বাদশাহ আবদুল্লাহ ফুসফুস ক্যান্সারে মারা গেলে সৌদি আরবের সিংহাসনে বসেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। শুরুতে তিনি ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন মুকরিন বিন আবদুল আজিজকে। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যেই পাল্টে যায় চিত্র। বাদশাহ সালমান ভাইপো মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স এবং নিজের ছেলে ২৯ বছরের মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানান।

তখনো খুব কম মানুষই এমবিএসের নাম শুনেছিল। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন সৌদি আরবের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজপুত্র।

বাবাকে নজরবন্দি ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ

লেখক ডেভিড বি. ওটাওয়ের দাবি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর এমবিএস নিজেকে বাবার “গেটকিপার” বানিয়ে ফেলেন। রিপোর্টে বলা হয়, তিনি বাদশাহ সালমানকে ধীরে ধীরে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে আলাদা করেন। এমনকি নিজের মা ও দুই বোনকেও নাকি গৃহবন্দি করেছিলেন, অথচ বাদশাহকে বলা হতো তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন।

ইয়েমেন যুদ্ধের সূচনা

২০১৫ সালের মার্চে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার নির্দেশ দেন এমবিএস। শুরুতে সৌদি নাগরিকরা তাকে বাহবা দিলেও পরে আন্তর্জাতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে “পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা” হিসেবে দেখা হয়।

মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরানো

২০১৫ সালের জুনে নাটকীয়ভাবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বইয়ে বেন হাবার্ড লিখেছেন, মক্কার বৈঠকে নায়েফকে হঠাৎ ডেকে নেওয়া হয় এবং তার নিরাপত্তারক্ষীদের নিরস্ত্র করে গৃহবন্দি করা হয়। সেদিন রাতেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ৩৪ সদস্যের কাউন্সিলে ৩১ জন এমবিএসকে সমর্থন জানান। এরপর নায়েফ চুপচাপ জেদ্দায় নিজের প্রাসাদে বন্দি জীবন কাটাতে থাকেন।

বিতর্কিত উত্থান

ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর মোহাম্মদ বিন সালমান শুরু করেন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। ২০১৭ সালের নভেম্বরেই তিনি এক ধাক্কায় ৩৮০ জন প্রিন্স, ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাকে আটক করে রিয়াদের বিলাসবহুল রিটজ-কার্লটনে বন্দি করেন। মুক্তি পেতে হলে তাদের সম্পদ ফেরত দিয়ে জরিমানা দিতে হয়েছিল।

একই সময়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকেও রিয়াদে গিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। টিভি সম্প্রচারে দেওয়া তার পদত্যাগ বক্তৃতায় তিনি নিজেও বিভ্রান্ত ও অস্বস্তিতে ছিলেন।

সংস্কার ও স্বাধীনতা

এমবিএস সৌদি যুবক ও নারীদের মন জয় করতেও কাজ করেন। ২০১৮ সালে তিনি নারীদের আবায়া পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল করেন এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দেন। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, নারীর স্বাধীনতার জন্য নয়।

বিলাসিতা ও কঠোর শাসন

তার ব্যক্তিগত বিলাসিতার কাহিনীও কম আলোচিত নয়—৪৪০ ফুট লম্বা ইয়টে ৫০ কোটি ডলার ব্যয়, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম কিনতে ৪৫ কোটি ডলার খরচ। অন্যদিকে তিনি রাজপরিবারের প্রিন্সদের দেওয়া ভাতা কমিয়ে দেন, যা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায়।

মানবাধিকার বিতর্ক

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট বলছে, সৌদি আরবে হাজার হাজার মানুষ বিচার ছাড়াই বন্দি আছেন। ২৬ জন সাংবাদিক কারাগারে—বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এ ছাড়া এক হাজার নাগরিকের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কথাও শোনা যায়।

জামাল খাসোগজি হত্যাকাণ্ড

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ডে। ২০১৮ সালে ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেটে তাকে খুন করা হয়। সিআইএ’র তদন্তে উঠে আসে, হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এমবিএস নিজেই। যদিও তিনি সবসময় অস্বীকার করে বলেছেন, “এটা জঘন্য অপরাধ, তবে সৌদি নেতার হিসেবে আমি দায় নিচ্ছি।”

পরবর্তীতে সৌদি আদালত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যদিও খাসোগজির পরিবার তাদের ক্ষমা করে দেয়।

আজকের এমবিএস

১৯৮৫ সালে জন্ম নেওয়া এমবিএস আজ সৌদি আরবের সর্বত্রই সর্বশক্তিমান প্রতিচ্ছবি। দেশের ভেতরে ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করলেও বাইরে তিনি পরিচিত একজন আধুনিক সংস্কারক হিসেবে। তবে তার উত্থানের গল্প বলছে—এটি ছিল কৌশল, বিতর্ক ও নির্মম ক্ষমতার খেলার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

 

news