ৮৭ বছর পর, ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পেন্টাগন ঠিক একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কিন্তু কেন? ইরান কি কেবল শুরু? নাকি আসল লক্ষ্য বেইজিং বা মস্কো? কেন জেনারেল মোটর্স আর ফোর্ডের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলোকে বলা হলো—গাড়ি নয়, এবার বানাতে হবে মিসাইল আর যুদ্ধবিমান? আজ আমরা উন্মোচন করব পেন্টাগনের সেই গোপন ফাইল, যা বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ বদলে দিতে পারে চিরতরে। পেন্টাগনের এই যুদ্ধ-অর্থনীতির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় সত্য জানতে ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন।

গত ১৫ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, পেন্টাগন বা আমেরিকার যুদ্ধ দপ্তর সরাসরি যোগাযোগ করেছে দেশটির শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে। জেনারেল মোটর্স, ফোর্ড এবং ওশকোশ—যাদের কাজ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য বাহন তৈরি করা, তাদের এখন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সামরিক রসদ তৈরির।

পেন্টাগনের এক পদস্থ কর্তার মতে, বর্তমান সামরিক ঠিকাদাররা যে গতিতে অস্ত্র সরবরাহ করছে, তা আমেরিকার বিশাল চাহিদার তুলনায় নগণ্য। কিন্তু এই বিশাল চাহিদা কেন তৈরি হলো?

অস্ত্রভান্ডারের শূন্যতা ও ইউক্রেন ফ্যাক্টর: ২০২২ সাল থেকে চলা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে কিভকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েছে আমেরিকা। স্টিঙ্গার মিসাইল থেকে শুরু করে হিমার্স রকেট সিস্টেম—সবই এখন ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে। এর ফলে খোদ আমেরিকার নিজস্ব ভাণ্ডারে বড় ধরনের টান পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পারছে, প্রথাগত ডিফেন্স কোম্পানিগুলো দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই তারা ফিরে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই পুরনো মডেলে।

ইরান যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি: ইরানের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাত আমেরিকাকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে তেহরানের অভাবনীয় সাফল্য পেন্টাগনের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকা হারিয়েছে তাদের গর্বের এফ-৩৫ লাইটনিং টু এবং এফ-১৫ ঈগলের মতো বেশ কিছু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। হারানো এই প্রযুক্তি এবং সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন করা এখন ওয়াশিংটনের জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং এক বিশাল ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ বা স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন অবিরাম অস্ত্র সরবরাহ। জেনারেল ইলেকট্রিক বা জিই অ্যারোস্পেসকে ইঞ্জিনের উৎপাদন বাড়াতে বলা এবং ওশকোশকে ভারী যুদ্ধের গাড়ি বানাতে বলা—এই সব কিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বড় কোনো যুদ্ধ আর কেবল টেবিল টকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

পেন্টাগনের এই রণসজ্জা কেবল আমেরিকার সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউরোপের পোল্যান্ড পর্যন্ত। ট্রাম্পের এই কৌশলের পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।

মলাক্কা প্রণালী ও চীনকে ঘেরাও: আমেরিকা ভালো করেই জানে, চীনের অর্থনীতির প্রাণভ্রমরা হলো মলাক্কা প্রণালী। বিশ্বের ৩৫ শতাংশ খনিজ তেল এই সরু পথ দিয়েই পার হয়। গত ১৩ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার সাথে আমেরিকার ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ চুক্তিটি কেবল একটি কাগজ নয়, এটি চীনের ঘাড়ের ওপর বসানো এক অদৃশ্য তলোয়ার। ওয়াশিংটন চাচ্ছে জাকার্তার আকাশসীমা ব্যবহার করে মলাক্কা প্রণালীতে একচ্ছত্র নজরদারি করতে। যদি কোনো কারণে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করে, তবে এই মলাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে বেইজিংয়ের নাভিশ্বাস তুলে দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।

ইউরোপের রণহুঙ্কার: আমেরিকার এই পথে হাঁটা দেখে পিছিয়ে নেই ইউরোপও। ব্রিটেনের সেনাপ্রধান স্যার রিচার্ড কিংটন সরাসরি তার দেশবাসীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। ওদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ঘোষণা করেছেন পারমাণবিক অস্ত্র বাড়ানোর। জার্মানির রাইনমেটাল কোম্পানিকে বিশাল জমি দেওয়া হয়েছে অস্ত্র কারখানা গড়ার জন্য। এমনকি পোল্যান্ডও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০০টি ‘কে২ ব্ল্যাক প্যান্থার’ ট্যাঙ্ক কিনে নিজের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে।

প্রশ্ন হলো—টার্গেট আসলে কে? তালিকাটি দীর্ঘ। ইরান তো আছেই, সাথে যুক্ত হয়েছে তুরস্কের সাথে সিরিয়া দখলদারির দ্বন্দ্ব। ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে আঙ্কারার শক্তিশালী ফৌজের মোকাবিলা করতে ওয়াশিংটনের দরকার বিপুল অস্ত্রশস্ত্র। অন্যদিকে, আসন্ন চীন সফরের আগে শি জিনপিংকে চাপে রাখতেই কি ট্রাম্প এই কৃত্রিম যুদ্ধ-অর্থনীতি তৈরি করছেন? নাকি আড়ালে অন্য কোনো দেশের ওপর বড় কোনো আঘাত হানার পরিকল্পনা চলছে?

ভয়েসওভার: ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো পরাশক্তি তাদের সাধারণ অর্থনীতিকে যুদ্ধ-কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করে, তখনই পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যায়। ৮৭ বছর আগে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকাকে বিশ্বজয়ী করেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের এই পরমাণু শক্তিধর পৃথিবীতে সেই একই কৌশলের ফলাফল কী হবে?

গাড়ি তৈরির শ্রমিকরা আজ উপহাস করে বলছে—তারা কি তবে এখন ক্ষেপণাস্ত্র বানাবে? এই উপহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম আতঙ্ক। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা যখন জনকল্যাণের বদলে মরণাস্ত্র তৈরিতে ব্যয় হয়, তখন বুঝতে হবে শান্তি আজ বিপন্ন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কি চীন-রাশিয়া বা ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করবে? নাকি মলাক্কা প্রণালীর জল হয়ে উঠবে রক্তে লাল? আমরা কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে? পেন্টাগনের এই রহস্যময় চালের উত্তর হয়তো মিলবে অদূর ভবিষ্যতে। তবে একটি কথা নিশ্চিত—পৃথিবী আর আগের মতো থাকছে না।