ঢাকা, রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৬ | ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

ইরানের প্রতিরোধের মুখে উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমানোর পরামর্শ


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম

ইরানের প্রতিরোধের মুখে উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমানোর পরামর্শ

দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা এবং তেহরানের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের রণকৌশল পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দিবাস্বপ্ন বাদ দিয়ে ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমকে এখন কেবল পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের মতো সীমিত লক্ষ্যমাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান যে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, তাতে ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশ অনেকটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ফলাফল যাই হোক না কেন, ইরানকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা বা দেশটির শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন অবাস্তব বলে মনে করা হচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত সস্তা এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এই ড্রোনগুলো দিয়ে ইরান নিয়মিতভাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানছে, যা মোকাবিলা করতে পশ্চিমা মিত্রদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।

মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করছেন যে, ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করার ব্যয় অত্যন্ত চড়া। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভাণ্ডারে গোলাবারুদ ও সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার বিজয়কে অসম্ভব করে তুলছে।

এদিকে ইসরায়েল বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। গাজায় হামাসের প্রতিরোধ, লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী অবস্থান এবং সিরিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কার মাঝে ইরানের মতো বিশাল শক্তির সাথে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ইসরায়েলি অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। একদিকে রাশিয়ার সাথে ইউক্রেন সীমান্তে উত্তেজনা এবং অন্যদিকে ২০২৭ সাল নাগাদ তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের হুমকি ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দৃষ্টি সরাতে বাধ্য করছে। এ অবস্থায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সিরিয়া বা ইরাকের মতো ইরানেও যদি সরকার পতনের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা হবে বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। ভৌগোলিক ও জনসংখ্যায় ইরান ইরাক ও সিরিয়ার সম্মিলিত আয়তনের চেয়েও বড়, ফলে দেশটির অস্থিতিশীলতা পুরো বিশ্বকে গ্রাস করবে।

ইরানের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধে চীন, ভারত, রাশিয়া, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ওয়াশিংটন বা জেরুজালেমের থাকবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ইরানের বাইরে অবস্থানরত তথাকথিত বিরোধী নেতাদের ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে ইরাকের উদাহরণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন সমরবিশারদরা। ১৯ বছর বাইরে থাকা আহমেদ চালাবি যেমন ইরাকিদের মন জয় করতে পারেননি, ৪৭ বছর নির্বাসিত রেজা পাহলভিকেও ইরান গ্রহণ করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ইরানের ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হবে নাকি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র—তা নির্ধারণের অধিকার কেবল ইরানি জনগণের। বাইরে থেকে কোনো নেতাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় ইরানকে সম্পূর্ণ সামরিকভাবে পঙ্গু করা অসম্ভব। তাই ইরানের মিসাইল ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করাই হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে 'বাস্তবসম্মত' এবং 'মিতব্যয়ী' কৌশল। অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল এই দুই দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অপচয়ই ঘটাবে।

পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌ-শক্তির প্রভাব এবং হরমুজ প্রণালীতে তাদের মাইন স্থাপনের সক্ষমতা মার্কিন নৌবাহিনীকে তটস্থ রাখছে। ফলে ইরানকে এককভাবে দমন করার নীতি যে ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন সমর বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় স্পষ্ট।

যুদ্ধের ময়দানে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রমাণ করে যে, তেহরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসী নীতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—যিনিই ক্ষমতায় থাকুন না কেন, ইরানের শক্তির বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

ইরানের ড্রোন ও মিসাইল ঘাঁটিগুলোতে ছোটখাটো হামলা চালিয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও, দেশটির সামগ্রিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঠেকিয়ে রাখা এখন প্রায় অসম্ভব। তাই সংঘাত বাড়িয়ে পরাজয় বরণ করার চেয়ে মধ্যপন্থী প্রত্যাশা বজায় রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইরানের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পদানত করার চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে চিরতরে বিনষ্ট করবে। মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের উচিত নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে একটি সম্মানজনক সমাধানের পথ খোঁজা।

এ প্রসঙ্গে একজন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বলেন, "ইরান কোনো ছোট রাষ্ট্র নয়; তাদের সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এক অন্তহীন চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে।"