এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে ৩৬৫টি মিথ্যা মামলার বোঝা কাঁধে বয়ে নেওয়া সাবেক বিএনপি নেতা ইসহাক সরকারের আকস্মিক দলবদল রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিএনপির পরিচয়ে পরিচিতি পাওয়া এই নেতার দলবদলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এনসিপির দ্বিচারিতা এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ছায়াতলে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন ইসহাক সরকার। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে একের পর এক মিথ্যা মামলা, রিমান্ড এবং কারাবরণ করেও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। তবে সম্প্রতি তাকে নিয়ে এনসিপির (নতুন রাজনৈতিক দল) অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সুবিধাবাদের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ইসহাক সরকারকে একসময় এনসিপি 'চাঁদাবাজ' ও 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করত, আজ তাদের দলেই তিনি 'ত্যাগী নেতা' হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন।
ইসহাক সরকারের এই রাজনৈতিক ডিগবাজি কেবল একজন ব্যক্তির দলবদল নয়, বরং এটি এনসিপির নীতিহীন রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। তথ্য বলছে, ইসহাক সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া ৩৬৫টি মামলা এবং ১১টি মামলায় প্রাপ্ত ২২ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড—সবই অর্জিত হয়েছে বিএনপির রাজপথের সৈনিক হিসেবে। অথচ আজ এনসিপি দাবি করছে, ৩০০০ কর্মী নিয়ে তার যোগদান তাদের দলের শক্তি বাড়াবে। প্রশ্ন উঠছে, যে ব্যক্তির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিএনপির রক্ত ও ঘাম দিয়ে, তাকে বাগিয়ে নিয়ে এনসিপি কোন ধরনের নীতি প্রচার করতে চায়?
ইসহাক সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি গঠন নিয়ে তিনি একাধিকবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, যা একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দলের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া পিনাকি বা ইলিয়াসের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হওয়ার অভিযোগও তার ওপর ছিল। বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ তাকে বারবার সতর্ক করলেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত ইগো ও বিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নীতিতে অটল ছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে দলের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতে, ইসহাক সরকার ৩৬৫টি মামলা খেয়েছেন বিএনপির আদর্শ ধারণ করার কারণে। জামায়াতের শীর্ষ ২০ নেতার মামলা এক করলেও যেখানে ইসহাক সরকারের একার মামলার সমান হবে না, সেখানে এই ত্যাগ কেবল বিএনপির প্ল্যাটফর্মেই সম্ভব ছিল। জেল-জুলুম এবং রিমান্ড সহ্য করার ধৈর্য তাকে বিএনপিই জুগিয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত সময়ে দল ত্যাগ করে তিনি কেবল নিজেকেই ছোট করেননি, বরং আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের ত্যাগকেও অপমান করেছেন।
ইসহাক সরকারের এই দলবদল কেন লজ্জাজনক, তা নিয়ে দলের ভেতর ভিন্নমত থাকলেও একটি সত্য ধ্রুব—বিএনপি তাকে সব সুযোগ দিয়েছিল। নির্বাচনে তিনি মাত্র ১১ হাজার ভোট পেয়ে দলের আস্থার প্রতিদান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলের বিপক্ষে কাজ করা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল। বিএনপি একটি বিশাল সমুদ্র; এখানে দু-একজন স্বার্থপরের চলে যাওয়ায় দলের জনভিত্তি টলে যায় না। তবে আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে তার এই চলে যাওয়া ভবিষ্যতে সুবিধাবাদীদের জন্য একটি বাজে উদাহরণ হয়ে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপির এই 'সংগ্রহ নীতি' আদতে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ। তারা নিজেরা কোনো নেতৃত্ব তৈরি করতে না পেরে বিএনপির ত্যাগের ফসল ঘরে তুলতে চাইছে। গতকাল যাকে তারা 'সন্ত্রাসী' বলেছে, আজ তাকেই 'মজলুম' তকমা দিয়ে বরণ করে নেওয়া তাদের চারিত্রিক দ্বিমুখীতার পরিচয় দেয়। এই নতুন বন্দোবস্তের নেতারা মূলত সুবিধাবাদী রাজনীতির ডালপালা ছড়াচ্ছেন, যা দেশের সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিএনপির মতো একটি গণমুখী দল কেন একজন বিশৃঙ্খল কর্মীকে ধরে রাখতে পারল না—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইসহাক সরকার কেন লোভে পা দিলেন? ১৭ বছর ধরে যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই হয়েছে, তা ছিল তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের রক্তে ভেজা। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির দীর্ঘদিনের তৈরি করা মাঠই মূল ভূমিকা পালন করেছে। অথচ আজ যখন জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন ইসহাক সরকারের মতো নেতারা লোভে পড়ে অন্য শিবিরের হাতিয়ার হচ্ছেন।
বিএনপি বর্তমানে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পুনর্গঠন, অন্যদিকে চারদিকের রাজনৈতিক শত্রু। আওয়ামী লীগ আপাতদৃষ্টিতে নীরব থাকলেও পর্দার আড়ালে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতের মতো দলগুলো সুযোগ পেলেই সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসহাক সরকারের দলত্যাগ বিএনপির জন্য বড় কোনো ক্ষতি না হলেও, এটি নেতাকর্মীদের মধ্যে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ত্যাগ কি তবে কেবল ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সিঁড়ি?
ইসহাক সরকার দীর্ঘ সময় রিমান্ড সহ্য করেছেন, বছরের পর বছর জেলে কাটিয়েছেন—এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু এই ত্যাগ তাকে দলের ঊর্ধ্বে যাওয়ার লাইসেন্স দেয় না। বিএনপির অনেক নেতাই ৩০০-এর বেশি মামলা নিয়েও দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অবিচল রয়েছেন। অথচ ইসহাক সরকার নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে এবং পদের লোভে সেই বিশাল ত্যাগের ইতিহাসকে এনসিপির মতো একটি নীতিহীন দলের কাছে বন্ধক রেখেছেন।
এনসিপির বর্তমান কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা আদর্শ নেই। বিএনপির পরিত্যক্ত বা বিদ্রোহী অংশকে একত্রিত করে তারা একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক বলয় তৈরির চেষ্টা করছে। ইসহাক সরকারকে নিয়ে তাদের গর্ব করার কিছু নেই; কারণ তিনি যে জনসমর্থনের দাবি করেন, তা মূলত বিএনপির ধানের শীষের প্রতি জনগণের ভালোবাসার প্রতিফলন। এককভাবে তিনি যে ব্যর্থ, তা বিগত নির্বাচনের ফলাফলই বলে দেয়।
আগামী দিনে আন্দোলনের ময়দানে ইসহাক সরকারের উদাহরণ দিয়ে কেউ যাতে পিছুটান না দেয়, সে বিষয়ে বিএনপিকে আরও কঠোর হতে হবে। দলত্যাগী এবং সুবিধাবাদীদের জন্য বিএনপির দরজা চিরতরে বন্ধ রাখা সময়ের দাবি। যারা ১৭ বছর লড়াই করেছে, তারাই দলের আসল সম্পদ। ইসহাক সরকারের মতো যারা মাঝপথে তরী বদল করেন, ইতিহাস তাদের কখনোই বীর হিসেবে স্মরণ করে না, বরং সুবিধাবাদী হিসেবেই চিহ্নিত করে রাখে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। জনগণ সচেতন হয়েছে এবং তারা জানে কারা প্রকৃত ত্যাগী আর কারা পরিস্থিতির সদ্ব্যবহারকারী। জুলাই-আগস্টের বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে। এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বিএনপির ভূমিকা প্রধানতম। ইসহাক সরকার বা এনসিপির মতো ক্ষুদ্র শক্তির সাময়িক আস্ফালন বিএনপির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে না।
শেষে বলা যায়, ইসহাক সরকারের দলবদল বিএনপির জন্য একটি শিক্ষা এবং এনসিপির জন্য একটি নৈতিক পরাজয়। নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘর ছেড়ে ব্যক্তিগত আক্রোশে অন্য দলে যাওয়া কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়। এর মাধ্যমে তিনি কেবল নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেননি, বরং তার পেছনে থাকা অসংখ্য কর্মীর আবেগ নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছেন। সুবিধাবাদী রাজনীতির এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
বিএনপি একটি আদর্শিক ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, যা জনগণের আস্থায় টিকে আছে। ব্যক্তি ইসহাক সরকার হয়তো দল ছেড়েছেন, কিন্তু বিএনপির কোটি কোটি কর্মীর আদর্শিক লড়াই চলবেই। আগামী দিনের রাজনীতিতে কেবল তাদেরই জয় হবে, যারা প্রলোভনের মুখে নতি স্বীকার না করে ত্যাগের মহিমায় অবিচল থাকবে। এনসিপির মতো দলগুলো সাময়িকভাবে কিছু সুবিধাবাদীকে সাথে পেলেও, জনগণের হৃদয়ে জায়গা পেতে যে দীর্ঘ সংগ্রাম প্রয়োজন, তা তাদের নেই।
এখন সময় এসেছে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে আরও সুসংহত করার। ভেতর ও বাইরের শত্রুদের চিহ্নিত করে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিএনপিকে এগিয়ে যেতে হবে। ইসহাক সরকারদের মতো ঝরে পড়া পাতাগুলো ডালপালার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যদি মূল শিকড় থাকে জনগণের মাটির গভীরে।