ভারতের ভোপালে ১৯৮৪ সালের এই দিনেই ঘটেছিল পৃথিবীর ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি। একটি কীটনাশক কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনে মারা গিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। আজও সেই রাতের বিভীষিকা তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে থাকাদের।
১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর। ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপাল শহরের প্রায় ৯ লাখ মানুষ তখন গভীর ঘুমে। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ইউনিয়ন কার্বাইডের কীটনাশক কারখানায় রাতের শিফট চলছিল। রাত সোয়া বারোটার দিকে হঠাৎ ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো কারখানা। অতিরিক্ত চাপে ট্যাংকের ভালভ ভেঙে গিয়ে বের হতে শুরু করে প্রাণঘাতী মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস। নিরাপত্তা যন্ত্র ‘ভেন্ট গ্যাস স্ক্রাবার’ নষ্ট থাকায় ৪০ টনেরও বেশি বিষাক্ত গ্যাস মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে শহরে।
প্রথমে বস্তির কিছু বাসিন্দা নাকে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ পায়। অনেকের চোখ জ্বালা শুরু করে। কেউ ভেবেছিল হয়তো কোথাও শুকনো মরিচ পোড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। লোকজন নিঃশ্বাস নিতে কষ্টে পড়ে, অনেকে বমি করতে থাকে। শহর ও শহরতলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সরু গলিতে দৌড়াতে গিয়ে অনেকে পদদলিত হয়ে মারা যান, মা-বাবার কাছ থেকে হারিয়ে যায় অসংখ্য শিশু।
ভুক্তভোগীর কণ্ঠে সেই রাতের বিভীষিকা
আজিজা সুলতান নামে একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি স্মৃতিচারণ করেন, “রাত সাড়ে বারোটার দিকে আমার বাচ্চার তীব্র কাশিতে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি ঘর সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেছে। বাইরে থেকে ‘দৌড়াও! দৌড়াও!’ চিৎকার ভেসে আসছিল। আমি নিজেও কাশতে থাকি, মনে হচ্ছিল যেন আগুনের শ্বাস নিচ্ছি।”
চম্পা দেবী শুক্লা বলেন, “মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের গায়ে মরিচের গুঁড়ো মেখে দিয়েছে। চোখ-নাক দিয়ে পানি পড়ছিল, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। ভয়ংকর কাশিতে মানুষ কেঁপে উঠছিল। অনেকে যা পরেছিল তাই নিয়ে দৌড়াচ্ছিল, কারো গায়ে কিছুই ছিল না। সবাই শুধু বাঁচার জন্য ছুটছিল।”
প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ৩ হাজার মৃত্যু
ওই ঘটনার প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই মারা যান অন্তত ৩ হাজার মানুষ। পরের ৭২ ঘণ্টায় সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজারেরও বেশি। ভোরের আলো ফোটার আগেই রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় শত শত লাশ। অনেক পরিবারের সব সদস্যেই মারা গিয়েছিলেন। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব ভোপাল রেলস্টেশনেও পৌঁছায়, যেখানে লক্ষ্ণৌ-মুম্বাই এক্সপ্রেস ট্রেনটি একটি শবাধারে পরিণত হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ও বিচারহীনতা
মোট পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ গ্যাসের সংস্পর্শে এসেছিল। অনেকে তখনই মারা গিয়েছিলেন, অনেকে চিরতরে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, কিংবা আজীবন শারীরিক জটিলতা নিয়ে বেঁচে রয়েছেন। প্রায় অর্ধেক গর্ভবতী নারীর গর্ভের সন্তান মারা যায়, অনেকের গর্ভপাত ঘটে। পরিবেশবাদীদের মতে, কারখানার বিষ এখনও মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে।
দুর্ঘটনার দায়ে কারখানার চেয়ারম্যান ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। ২০১০ সালের এক রায়ে কারখানার আট কর্মকর্তাকে দুই বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়, কিন্তু অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি। তিনি ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রেই মৃত্যুবরণ করেন।
৪১ বছর পরও অশান্তি
ইতিহাসের অন্যতম এই ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনার ৪১ বছর পার হলেও ভোপালের মানুষ এখনও শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে বেড়াচ্ছে সেই ক্ষত। তাদের দাবি, প্রকৃত দায়ীদের কখনোই বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি, আর ক্ষতিপূরণও ছিল নামমাত্র। ভোপালের সেই বিভীষিকাময় রাত আজও বিশ্বকে শিখিয়ে যায় নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতার গুরুত্ব।
