ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের বিদায়লগ্নে এমন বড় সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই চুক্তির খসড়ায় আসলে কী আছে, তা কেউই জানে না। কারণ, চুক্তির সব তথ্য গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে। (সূত্র: প্রথম আলোর প্রতিবেদন)
৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সই হলে কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ শেষে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে। অর্থাৎ, চুক্তি বাস্তবায়নের দায় গিয়ে পড়বে নতুন সরকারের ওপরই।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ কী—তা পরিষ্কার নয়। একই সঙ্গে কী কী শর্ত মানতে হবে, কোন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, অন্ধকারে রেখেই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। কারণ, যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাঁরা কিছুই জানেন না। অথচ সিদ্ধান্ত চূড়ান্তের পথে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনাকাটা বাড়ালে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামতে পারে—এমন আশা ছিল। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিষয়টি গুছিয়ে আনছেন বলেও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচন শুরুর ঠিক আগে চুক্তি সইয়ের খবর বিস্ময়কর। তাঁর মতে, বিষয়টি নির্বাচনের পর হওয়াই যুক্তিসংগত ছিল।
রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী ব্যবসায়ীরাও চিন্তিত। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, খসড়ায় কী আছে জানা না থাকায় মন্তব্য করাই কঠিন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে নির্বাচনের আগে এ পথে না-ও যেতে পারত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের হাতেই এই দায়িত্ব থাকা ভালো হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির প্রসঙ্গ আসে ২০২৫ সালের এপ্রিলে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করে ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের জন্য হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তিন মাসের জন্য সিদ্ধান্তটি স্থগিত করা হয়।
তিন মাস পর, ৭ জুলাই ২০২৫, ট্রাম্প বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন। এর মধ্যেই চলতে থাকে দর-কষাকষি। ১৩ জুন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি এনডিএ সই করে। এরপর ২ আগস্ট পাল্টা শুল্কের হার ২০ শতাংশে নির্ধারিত হয়। যদিও শুল্ক কার্যকর হয় ৭ আগস্ট থেকেই।
গত ছয় মাস ধরে দুই দেশ চুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯ ফেব্রুয়ারির তারিখ পাওয়া গেছে এবং সেদিনই সই হবে। শুল্ক কমতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি, তবে সইয়ের আগে কিছুই নিশ্চিত নয়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছাড়ছেন। ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সইয়ের পর বাণিজ্য উপদেষ্টা দেশে ফিরবেন। বাণিজ্যসচিব সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সেখানে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার রপ্তানি করে, আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই ব্যবধান কমাতে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা, তুলা, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ব্যবধান কমানোর পরিকল্পনা আছে। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে শুল্ক, অশুল্ক, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি, উৎস বিধি ও জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত কঠিন শর্ত।
এ ছাড়া চীন থেকে আমদানি কমানো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক পণ্য কেনা বাড়ানো, মার্কিন পণ্যের অবাধ প্রবেশ, মানসনদ বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বাড়তি পরীক্ষা না করার শর্তও রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, শুল্ক কমলে রপ্তানিতে লাভ হবে। কিন্তু এসব শর্ত মানলে দেশের শিল্প ও ব্যবসায় কতটা চাপ পড়বে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত
এই চুক্তি ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি হয়। একই দিনে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য চুক্তি হয় সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ–এর সঙ্গে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপিওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে।
‘স্বচ্ছতা নেই’—বিশ্লেষকদের মত
সরকার বলছে, এ ধরনের চুক্তি সাধারণত গোপনই রাখা হয়। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্য দেশে এসব চুক্তি করে নির্বাচিত সরকার, যারা সংসদ ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এটি শুধু শুল্ক চুক্তি নয়—এর সঙ্গে ভূরাজনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জড়িত। কিন্তু চুক্তিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। খসড়া গোপন থাকায় ভালো-মন্দ বিচার করার সুযোগও নেই।
তাঁর মতে, নির্বাচন শেষে এ চুক্তি হলে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করতে পারত। এখন প্রশ্ন উঠছে—নতুন সরকারের হাত-পা কি আগেই বেঁধে দেওয়া হচ্ছে?
