ঢাকা, শনিবার, মে ১৬, ২০২৬ | ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

প্রজেক্ট ফ্রিডম ভেস্তে গেল, সৌদি ও কুয়েতের আপত্তিতে পিছু হটলেন ট্রাম্প


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ১৫ মে, ২০২৬, ১১:০৫ পিএম

প্রজেক্ট ফ্রিডম ভেস্তে গেল, সৌদি ও কুয়েতের আপত্তিতে পিছু হটলেন ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মাত্র এক দিনের মধ্যেই স্থগিত হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সৌদি আরব ও কুয়েত সহযোগিতা না করায় ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে কুয়েতও নিজেদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

ফলে উপসাগরীয় নিরাপত্তায় নতুন মার্কিন উদ্যোগটি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কার্যত থেমে যায়।

হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে চলাচল করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে।

এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বা ঝুঁকির মুখে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধবিমান, নজরদারি প্ল্যাটফর্ম এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনে সশস্ত্র সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু ঘোষণার মাত্র একদিনের মধ্যেই এই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়।

এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সৌদি আরব ও কুয়েতের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ ছাড়া অভিযানের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যেত।

দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, গত রোববার বিকেলে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করেন। সিদ্ধান্তটি এত দ্রুত নেওয়া হয় যে উপসাগরীয় অংশীদার দেশগুলো আগে থেকে যথেষ্ট প্রস্তুতির সুযোগ পায়নি।

এই আকস্মিক ঘোষণায় সৌদি নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট হয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয় যে তারা তাদের আকাশসীমা দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলের অনুমতি দেবে না। একই সঙ্গে রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিও ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।

প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ঘাঁটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এই ঘাঁটি ব্যবহার করতে না পারলে হরমুজ অঞ্চলে দ্রুত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সৌদির এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দেয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে কথা বলেন। আলোচনায় তিনি সৌদির সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে ওই কথোপকথনেও কোনো সমঝোতা হয়নি।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসন পরিকল্পনাটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

মার্কিন প্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবের পাশাপাশি কুয়েতও তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। কুয়েতের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কুয়েত দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের অনাগ্রহের ফলে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সমর্থন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেন, “সমস্যা হলো, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে।”

এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শের অভাবই ছিল প্রধান সমস্যা।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এই উদ্যোগ সম্পর্কে আঞ্চলিক মিত্রদের আগেই অবহিত করা হয়েছিল।

তবে বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, অন্তত সৌদি আরব ও কুয়েত এ পরিকল্পনায় অংশ নিতে প্রস্তুত ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যগত উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে।

একসময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উদ্যোগে সৌদি আরব ও কুয়েত প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমর্থন দিত। কিন্তু বর্তমানে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সৌদি আরব বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর নীতি অনুসরণ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে, ইরানকে উসকে দিতে পারে—এমন কোনো মার্কিন অভিযানে প্রকাশ্যে অংশ নিতে রিয়াদ অনাগ্রহী।

কুয়েতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের হিসাব কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটি সাধারণত আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে।

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ হলেও, এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে ওঠে।

হরমুজ প্রণালি ইরানের নিকটবর্তী হওয়ায় সেখানে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো কোনো নতুন সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখন আর একতরফা সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; আঞ্চলিক অংশীদারদের সক্রিয় সম্মতি অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব ও কুয়েত তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এই ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও বিব্রতকর। কারণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী নিরাপত্তা উদ্যোগ ঘোষণার মাত্র একদিনের মধ্যে তা স্থগিত করতে হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত সমন্বয় না করলে একই ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও তৈরি হতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।

বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে যে কোনো নিরাপত্তা সংকট বিশ্ববাজারে তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

যদিও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হয়েছে, তবুও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ অঞ্চলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রয়োজনে বিকল্প কৌশল বা নতুন আঞ্চলিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আবারও অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বাধীন অবস্থান ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

সৌদি আরব ও কুয়েতের আপত্তিতে ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হওয়া সেই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ।

হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে ঘোষিত এই উদ্যোগ আপাতত বাস্তবায়িত না হলেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

বিশেষ করে ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও কুয়েত সিটির মধ্যে সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সতর্ক অবস্থান ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অবশেষে বলা যায়, ঘোষণার জোর যতই থাকুক, মিত্রদের সম্মতি ছাড়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।

আর ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর দ্রুত স্থগিত হওয়া সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।