ঢাকা, মঙ্গলবার, মে ১৯, ২০২৬ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

মানবাধিকার বিতর্কের পরও র‍্যাব থাকছে, নতুন আইনে জবাবদিহিমূলক শক্তিশালী বাহিনী গড়তে চায় সরকার


এনবিএস ওয়েবডেস্ক   প্রকাশিত:  ১৮ মে, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

মানবাধিকার বিতর্কের পরও র‍্যাব থাকছে, নতুন আইনে জবাবদিহিমূলক শক্তিশালী বাহিনী গড়তে চায় সরকার

বিভিন্ন বিতর্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করছে না সরকার। বরং নতুন আইনের আওতায় বাহিনীটিকে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক কাঠামোয় গড়ে তুলতে চায় বর্তমান বিএনপি সরকার।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের জেরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবিও জোরালো হয়েছিল। এমনকি গুম কমিশনও র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। তবে এখন সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে। সূত্র: আজকের পত্রিকা প্রতিবেদন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এলিট ফোর্স র‍্যাবকে আরও কার্যকর করতে ইতোমধ্যে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সরঞ্জাম কেনা, আলাদা প্রশিক্ষণ একাডেমি গঠন এবং অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এরই অংশ হিসেবে র‍্যাবের জন্য প্রায় ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬৩টি গাড়ি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র‍্যাবের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, র‍্যাবের কার্যক্রমকে আইনের আওতায় আনতে নতুন একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, বাহিনীটির অপারেশন, নিয়োগ, শৃঙ্খলা, তদারকি ও জবাবদিহি একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করা।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। এত দিন র‍্যাবের কোনো স্বতন্ত্র আইন ছিল না। যেমন ইচ্ছা তেমন চলেছে। এখন আমরা র‍্যাবকে আইনের আওতায় আনতে চাই। এ বিষয়ে একটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছে।”

২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীসহ আটটি বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে র‍্যাব গঠন করা হয়। সংঘবদ্ধ অপরাধ ও জঙ্গিবাদ দমনে দ্রুত অভিযানের কারণে শুরুতে বাহিনীটি ব্যাপক প্রশংসা পায়। বর্তমানে দেশে র‍্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে বাহিনীটির বিরুদ্ধে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।

বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে র‍্যাব। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সবশেষ ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও তৎকালীন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে র‍্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র‍্যাব বিলুপ্তির আলোচনা আরও জোরালো হয়। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবি তোলে। একই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম কমিশনও র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখন র‍্যাবকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর পথে এগোচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন আইনের খসড়ায় সংবিধান, বিদ্যমান ফৌজদারি আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার, তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ক্ষমতাও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।

র‍্যাবের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি বিশেষায়িত এলিট ফোর্স এখনো প্রয়োজন।

র‍্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, “র‍্যাব বিলুপ্তি বা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত সরকারের বিষয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, র‍্যাব একটি পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠুক।”

অন্যদিকে গুম কমিশনের সাবেক সিনিয়র সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, সরকার যদি র‍্যাব বহাল রাখতে চায়, তাহলে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

তার মতে, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের সরিয়ে শুধু পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে র‍্যাব পরিচালনা করা উচিত। তিনি বলেন, “আইন ও বিধিমালার আওতায় পরিচালিত একটি পেশাদার ইউনিটই জনগণের আস্থা অর্জনে বেশি কার্যকর হবে।”