ঢাকা, রবিবার, মে ৩১, ২০২৬ | ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

পাকিস্তান ভেঙে দিল ট্রাম্পের স্বপ্ন! ইসরাইলকে স্বীকৃতিতে না


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক    | প্রকাশিত:  ৩১ মে, ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

পাকিস্তান ভেঙে দিল ট্রাম্পের স্বপ্ন! ইসরাইলকে স্বীকৃতিতে না

যে পাসপোর্টে লেখা থাকে 'ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ', সেই দেশের ওপর যদি খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরম চাপ আসে ইসরায়েলকে মেনে নেওয়ার জন্য, তাহলে কী ঘটবে? পাকিস্তান কি সত্যিই আমেরিকার হুমকির মুখে নিজের ৭০ বছরের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডের পেছনের আসল রহস্য।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে এখন এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে যা পুরো মুসলিম বিশ্বের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় এসে তার বহুল আলোচিত আব্রাহাম অ্যাকর্ড চুক্তিটি সম্প্রসারণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এবার তার মূল লক্ষ্য হলো পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের মতো বড় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য করা।

তবে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও বাধ্যতামূলক চাপের জবাবে পাকিস্তান যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা ওয়াশিংটনকে বেশ বড় ধাক্কা দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী কোনো চুক্তিতে পাকিস্তান কখনোই অংশ নেবে না। তিনি সাফ বলেন, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বা আলোচনা এই মুহূর্তে ইসলামাবাদের টেবিলে মোটেও নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প হঠাৎ কেন পাকিস্তানের ওপর এত বেশি চাপ সৃষ্টি করছেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি? আসলে ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেন যে, ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে এই চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। তিনি চান পাকিস্তান, কাতার এবং তুরস্ক যেন একই সাথে এই চুক্তিতে সই করে।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের পেছনে আমেরিকার প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো কট্টরপন্থীদের সরাসরি হাত রয়েছে বলে জানা যায়। লিন্ডসে গ্রাহাম অত্যন্ত কড়া ভাষায় পাকিস্তানকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, যদি তারা ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে আমেরিকার সাথে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি এটিকে পাকিস্তানের জন্য একটি মস্ত বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবেও আখ্যা দেন।

আমেরিকার এই চরম হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের পরেও পাকিস্তান কেন নিজের অবস্থানে এত অটল রয়েছে, তা বুঝতে হলে ইতিহাস জানতে হবে। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তান ফিলিস্তিন ইস্যুতে এক চুলও ছাড় দেয়নি। পাকিস্তানের স্পষ্ট নীতি হলো, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং পূর্ব জেরুজালেম তার রাজধানী না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি নয়।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, আরবের রাজতন্ত্রগুলোর তুলনায় পাকিস্তানে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা বাহরাইনের মতো দেশে জনমতকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখানে সাধারণ জনগণ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা যেকোনো সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ইসলামাবাদ ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের প্রধান মুহাম্মদ ইসরার মাদানিও একই কথা প্রতিধ্বনি করেছেন এই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। তিনি বলেন, পাকিস্তানে শক্তিশালী ইসলামপন্থী দল, সুশীল সমাজ এবং একটি অত্যন্ত সচেতন ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যম রয়েছে। যেকোনো সরকার যদি ফিলিস্তিনের অধিকারের প্রশ্নে সামান্যতম আপস করে, তবে দেশের ভেতর গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া একেবারেই অসম্ভব কিছু নয়।

আরেকটি বড় কারণ হলো, পাকিস্তানের কাশ্মীর নীতি যা তাদের অস্তিত্বের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ সাতটি দশক ধরে। পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে সব সময় ফিলিস্তিন এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একই সূত্রে গেঁথে এসেছেন। তারা মনে করেন, দুটি ইস্যুই হলো আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জাজ্বল্যমান প্রমাণ, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান যদি আজ ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলের সাথে কোনো রকম আপস বা চুক্তি করে ফেলে, তবে কাশ্মীর নিয়ে তাদের নৈতিক অবস্থান ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ভারত তখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করবে যে পাকিস্তান নিজেই তার দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসেছে। ফলে নিজের কূটনৈতিক ন্যারেটিভ বা বয়ান টিকিয়ে রাখতেও পাকিস্তানকে ইসরায়েলের বিপক্ষে শক্ত থাকতে হচ্ছে।

এই পুরো বিতর্কের টাইমিং বা সময়টা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এটি মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে সামনে এসেছে। পাকিস্তান বর্তমানে একদিকে ওয়াশিংটন এবং অন্যদিকে তেহরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সেতু বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। একই সাথে তারা চীন এবং সৌদি আরবের সাথে তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি, যিনি ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কোনো দেশের ওপর জোর খাটিয়ে বা বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মতো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি চাইলে ফিলিস্তিন সংকটের প্রকৃত সমাধান এবং ইরানের সাথে উত্তেজনা কমানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

পাকিস্তানের প্রবীণ ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সাংবাদিক হামিদ মীরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এই ক্ষোভ আসলে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের স্বাধীন চেতনার বিরুদ্ধে এক ধরনের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। কারণ দুই দেশই আমেরিকার কথামতো ইসরায়েলের পায়ে দাসত্ব স্বীকার করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ট্রাম্পের অহংকারে লেগেছে।

ইসলামাবাদের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ও লাল রেখা সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই অবগত আছেন। সেই কারণেই হয়তো ট্রাম্প তার পোস্টে স্বীকার করেছেন যে, এক বা দুটি দেশ শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিতে যোগ নাও দিতে পারে। আর সেই সম্ভাব্য দেশের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে একমত যে, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই নির্ভর করবে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। ইসলামের পবিত্রতম দুটি স্থানের রক্ষক হিসেবে সৌদি আরবের যেকোনো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সরাসরি পড়ে। রিয়াদ যদি কোনোদিন ইসরায়েলকে মেনে নেয়, তবে ইসলামাবাদের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শুধুমাত্র সাধারণ কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অত্যন্ত গভীর ও কৌশলগত। সৌদি আরব বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানকে বড় ধরনের আর্থিক অনুদান, জ্বালানি তেল এবং বিনিয়োগ দিয়ে সাহায্য করে আসছে। এছাড়াও লাখ লাখ পাকিস্তানি কর্মী সৌদি আরবে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন।

গত সেপ্টেম্বর মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই চুক্তির মূল কথা হলো, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা অন্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই অভূতপূর্ব প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রমাণ করে যে, সৌদি আরবের যেকোনো ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান এই বিষয়ে এক বড় ধরনের সতর্কতা জারি করেছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যোগ দেয়, তবে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই পুনর্মূল্যায়নের প্রচণ্ড চাপে পড়বে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের যে কোনো সরকার যদি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা হবে তাদের জন্য স্পষ্ট এক রাজনৈতিক আত্মহত্যা।

বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ও আমূল বদলে গেছে। এই যুদ্ধের আগে আমেরিকা যেভাবে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছিল, তা এখন সম্পূর্ণ হিমাগারে চলে গেছে। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম গণহত্যা এবং সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতা পুরো মুসলিম বিশ্বের জনমতকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণে কঠোর করে তুলেছে।

গ্যালাপ পাকিস্তানের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি নাগরিক সরাসরি ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। এর বিপরীতে ইসরায়েলের পক্ষে জনমত ছিল মাত্র দুই শতাংশ যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আবেগ ফিলিস্তিনের সাথে কতটা শক্তভাবে এবং আত্মিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

শেষে বলা যায়, ট্রাম্পের হুমকি কিংবা মার্কিন কূটনীতির লোভনীয় প্রস্তাব—কোনো কিছুই পাকিস্তানের এই ৭০ বছরের পুরনো লাল রেখা বা রেড লাইনকে মুছে ফেলতে পারবে না। আদর্শ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং জনগণের তীব্র আবেগের কারণে পাকিস্তান সম্ভবত কখনোই আব্রাহাম অ্যাকর্ডের অংশ হবে না। আমেরিকার চাপ সত্ত্বেও পাকিস্তান তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে অটল থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।