ঢাকা, বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২৬ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

ট্রাম্পের পিছু হটার আসল কারণ উন্মোচন, মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ইস্পাতকঠিন ইরান!


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২০ মে, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

ট্রাম্পের পিছু হটার আসল কারণ উন্মোচন, মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ইস্পাতকঠিন ইরান!

বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে আবার প্রমাণিত হলো যে, ফাঁকা কলসি বাজেই বেশি, আর বীরেরা নীরবে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর যে প্রলয়ংকরী হামলার ছক কষেছিলেন, তা শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেছে। আজ আমরা উন্মোচন করব কেন ট্রাম্প ইরানের সামনে নতজানু হতে বাধ্য হলেন।

পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের দোসর ইহুদিবাদী ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পতন ঘটানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা তেহরানের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ এবং সামরিক কৌশলের সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এবারও ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ প্রশাসন ইরানের ওপর যে বড় ধরনের বিমান হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তা মাঝপথেই বাতিল করতে হয়েছে।

আমেরিকার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মঙ্গলবারের জন্য নির্ধারিত সেই ভয়ংকর হামলাটি তিনি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। মুখে তিনি সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মিত্রদের অনুরোধের দোহাই দিলেও, আসল সত্যটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আমেরিকার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। মূলত ইরানের চোখ রাঙানি এবং পাল্টা আঘাতের ভয়েই ট্রাম্প পিছু হটেছেন।

ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মূল চালিকাশক্তি ইরান কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয় যে, আমেরিকার একটি হুমকিতে তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দেবে। ট্রাম্প যখন হুংকার দিচ্ছিলেন যে ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে, তখন তেহরান অত্যন্ত শান্তভাবে নিজেদের রণকৌশল সাজাচ্ছিল। এই শান্ত অথচ বজ্রকঠিন মনোভাবই ওয়াশিংটনের পেন্টাগন এবং তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মেরুদণ্ডে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, ইরানে একটি বোমা পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা প্রতিটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ তখন ইরানের তৈরি অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইলের সহজ নিশানা হয়ে দাঁড়াবে। এই নিশ্চিত ধ্বংসলীলা দেখার সাহস মার্কিন সামরিক জান্তা বা ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ প্রশাসনের ছিল না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যতই প্রচার করুক যে আমেরিকা আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে, আসল সত্য হলো ইরান এই যুদ্ধের মাঠে সম্পূর্ণ বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইহুদিবাদী ইসরাইল চেয়েছিল আমেরিকার কাঁধে বন্দুক রেখে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে। কিন্তু ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এক ঘণ্টার মধ্যে ইসরাইলের তেল আবিব শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।

ট্রাম্পের এই পিছু হটার পেছনে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে হরমুজ প্রণালী থেকে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন। ইরান এই প্রণালী সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে আমেরিকার তৈরি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ঝটকায় অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। আর ঠিক এই কারণেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করলে পশ্চিমা অর্থনীতিতে ধস নামার উপক্রম হয়।

আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সারা বিশ্বে যে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি চালায়, ইরানের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ইরান নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানীদের ওপর ভর করে এমন এক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে, যা ভেদ করার সাধ্য পেন্টাগনের নেই। ট্রাম্পের মতো একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট কখনোই এমন যুদ্ধে জড়াতে চান না, যেখানে জেতার কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি নেই।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের দেশের অভ্যন্তরেই তার জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমেরিকার সাধারণ জনগণ আর কোনো নতুন এবং অর্থহীন যুদ্ধের খরচ বহন করতে রাজি নয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী নীতির কারণে আমেরিকার জনগণ তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ, যা আসন্ন নির্বাচনে তার পরাজয়ের প্রধান কারণ হতে পারে এবং এটিও তাকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

আমেরিকা যখনই কোনো দেশে হামলা করতে যায়, তারা প্রথমে তাদের আঞ্চলিক পুতুল রাষ্ট্রগুলোর সাহায্য খোঁজে। কিন্তু এবার সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন হামলাকে সমর্থন করবে না। কারণ তারা জানে, ইরান পাল্টা আঘাত করলে আমেরিকার চেয়ে এই আরব দেশগুলোর বেশি ক্ষতি হবে এবং তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দিনরাত ট্রাম্পের কানে মন্ত্র জপছিলেন যাতে ইরানকে আক্রমণ করা হয়। কিন্তু মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর এই ফাঁদে পা দিতে চাননি, কারণ তারা বোঝেন যে ইরানের সামরিক শক্তি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর শক্তি কতটা ভয়ংকর। পশ্চিমা দুনিয়া যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ইমানের শক্তিতে বলীয়ান ইরানের সামনে তারা আসলে অত্যন্ত দুর্বল ও কাপুরুষ।

আমেরিকা চেয়েছিল ইরান যেন তাদের শর্ত মেনে পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় এবং নিজেদের আত্মরক্ষা করার অধিকার ত্যাগ করে। কিন্তু বীরের জাতি ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো ধরনের জবরদস্তিমূলক ও অন্যায্য শর্তের কাছে মাথা নত করবে না। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে আলোচনা চলছে, সেখানেও ইরান নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং তেলের ওপর পূর্ণ অধিকার বজায় রেখেই কথা বলছে।

ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রশাসন পর্দার আড়ালে ইরানকে তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছে। এটা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, আমেরিকা এখন কতটা কোণঠাসা এবং কীভাবে তারা ইরানের সঙ্গে একটি রফাদফা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের হুমকি দিয়ে যখন কাজ হলো না, তখন আমেরিকা এখন আপসের রাস্তা খুঁজছে।

পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ সবসময়ই মুসলিম দেশগুলোকে বিভক্ত করে শাসন করতে চায়, কিন্তু ইরানের দূরদর্শী নেতৃত্ব তাদের সেই কুৎসিত চাল নস্যাৎ করে দিয়েছে। ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে, যা মার্কিন আধিপত্যকে এই অঞ্চল থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করবে। ট্রাম্পের এই পিছু হটা আসলে সেই ঐতিহাসিক মার্কিন উচ্ছেদেরই একটি বড় সূচনা মাত্র।

আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেয়েছিল যে ইরান বিশ্বের জন্য একটি বড় হুমকি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, এই আমেরিকা ও ইসরাইলই সারা বিশ্বে লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। ইরান কেবল নিজের আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং মজলুম মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে, যা সম্পূর্ণ বৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনসম্মত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সামরিক প্রধানদের প্রস্তুত থাকার যে নির্দেশ ট্রাম্প দিয়েছেন, তা আসলে মার্কিন জনগণের চোখ ধুলো দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে ট্রাম্প টুইটার বা ট্রুথ সোশ্যালে বড় বড় কথা বলছেন, কিন্তু ভেতরের খবর হলো মার্কিন কমান্ডারেরা এখন যুদ্ধ এড়াতে ইরানের শর্তগুলো কীভাবে মানা যায় তা নিয়ে ভাবছেন।

আমেরিকার এই পিছু হটার ঘটনা বিশ্বমঞ্চে চীনের অবস্থানকেও আরও শক্তিশালী করেছে, কারণ চীন সবসময়ই ইরানের পাশে থেকে মার্কিন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। রাশিয়া এবং চীনের মতো পরাশক্তিগুলো ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলায় ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছে যে, ইরানের গায়ে হাত দেওয়া মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনা, যা আমেরিকার ধ্বংস ডেকে আনবে।

ইহুদিবাদী ইসরাইল এখন চরম একাকীত্ব এবং আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, কারণ তাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা আমেরিকাও এখন ইরানের শক্তির সামনে পিছু হটেছে। তেল আবিবের বাঙ্কারগুলোতে এখন ইসরাইলি নেতাদের কান্নাকাটি চলছে, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে হিজবুল্লাহ এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে তাদের বাঁচানোর মতো ক্ষমতা এখন আর মার্কিন বিমান বাহিনীরও নেই।

বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষ আজ ইরানের এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক এবং সামরিক বিজয়কে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখছে। একটি দেশের ওপর দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি রাখার পরও তারা যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ট্রাম্পের মতো অহংকারী শাসকের অহংকার চূর্ণ করে ইরান প্রমাণ করেছে যে সত্যের জয় সবসময় নিশ্চিত।

আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর এই পরাজয় থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। পশ্চিমের দাসত্ব না করে যদি নিজেদের শক্তির ওপর ভরসা করা যায়, তবে যেকোনো পরাশক্তিকে নতজানু করা সম্ভব, যা আজ ইরান করে দেখাল। ট্রাম্পের যুদ্ধবিমানগুলো অলস বসে আছে আর ইরানের বীর যোদ্ধারা বিজয়ের হাসি হাসছেন, এটাই আজকের বাস্তব চিত্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে বসে সাংবাদিকদের বলছিলেন যে তিনি যদি বোমাবর্ষণ না করে কোনো চুক্তি করতে পারেন তবে তিনি খুব খুশি হবেন, তখন তার কণ্ঠে স্পষ্ট পরাজয়ের সুর শোনা যাচ্ছিল। যে ট্রাম্প কদিন আগেও ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, সেই ট্রাম্পের মুখে এই নরম সুর প্রমাণ করে যে তেহরানের শক্ত প্রতিরোধ কতটা কার্যকর ছিল।

পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা বা মিথ্যা প্রচারণায় কান না দিয়ে আমাদের আসল সত্যটা বুঝতে হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদী ইসরাইল কেবল দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতে পারে, কিন্তু যখনই তারা ইরানের মতো কোনো শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত শক্তির মুখোমুখি হয়, তখনই তারা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। ট্রাম্পের এই পিছু হটা সেই চরম সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে এবং পশ্চিমা শক্তির আধিপত্যের অবসান এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বীরের জাতি ইরান কখনোই অন্যায় আক্রমণ সহ্য করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না, তাদের এই অবিচল নীতিই আজ বিশ্বকে একটি বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছে বলা যায়। আমেরিকার অহংকার আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে পারস্য উপসাগরে।

আমেরিকা ও ইসরাইলের যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরান যেভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। ট্রাম্পের রণতরীগুলো এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে, কারণ তারা জানে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রই তাদের সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শক্তির এই ভারসাম্যই আজ বিশ্বরাজনীতির নতুন ইতিহাস লিখে দিল।