ঢাকা, রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৬ | ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু সংকটের পদধ্বনি


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু সংকটের পদধ্বনি

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা এবং আইআরজিসি-র ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশগুলোর নীতি যখন অসংলগ্ন, তখন ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কড়া বার্তা দিচ্ছে।

ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খুঁজছেন। অন্যদিকে, দেশটির প্রকৃত প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখন মূলত রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসি-র হাতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইআরজিসি-র বর্তমান অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ইরান কোনো সহজ শর্তে মাথা নত করবে না—এই বার্তাটি এখন স্পষ্ট। ওয়াশিংটনের অস্থির ও অসংলগ্ন অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতি ও কৌশলগত পথগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।

ইরান এ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ সংক্রান্ত ফতোয়া মেনে চললেও, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের ক্রমাগত হুমকি এবং গত ২০২৫ সালের জুনে হওয়া হামলার প্রেক্ষাপটে তেহরান এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত গত দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে কঠোর দাবি জানানো হয়েছিল, তা মূলত তেহরানের মনোবল ভাঙার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, চাপের মুখে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। হোয়াইট হাউসের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ইরানকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা চাইলে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখার বিষয়টি এখন তেহরানের হাতের অন্যতম বড় অস্ত্র। এই ‘লিভারেজ’ ব্যবহার করে ইরান পশ্চিমাদের পিছু হটতে বাধ্য করছে।

সম্প্রতি লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধে ইসরায়েলকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাকে তেহরান নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে। এটি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর একক কোনো শক্তি শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ইরানের জোরালো অবস্থানের কারণেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে হচ্ছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় এক হাজার পাউন্ড ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনের হামলার পরও এই মজুত অটুট থাকা প্রমাণ করে যে, ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ধ্বংস করা সহজ নয়। এই সক্ষমতা এখন তাদের বড় শক্তির জায়গা।

আইআরজিসি-র শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার মতো পরমাণু সক্ষমতা অর্জনই হচ্ছে শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার একমাত্র গ্যারান্টি। তারা মনে করছেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো কেবল শক্তির ভাষা বোঝে এবং আলোচনার আড়ালে আসলে তারা সময়ক্ষেপণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অসংলগ্ন নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্ররা, বিশেষ করে ইসরায়েল চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। ইসরায়েল বারবার এককভাবে হামলার হুমকি দিলেও ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব আবারও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোর করার হুমকি দিচ্ছে। তবে বিগত দশকগুলোতে ইরান প্রমাণ করেছে যে, অবরোধ দিয়ে তাদের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব নয়। বরং এই অবরোধ সাধারণ মানুষের মধ্যে পশ্চিমা বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে।

 ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির (JCPOA) চেয়েও কঠোর কোনো শর্ত তারা মেনে নেবে না। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম মজুত পুরোপুরি প্রত্যাহার বা দীর্ঘমেয়াদী স্থগিতাদেশের মতো একতরফা দাবিগুলো তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন এবং অবরোধের ফলে ইরানের জনগণের মধ্যে হতাশা থাকলেও, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা শাসনব্যবস্থার পাশেই দাঁড়িয়েছে। তবে পরমাণু লক্ষ্য অর্জিত না হলে এই ত্যাগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ইরানের দূতাবাসগুলো বিশ্বজুড়ে এই বার্তাই প্রচার করছে যে, ইরান আর আগের মতো নমনীয় নয়। তারা এখন বিশ্বশক্তির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানে এবং প্রয়োজনে যেকোনো আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ড. হাসান রেজাভী বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যদি মনে করে সামরিক শক্তি বা অবরোধ দিয়ে ইরানকে নতজানু করবে, তবে তারা ভুল করছে। তেহরান এখন অনেক বেশি কৌশলী এবং সামরিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ।"

বর্তমান এই স্নায়ুযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমারা যদি তাদের একতরফা আধিপত্যবাদী নীতি পরিবর্তন না করে, তবে এই অঞ্চলের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান এবং ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত পথচলা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।