বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর জন্ম ও শৈশবের ইতিহাস। তিনি জন্মেছিলেন কোথায়—বাংলাদেশের দিনাজপুরে, নাকি ভারতের জলপাইগুড়িতে—এ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলপাইগুড়ি শহরের নয়াবস্তি এলাকার বাসিন্দা ও জলপাইগুড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব ভোলা মন্ডলের দাবি, খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছিল তাঁদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের একটি বাড়িতে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশভাগের পর সম্পত্তি বিনিময়ের সময় অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন এবং তখন খালেদা জিয়ার পরিবার চলে যায় বাংলাদেশে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির পক্ষ থেকে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত জীবনীতেও উল্লেখ করা হয় যে তিনি জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তাঁর বই ‘বেগম খালেদা জিয়া – হার লাইফ, হার স্টোরি’-তে লিখেছেন, খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছিল দিনাজপুরে।
যদিও ওই বইতেই বলা আছে, তাঁর বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ক্লাস এইট পাস করার পর জলপাইগুড়িতে বোন ও দুলাভাইয়ের কাছে চলে যান। সেখানেই তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরে একটি চা বাগানে চাকরি নেন। পরবর্তীতে তিনি চা ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতেই তাঁর বিয়ে হয়।
জলপাইগুড়ি শহরের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, নয়াবস্তি এলাকায় ইস্কান্দর মজুমদারের বসবাস ছিল এবং সেখানেই খালেদা জিয়ার জন্ম। স্থানীয়রা একটি বাড়িও চিহ্নিত করেছেন, যার বর্তমান মালিক অরিন্দম চক্রবর্তী। ভোলা মন্ডলের দাবি, তাঁর মা নাকি খালেদা জিয়ার শৈশবে তাঁকে কোলে নিয়েছিলেন। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বিবিসি বাংলা জানায়, খালেদা জিয়ার জন্মস্থান নিয়ে একটি মাত্র লিখিত স্মৃতিকথার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে কিছু তথ্য থাকলেও সেগুলো নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর বাবার তৎকালীন কর্মস্থলের কিছু নথি থেকেও সীমিত তথ্য মিলেছে।
বিএনপির মিডিয়া সেল প্রকাশিত জীবনচিত্রে বলা হয়, খালেদা জিয়ার আদি পিতৃভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। তাঁর বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়িতে যান, সেখানে বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা শেষ করেন এবং চা ব্যবসায় জড়িত হন। পরিবারটি ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় বসবাস করে।
ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, ইস্কান্দর মজুমদার জলপাইগুড়িতে ‘দাস অ্যান্ড কোং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো হিসাবের খাতায় তাঁর নাম ‘মুহাম্মদ ইস্কান্দর’ হিসেবে পাওয়া যায়। এসব নথি অনুযায়ী, ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তাঁর কর্মসম্পর্কের তথ্য মিললেও এরপর আর কোনো এন্ট্রি পাওয়া যায়নি।
জলপাইগুড়ির ইতিহাস নিয়ে লেখা কামাখ্যা প্রসাদ চক্রবর্ত্তীর স্মৃতিকথায় ইস্কান্দর মজুমদারকে ‘ইস্কিন্দার মিঞা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর বসতবাড়ি, প্রতিবেশী এবং এলাকার সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত বর্ণনাও আছে। ওই বইয়ের ভূমিকায় উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনন্দ গোপাল ঘোষ লিখেছেন, ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় অনেক পুরোনো নথি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে।
খালেদা জিয়া জলপাইগুড়িতে পড়াশোনা করেছিলেন কি না, সেটিও বিতর্কিত। অধ্যাপক আনন্দ গোপাল ঘোষ জানান, দেশভাগের পর ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় পরিবারটি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। তাঁর দাবি, খালেদা জিয়া সাবেরিয়া প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে গবেষক গৌতম গুহরায়ের মতে, জলপাইগুড়িতে তাঁর পড়াশোনার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
সবশেষে বিএনপির জীবনচিত্রে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় দিনাজপুরের মিশন স্কুলে। পরে তিনি দিনাজপুর গার্লস স্কুলে এবং এরপর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন।
সব তথ্য মিলিয়ে বলা যায়, খালেদা জিয়ার জন্ম ও শৈশব নিয়ে জলপাইগুড়ি ও দিনাজপুর—দুই জায়গাকেই ঘিরে রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি আর নানা মতভেদ, যার পুরো সত্য এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
